বেলা ২টার অপেক্ষায় ছিল ৫ আগস্ট। আইএসপিআর থেকে বলা হয়েছিল, ২টায় ভাষণ দেবেন সেনাপ্রধান। এই সময়টুকু জাতিকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানানো হয়েছিল। ধৈর্য ধরার পর কী হবে, তা নিয়ে উৎকণ্ঠায় ছিল জাতি। চলছিল হিসাব-নিকাশ। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান কী বলবেন? শেখ হাসিনা ভাষণ না দিয়ে সেনাপ্রধানই বা কেন ভাষণ দেবেন?

এখানে আশা দেখেছিল বাংলাদেশ। আশা ছিল সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামানের ব্যক্তিত্ব নিয়েও। তার ব্যক্তিত্ব সাবেক সেনাপ্রধান, জেনারেল আজিজের মতো নয়। তার পরও শঙ্কা ছিল। ওয়াকার-উজ-জামান শেখ হাসিনার আত্মীয়।

সকাল পেরিয়ে দুপুর এলো। ঘড়ির কাঁটা ২টা পেরিয়ে গেল। সেনাপ্রধানের ভাষণ আর গণমাধ্যমে সম্প্রচার হয় না। এর মধ্যে শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছেন বলে খবর বেরোয় বিবিসিতে। ২টার ভাষণ বিকেল ৪টায় দেন জেনারেল ওয়াকার। তিনি জানান, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। সেই সাথে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হবে বলেও ঘোষণা দেন।

এ ঘোষণার পর বাংলাদেশ নামের লাইনচ্যুত ট্রেনটি আবার লাইনে তোলার প্রচেষ্টা শুরু হয়। অথচ ৩৬ জুলাইয়ের লড়াই আরো দীর্ঘ হওয়ার শঙ্কা ছিল। শঙ্কা ছিল গণভবন থেকে রক্তের নদী নেমে যাওয়ার। বুকের তাজা রক্ত নিয়ে গণভবনের দিকে ছুটে যাচ্ছিল মানুষের ঢেউ। এ ঢেউ থামানোর সাধ্য কারো ছিল না। কিন্তু সাধ ছিল শেখ হাসিনার। গুলি চালানোর হুকুম দিয়েছিলেন তিনি। সেই হুকুম তামিল না করে অগ্রাহ্য করেন সেনাপ্রধান। বন্দুকের নল নামিয়ে নেন তিনি। এ কারণে ইতিহাসে লেখা থাকবে তার নাম।

জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান দেশের ১৮তম সেনাপ্রধান। এর আগে এই পদে আরো ১৭ জন ছিলেন। ১৭ জনের ক’জনকে মনে রেখেছে মানুষ? মনে রেখেছে কয়েকজনকে। বিশেষ করে পাঁচজনের নাম আলোচিত, সমালোচিত। জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম, মইন ইউ আহমেদ ও ওয়াকার-উজ-জামান।

এই পাঁচ নামের প্রথমটি ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। শেষটিও বড় অক্ষরে লেখা থাকবে। বাকি তিনটি নাম, বাংলাদেশ নামের ট্রেনকে লাইনচ্যুত করার খাতায় লেখা।

প্রথম নাম জিয়াউর রহমান। ছিলেন তৃতীয় সেনাপ্রধান। পরে প্রেসিডেন্ট হন। মানুষ তাকে ‘রাষ্ট্রনায়ক’ হিসেবে বিবেচনা করে। একাত্তরে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ২৪ আগস্ট সেনাপ্রধান হন জিয়াউর রহমান। ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ ক্যু করে তাকে ক্যান্টনমেন্টে বন্দী করেন। ৭ নভেম্বর ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ আবার তাকে সেনাপ্রধানের আসনে বসায়। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তিনি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

Army-Chief

প্রেসিডেন্ট জিয়া বাকশালের অন্ধকার থেকে বাংলাদেশকে বের করে আনেন। আবার বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করেন। সংবাদপত্রের ওপর সেন্সরশিপ তুলে নেন। ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের’ মাধ্যমে পাহাড়ি ও সমতলের সব ধর্ম-বর্ণের মানুষকে এক সুতোয় বাঁধেন। বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে চেয়েছিলেন, সেই সাথে চেয়েছিলেন বিশ্বমঞ্চে শক্তি হিসেবে দাঁড় করাতে। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক জোট সার্কের স্বপ্নদ্রষ্টা তিনি। ভারত আর সোভিয়েত অক্ষের বাইরে চীন, ওআইসি ও পশ্চিমের সাথে ভারসাম্যের পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলেছিলেন। প্রেসিডেন্ট জিয়া অর্থনীতি আর প্রশাসনিক কাঠামোর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিয়ে গেছেন। সেই ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময়।

