টিটিপি সংযোগে দুই ফ্রন্টে তদন্ত, ঝুঁকিতে কক্সবাজার

হাক্কানিকে জিজ্ঞাসাবাদ, তাদের টার্গেট ও নেটওয়ার্কের খোঁজ করা হচ্ছে : সিটিটিসি

এস এম মিন্টু
Printed Edition
first-1
টিটিপি সংযোগে দুই ফ্রন্টে তদন্ত, ঝুঁকিতে কক্সবাজার

দেশের সীমান্ত এলাকায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সাথে বাংলাদেশী নাগরিকদের সংশ্লিষ্টতার একের পর এক তথ্য সামনে আসছে। পাকিস্তান থেকে প্রায় ২০ মাস হেফাজতে থাকার পর সম্প্রতি দেশে ফেরত পাঠানো শেখ আজিজুল হাক্কানিকে জিজ্ঞাসাবাদে নতুন সূত্র মিলেছে বলে জানিয়েছে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সূত্র। একই সময়ে কক্সবাজারের টেকনাফে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) ও টিটিপি-সংশ্লিষ্ট এক রোহিঙ্গা হাজতিকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেয়া হয়েছে। দু’টি ঘটনা একসাথে বিশ্লেষণ করলে সীমান্তবর্তী উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে আসে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টিটিপি বাংলাদেশে তাদের নেটওয়ার্কের জাল বুনেছে। তাদের উদ্দেশ্য সীমান্তবর্তী এলাকাসহ দেশের সব জেলায় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা তাদের পরিকল্পনায় অনেকটাই এগিয়ে গেছে। ফলে দেশে বড় ধরনের হামলা বা নাশকতার আশঙ্কায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তৎপর হয়ে উঠেছে।

গত কয়েক বছরে কক্সবাজার-বান্দরবান সীমান্তবর্তী এলাকায় আরাকান আর্মি, আরসা, কেএনএফসহ একাধিক সশস্ত্র ও উগ্রপন্থী সংগঠনের তৎপরতা নিয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বারবার সতর্ক করে আসছেন। এর মধ্যে টিটিপির মতো আন্তর্জাতিকভাবে চিহ্নিত সংগঠনের সাথে বাংলাদেশী নাগরিকদের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার তথ্য উদ্বেগ আরো বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সীমান্ত এলাকায় নজরদারি জোরদার এবং প্রবাসীদের মধ্যে অনলাইন র‌্যাডিকালাইজেশন (উগ্রপন্থা ছড়িয়ে দেয়া) প্রতিরোধে সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে ঝুঁকি আরো বাড়তে পারে।

করাচি থেকে গ্রেফতার, দেশে জিজ্ঞাসাবাদ

তদন্ত সংশ্লিষ্ট তথ্যানুযায়ী, শেখ আজিজুল হাক্কানি ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর করাচি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার হন। প্রায় ২০ মাস পাকিস্তানে হেফাজতে থাকার পর গত ২ আগস্ট তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। দেশে ফেরার পরপরই তাকে বিমানবন্দর পুলিশ, টাস্কফোর্স ইন্টেরোগেশন সেল (টিএফআই) এবং পরবর্তীতে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট পর্যায়ক্রমে জিজ্ঞাসাবাদ করে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ২০২০ সালে সৌদি আরবে কর্মরত থাকাকালে অনলাইন প্রচারণার মাধ্যমে হাক্কানি ক্রমে উগ্রপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়েন। অভিযোগ রয়েছে, ‘নাসের’ নামে এক আফগান নাগরিক এবং বাংলাদেশী সহযোগী আল ইমরান ওরফে ইঞ্জিনিয়ার ইমরান হায়দারের মাধ্যমে তিনি টিটিপি নেটওয়ার্কে সম্পৃক্ত হন।

