ইলিশ একটি সুস্বাদু মাছ। দেখতেও আকর্ষণীয়। মাছটি বাংলাদেশের জন্য স্র্রষ্টার এক বিশেষ অনুগ্রহ। বিশ্বের মোট ইলিশের ৮০ শতাংশ উৎপাদন হয় আমাদের দেশে। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের ১২ শতাংশ ইলিশ। প্রকৃতির অপার দান এই ইলিশ জৌলুশ হারাতে বসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে এর উৎপাদন কমছে। আকারও ছোট হয়ে আসছে। এতে আমাদের রান্নার একটি ব্যঞ্জন হারিয়ে যাচ্ছে শুধু তা-ই নয়; ইলিশকেন্দ্রিক অর্থনীতিও সঙ্কুচিত হচ্ছে। এর অভিঘাত সরাসরি মৎস্যজীবীদের ওপর পড়ছে। এর পেছনের মূল কারণ মনুষ্য সৃষ্ট। মানুষের চাপানো বিপর্যয়ের শিকার ইলিশ। এই অসামান্য সম্পদ রক্ষায় যথেষ্ট দায়িত্বশীলতা আমরা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছি।

পদ্মা-মেঘনা বিধৌত শরীয়তপুর ইলিশ আহরণের অন্যতম জায়গা। প্রধান দুটো নদী এ জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় এর সাথে যুক্ত হয়েছে আরো বেশ কয়েকটি শাখা ও উপনদী। সব মিলিয়ে এ জেলায় ৮০ কিলোমিটার নদী আছে। এগুলোতে মৌসুমে মৎস্যজীবীদের জালে পর্যাপ্ত ইলিশ ধরা পড়ত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আশানুরূপ ইলিশ পাচ্ছেন না তারা।

জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্যানুযায়ী, পদ্মা থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে সাড়ে চার হাজার টন ইলিশ আহরিত হয়। পরের অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় চার হাজার এক টন। এর পরের অর্থবছরে তা আরো কমে তিন হাজার ৭০৫ টন হয়েছে। চলতি বছরে আরো কমার আভাস মৎস্যজীবীদের থেকে পাওয়া যাচ্ছে।

নয়া দিগন্তের শরীয়তপুর প্রতিনিধি এক প্রতিবেদনে জেলার ইলিশ আহরণে ধসের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেছেন। তবে কয়েক বছর সারা দেশে ইলিশ আহরণ ব্যাপক হারে কমে যাওয়ার খবর মিলছে। বাজারে ইলিশের আমদানি এখন অনেক কম। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে মোট ইলিশ আহরিত হয় পাঁচ লাখ ৭১ হাজার টন। পরের অর্থবছরে সেটি কমে পাঁচ লাখ ২০ হাজার টন হয়। তার পরের অর্থবছরে সেটি পাঁচ লাখ টনের নিচে নেমে এসেছে। এই পরিসংখ্যান বলে দেয়, ইলিশ আহরণ ধারাবাহিকভাবে কমে যাচ্ছে। একই সাথে এর আকারও ছোট হয়ে আসছে।

ইলিশ আহরণ কমে যাওয়ার পেছনে প্রাকৃতিক কিছু কারণ থাকলেও মনুষ্য সৃষ্ট কারণগুলো স্পষ্ট। এর মধ্যে আছে বেপরোয়া বালু উত্তোলন। এ কারণে ইলিশের বিচরণ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ডিম থেকে পোনা উৎপাদন কমছে। কারেন্ট জাল ও মশারি ব্যবহার করে সব ধরনের মাছ ধরে নেয়া হচ্ছে। নির্বিচারে জাটকা নিধন করা হচ্ছে; মা ইলিশও শিকার করা হচ্ছে। এছাড়া নিষিদ্ধ সময়েও চলছে ইলিশ শিকার। ইলিশের বিচরণ ও বেড়ে ওঠায় এসব বাধা দূর করা অসম্ভব নয়। যারা বিভিন্নভাবে নিয়ম অমান্য করছেন; তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। এ জন্য সরকারকে কঠোর হতে হবে। তবে মৎস্যজীবীদেরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। সবাইকে এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

নদীদূষণ, নাব্যতা কমে যাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনও ইলিশের উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর সাথে আছে উজান থেকে পানি প্রত্যাহারের নেতিবাচক প্রবণতা। এসব ব্যাপারে যে একেবারে কিছু করণীয় নেই এমন নয়। দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিকূল পরিস্থিতি কিছুটা হলেও ইতিবাচক ধারায় প্রবাহিত করা যায়।