প্রেসিডেন্ট জিয়ার শাহাদতের পর সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ মসনদে বসেন। ‘উন্নত’ ও ‘উচ্চতর’ সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে পাশের দেশে গিয়েছিলেন তিনি। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। এমনকি জিয়া হত্যার ‘ব্লু প্রিন্ট’ও তারই ছিল বলে ধারণা করা হয়। পরিণত হন স্বৈরশাসকে। কিন্তু সব স্বৈরশাসকের পতন হয়। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে পতন হয় তার। তার পর যাত্রা শুরু করে শিশু গণতন্ত্র। সেই গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যার চেষ্টা করেন সপ্তম সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম।

১৯৯৬ সালের মে মাস; দেশ চালাচ্ছেন বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। জুন মাসে নির্বাচন। গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দুই রাজনৈতিক সামরিক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আব্দুর রহমান বিশ্বাস। এতে ক্ষিপ্ত হন সেনাপ্রধান নাসিম। প্রেসিডেন্টের আদেশ অমান্য করে বগুড়া, ময়মনসিংহ ও যশোর থেকে সেনাবহর ঢাকায় মার্চ করার নির্দেশ দেন তিনি। বঙ্গভবন ও টিভি স্টেশন দখলে নিতে চান।

প্রেসিডেন্ট আব্দুর রহমান বিশ্বাস তখন অটল ছিলেন, ২০ মে সকালে বরখাস্ত করেন জেনারেল নাসিমকে। প্রেসিডেন্টের পক্ষে অবস্থান নেন নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ইমামুজ্জামান চৌধুরী। সরিয়ে দেয়া হয় আরিচাঘাটের সব ফেরি। ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডে বসানো হয় ট্যাংক। আটকে দেয়া হয় জেনারেল নাসিমের বিদ্রোহীদের। কোনো রক্তপাত ছাড়া ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ব্যর্থ করে দেয়া হয় সম্ভাব্য ক্যু।

প্রেসিডেন্ট আব্দুর রহমান বিশ্বাস, জাতির বিশ্বাসের মর্যাদা রেখেছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহমেদ পারেননি। তার ঘাড়ে চেপে বসেছিলেন ১৪তম সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উদ্দিন আহমেদ। ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে জরুরি অবস্থা জারি করতে বাধ্য করেন তিনি। নাসিম যেখানে ব্যর্থ হয়েছিলেন, সেটিকে শতগুণে সফল করে দেন মইন ইউ আহমেদ।

জরুরি অবস্থার মধ্য দিয়ে আসে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি, মানে ‘ওয়ান-ইলেভেন’। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের নামমাত্র প্রধান ছিলেন ড. ফখরুদ্দীন আহমদ। তিন ‘উদ্দিনের’ ‘জরুরি সরকার’ বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের জমি উর্বর করে দিয়ে যায়। ওয়ান-ইলেভেনের মাধ্যমে জাতির ঘাড়ে চেপে বসে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী রেজিম। জাতিকে এর খেসারত দিতে হয় দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর। তিন ‘উদ্দিন’-এর খেসারত হিসেবে ঘটে পিলখানা হত্যাকাণ্ড। হারাতে হয় ৫৭ চৌকস সেনাকর্মকর্তাকে। ঘটে শাপলা গণহত্যা, আলেমদের ওপর নির্যাতন। গুম-খুন ও নির্মম নির্যাতন। পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা হয় মানুষকে।

তার পর আসে ২০২৪ সাল। ফ্যাসিবাদ তখন বেপরোয়া। আবু সাঈদরা এক হাতে লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে যান। বুক পেতে দেন সরাসরি গুলির মুখে। রক্ত ঝরে। হেলিকপ্টার থেকেও গুলি করা হয়। মঞ্চে তখন মুখ্য ভূমিকায় আবির্ভূত হন জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তবে চব্বিশে ছাত্র-জনতার মরণপণ আন্দোলনের সময় শেখ হাসিনার একান্ত অনুগত সেনাকর্মকর্তাদের ভূমিকা ছিল ভয়ঙ্কর। হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালাতে দেখা গেছে তাদের। ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালিয়েছেন তারা। ছাত্রলীগ-যুবলীগ আর পুলিশ নৃশংস হয়ে হয়ে উঠেছিল।