তদন্তকারীদের ধারণা, তিনি আফগানিস্তানে তালেবান নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ এবং পেশোয়ারের জামিয়া হাক্কানিয়া মাদরাসায় প্রশিক্ষণ নেয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, আগে চিহ্নিত নিহত ফয়সাল হোসেন, রতন ঢালি ও আহমেদ জোবায়েরসহ অন্য টিটিপি সদস্যদের সাথে হাক্কানির কোনো সংযোগ ছিল কি না- তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সাথে আল ইমরান ওরফে ইঞ্জিনিয়ার ইমরান হায়দার ও শামিন মাহফুজের কথিত কর্মকাণ্ড ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান ও অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক নয়া দিগন্ত-কে বলেন, ‘আমরা টিটিপি সদস্য শেখ আজিজুল হাক্কানিকে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রেখেছি। তার কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য এবং উদ্ধারকৃত ডিজিটাল ডিভাইসগুলো নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে।’

টিটিপির অনলাইন র‌্যাডিকালাইজেশন ও প্রবাসী শ্রমিকদের ঝুঁকির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘টিটিপি বাংলাদেশে অনলাইন ভিত্তিক প্রচারণা ও সদস্য সংগ্রহ করছে- এমন তথ্য আমরা পেয়েছি। তবে তদন্ত যেহেতু চলমান, তাই অনুমাননির্ভর কিছু না বলে তদন্ত শেষে সার্বিক বিষয়টি গণমাধ্যমকে জানানো হবে।’

টেকনাফে আরসা-টিটিপি সংশ্লিষ্ট হাজতির রিমান্ড

এ দিকে পৃথক এক ঘটনায় কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে আরসা সদস্য ও টিটিপি-সংশ্লিষ্ট রোহিঙ্গা হাজতি আবু ছৈয়দকে গত ২ জুলাই বিকেলে টেকনাফ থানায় নেয়া হয়। টেকনাফের জ্যেষ্ঠ বিচারক (সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট) আদালতের আদেশে এবং চট্টগ্রাম কাউন্টার টেরোরিজম/এন্টি টেরোরিজম ইউনিটের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তার দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আবু ছৈয়দের বাবার নাম মো: আকবর। তিনি টেকনাফের জাদিমুরা রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প নম্বর ২৭-এর বাসিন্দা। চলতি বছরের মে মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর ৯ ও ১৩ ধারায় টেকনাফ থানায় তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। রিমান্ড চলাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে এন্টি টেরোরিজম ইউনিটের (এটিইউ) প্রধানকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরবর্তীতে এটিইউর গোয়েন্দা প্রধান জানান, তিনি ছুটিতে থাকায় এ বিষয়ে তথ্য দিতে পারছেন না। চট্টগ্রাম এটিইউর দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিআইজি এবং মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রশিক্ষণে থাকায় তাদের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) এ এন এম সাজেদুর রহমান গ্রেফতারের সত্যতা নিশ্চিত করে নয়া দিগন্ত-কে বলেন, ‘এসব উগ্রপন্থা সংক্রান্ত মামলা মূলত ডিবি পুলিশ ও এটিইউ তদন্ত করে থাকে।’

সীমান্ত এলাকায় বাড়ছে ঝুঁকি

দু’টি ঘটনা একই সময়ে সামনে আসায় তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কক্সবাজার-টেকনাফ সীমান্ত এলাকা এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলো ক্রমেই আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের সংযোগস্থলে পরিণত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিদেশে অবস্থানকালে অনলাইন র‌্যাডিকালাইজেশন এবং সীমান্ত পারের যোগাযোগ- এই তিনের প্রভাবে এক ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক নিয়ে তাদের তদন্ত জোরদার করেছে। তবে তদন্ত প্রক্রিয়া এখনো চলমান থাকায় প্রাপ্ত তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তদন্ত শেষ হলে বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে এবং ততদিন পর্যন্ত সীমান্ত ও শরণার্থী শিবিরগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক নজরদারি অব্যাহত থাকবে।