চব্বিশের অভ্যুত্থানের আগমুহূর্তে সেনাবাহিনীর ভেতরে কী ঘটেছিল, সেসব নিয়ে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন খালেদা জিয়ার নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) ফজলে এলাহী আকবর। একটি দৈনিকে প্রকাশ হওয়া ওই সাক্ষাৎকার ৫ আগস্টের প্রেক্ষাপট খোলাসা করে দিয়েছে। ফজলে এলাহী আকবর জানিয়েছেন, ৪ আগস্ট দিনগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে সেনাপ্রধান তাকে ফোন করেছিলেন। ফোনে পরদিন সকাল ১০টায় তাকে যাওয়ার অনুরোধ করেন ওয়াকার-উজ-জামান। ৫ আগস্ট আকবর সেখানে যান। ওয়াকার জানান, তিনি আর এক ফোঁটা রক্তপাত চান না। ক্ষমতা নিতে চান না। তিনি চান রাজনৈতিক সমাধান। আকবরকে দায়িত্ব দেন বিএনপি, জামায়াতসহ দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সাথে দ্রুত যোগাযোগ করতে। তারা যেখানে বসতে চান, প্রয়োজনে সেখানে গিয়েও কথা বলতে প্রস্তুত তিনি।

তার পর কথা হয়। কয়েক দিনের মধ্যে গঠন হয় অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকার নির্বাচনের ব্যবস্থা করল। তার পর নির্বাচিত সরকার এলো। এই সরকারের সময়ও সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান।

সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াকার-উজ-জামানকে আমরা দেখছি একটু ভিন্নভাবে। তিনি স্বভাবে নম্র। ধর্মভীরু। পবিত্র কুরআন পড়েন, কুরআন থেকে আয়াত উদ্ধৃত করেন। হজ পালন করে ফেরার পর মানুষ দেখছেন তার শ্মশ্রƒমণ্ডিত চেহারা। একজন সেনাপ্রধানের এমন চেহারা দেশে এই প্রথম। কেবল চেহারায় নয়, শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে সেনাসদস্যদের নৈতিক ও আত্মিক শক্তি বাড়াতে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন তিনি। সেনাসদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য কিরাত প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছেন। দ্বীনি শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেনাবাহিনীতে হজ ও ওমরাহ পালনের নিয়ম সহজ করা হয়েছে। আর্মি ইসলামিক ইনস্টিটিউট উদ্বোধন করেছেন তিনি। সহজে অনুমেয়, এসব উদ্যোগে সরকারপ্রধানের সমর্থন না থাকলে তা সম্ভব ছিল না?

অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, সেনাবাহিনীতে ধর্মচর্চা কেন? কিন্তু সামরিক মনোবিজ্ঞান বলে, জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করতে গেলে একজন সৈনিকের সবচেয়ে বড় শক্তি হয় ঈমান আর নৈতিক মনোবল। এই মনোবল যুদ্ধের মাঠে যেমন শক্তি জোগায়, তেমনি সাধারণ মানুষের সাথেও যোগাযোগ তৈরি হয়।

যোগাযোগের এ সেতু তৈরির উদ্যোগ ওয়াকার-উজ-জামান নিয়েছেন। এটি তার কৃতিত্ব। তবে সব কিছু ছাপিয়ে গেছে তার ৫ আগস্টের ভূমিকা। সেনাবাহিনীর জনবান্ধব ভূমিকায় রক্তনদী থেকে রক্ষা পেয়েছে দেশ। আর সেনাপ্রধান হিসেবে তিনি যদি শেখ হাসিনার অনুগত থাকতেন, তাহলে এ লড়াই আরো দীর্ঘ হতো। এ কারণেই বর্তমান সেনাপ্রধানের নাম দেশের ইতিহাসে ইতিবাচকভাবে থেকে যাবে।

আগামীতে তার অবস্থান তার কাজের মধ্য দিয়েই নিরূপিত হবে। কাজের ভিত্তিতে ইতিহাস তার মূল্যায়ন করবে। তবে ইতিহাসের অলঙ্ঘনীয় নিয়ম হলো, শেষ ভালো যার, সব ভালো তার।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

smmoshahid@gmail.com