ঢাকা সফরে এসে সার্জিও গোর ঘোষণা দিয়েছেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে এবং ওয়াশিংটন নতুন সরকারের নেতৃত্বের ওপর পূর্ণ আস্থাশীল। এই আস্থার সুবাদেই বাংলাদেশ সংক্রান্ত মার্কিন ভ্রমণ সতর্কতা (ট্র্যাভেল অ্যাডভাইজরি) ইতিবাচকভাবে সংশোধন করা হয়েছে, যা বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশকে ‘বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত’ বলে এক শক্তিশালী সবুজসঙ্কেত পাঠায়।

তবে ওয়াশিংটনের এই হঠাৎ আস্থা প্রদর্শন কেবল সৌজন্যের ফ্রেমে বাঁধা কোনো বার্তা নয়; এর নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের আদান-প্রদান। বিশেষ দূত সার্জিও গোর স্পষ্ট করেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ শৃঙ্খল এবং স্পর্শকাতর খনিজসম্পদের নিরাপদ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গৃহীত ‘প্যাক্স সিলিকা’ উদ্যোগে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে। একই সাথে সয়াবিন, তুলা ও গমের মতো কৃষিপণ্যের বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সরাসরি বিনিয়োগ এবং মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) স্থগিত কার্যক্রম পুনরায় চালুর মতো ইতিবাচক প্রস্তাব সামনে আনা হয়েছে। এমনকি রোহিঙ্গা সঙ্কট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক অর্থায়নের অর্ধেকের বেশি সরবরাহকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক সহায়তার কথাও বৈঠকে পুনর্ব্যক্ত হয়।

দৃশ্যত এসব প্রস্তাব অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বহুপক্ষীয় বাণিজ্যের জন্য সহায়ক মনে হলেও, এর পেছনে থাকা ওয়াশিংটনের কৌশলগত অবস্থান এবং সদ্য ক্ষমতার পালাবদলের সন্ধিক্ষণে গৃহীত নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলোকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। মূলত সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ঠিক প্রাক্কালে ক্ষমতা ছেড়ে যাওয়া ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের সাথে মার্কিন সরকারের যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও কৌশলগত বোঝাপড়া তৈরি হয়েছিল, তা গুরুত্বপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী বাণিজ্য ও শুল্কনীতি, অন্য দিকে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের প্রভাব রাখার বিষয় এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক।

আমেরিকার সাথে বাণিজ্যচুক্তির নীতিগত কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশ তাদের বোয়িং বিমান কিনবে। প্রতিরক্ষা সরঞ্জামাদি আধুনিকায়নে তাদের সমরাস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি আমদানি করবে। আমেরিকান করপোরেট জায়ান্টগুলো বাংলাদেশে সরাসরি অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সংযোজনের (অ্যাসেম্বলিং) বিনিয়োগে সুযোগ পাবে।

ইতোমধ্যে ‘এল-৩ হ্যারিস’ নামক একটি প্রভাবশালী মার্কিন সামরিক প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে তাদের সরঞ্জাম সংযোজন করার প্রাথমিক নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে। কাগজপত্রে ‘প্রযুক্তি স্থানান্তর’ বা ‘টেকনোলজি ট্রান্সফার’-এর কথা বলা হয়েছে। বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র কখনো তাদের মৌলিক সামরিক প্রযুক্তি, ব্লু-প্রিন্ট বা মূল অ্যালগরিদম অন্য কোনো দেশের কাছে হস্তান্তর করে না। এই প্রকল্পের আওতায় আমেরিকা থেকে প্রস্তুতকৃত পৃথক যন্ত্রাংশ এনে স্থানীয় কারখানায় জোড়া লাগানো হবে। ফলে দেশে কোনো প্রকৃত কারিগরি দক্ষতা বা স্বাধীন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি হবে না।

নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের অব্যবহিত পরেই ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পাঠানো অভিনন্দন বার্তায় দ্বিপক্ষীয় নিয়মিত প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো দ্রুত সম্পন্ন ও বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন। এর পেছনে আমেরিকার দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের প্রভাব বিস্তার এবং বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে শক্ত অবস্থান তৈরির ইচ্ছার প্রতিফলন দেখা যায়। দেশের সমরাস্ত্রের এক বড় অংশের বিশ্বস্ত সরবরাহকারী রাষ্ট্র চীন এবং প্রতিবেশী ভারতের সাথে বাংলাদেশের চলমান কৌশলগত বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। চীন থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পাওয়ার যে ধারা বাংলাদেশে বজায় ছিল তা ক্ষুণ্ন হতে পারে।

ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইচ্ছেমতো শুল্ক চাপানো ও কমানোর চরম খামখেয়ালি খেলা শুরু করেছেন। আগে যে বাণিজ্য ঘাটতিকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, এবার তার সাথে যুক্ত করা হয়েছে ‘জোরপূর্বক শ্রম’ বা ‘বাধ্যতামূলক শ্রম’ নামক এক নতুন অজুহাত। ওয়াশিংটন দাবি করছে, পৃথিবীর অনেক দেশ দাসপ্রথা বা বলপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে তৈরি পণ্য রফতানি করছে, যা ঠেকাতে তারা এই শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করছে।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ট্রাম্পের আগে আরোপিত শুল্ক অবৈধ ঘোষিত হওয়ার পর অস্থায়ী মেয়াদের আইনি ফাঁক গলে আবার নতুন করে তদন্তের নামে বিশ্বজুড়ে শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়েছে। অথচ কৌতূহলের বিষয় হলো- যে চীনকে ওয়াশিংটন বহুদিন ধরে জোরপূর্বক শ্রমের প্রধান উৎস হিসেবে অভিযুক্ত করে আসছিল, সেই চীনকে এবার ট্রাম্প একপ্রকার ছাড় দিতে বাধ্য হয়েছেন। চীনকে ছাড় দেয়ার একমাত্র কারণ- দুর্লভ খনিজ ও সেমিকন্ডাক্টর তৈরির কাঁচামালের ওপর বেইজিংয়ের একক নিয়ন্ত্রণ। বেইজিং যখনই পাল্টা অর্থনৈতিক আঘাত হানার পূর্ণ শক্তি প্রদর্শন করেছে, ট্রাম্প পিছু হটতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু অন্য দিকে ট্রাম্পের নতিস্বীকারের সংস্কৃতিকে যারা ভয় পেয়ে মেনে নিয়েছে, সেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা কানাডার মতো পক্ষগুলোর ওপর চাপানো হয়েছে আরো বেশি শুল্ক।

ট্রাম্পের ‘জোরপূর্বক শ্রম’ প্রতিরোধের বার্তা কতটা ভণ্ডামিপূর্ণ, তা ফুটে ওঠে তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ শ্রম কাঠামোর দিকে তাকালে। আমেরিকা নিজেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবাধিকার ও মুক্ত শ্রমের বড় বুলি আওড়ায়, অথচ নিজেদের ভূখণ্ডেই সরকারি ব্যবস্থার অধীনে দাসপ্রথা বহাল রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ঐতিহাসিক ত্রয়োদশ সংশোধনীর ভেতর একটি বিপজ্জনক আইনি ফাঁক রয়ে গেছে- যেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদের ক্ষেত্রে শাস্তি হিসেবে বিনামূল্যে ‘দাসত্ব’ বা ‘বাধ্যতামূলক শ্রম’ করানো সম্পূর্ণরূপে বৈধ। এই একটি ধারার ওপর ভিত্তি করেই আমেরিকার এক-চতুর্থাংশের কম অঙ্গরাজ্যে বাধ্যতামূলক শ্রম নিষিদ্ধ করা গেছে, বাকি পুরো দেশে কয়েদিদের দিয়ে বিনামূল্যে কারখানা চালানো হচ্ছে। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে বাস করলেও, পৃথিবীর মোট জেলবন্দীর প্রায় ২৫ শতাংশ অবস্থান করছে সেই দেশের জেলখানাগুলোতে।

গবেষণায় দেখা যায়, সেখানে প্রায় ১৪ লাখ বন্দীকে অতি সামান্য মজুরিতে বড় বড় করপোরেট কারখানায় খাটানো হয়, যা আমেরিকার মোট উৎপাদন শ্রমশক্তির একটি বিরাট অংশ গঠন করে। বিশ্বখ্যাত মার্কিন ব্র্যান্ডগুলোর সরবরাহ শৃঙ্খলের সাথে এই কয়েদিদের বাধ্যতামূলক শ্রম প্রত্যক্ষ যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র নিজের দেশের ভেতরে এই অমানবিক শ্রমব্যবস্থা গোপন রেখে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অন্যদের ওপর শুল্ক আরোপের নৈতিক অধিকার হারিয়েছে। তবুও ট্রাম্পের মতো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভয় সৃষ্টি করা ব্যক্তিত্বের সামনে যখন কোনো দেশ বা জোট দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারছে না, তখন ট্রাম্প আরো আগ্রাসী হয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্য শৃঙ্খলকে নিজের দেশের দিকে টেনে নেয়ার চেষ্টা করছেন। তবে এই নীতির ফলে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব উৎপাদন খাত পুনরুজ্জীবিত হয়নি; বরং বাইডেন প্রশাসনের আমলে যেখানে চাকরি বেড়েছিল, ট্রাম্পের মেয়াদে কারখানা খাতে চাকরি কমে গেছে এবং পণ্যে মার্কিন বাণিজ্যঘাটতি ইতিহাস ছুঁয়ে ১.২৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

এই উত্তাল ও বিশৃঙ্খল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা অত্যন্ত স্পর্শকাতর। সদ্য নির্বাচিত সরকারের সামনে এক দিকে অর্থনৈতিক মন্দা কাটানো, অন্য দিকে ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার কঠিন চ্যালেঞ্জ। সার্জিও গোরের প্রস্তাবিত এআই বা বাণিজ্যচুক্তি অবশ্যই সুযোগ তৈরি করে, তবে মার্কিন প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সমীকরণ ভুলে গেলে চলবে না।

মার্কিন করপোরেশন ‘এল-৩ হ্যারিস’কে সুযোগ দেয়ার আগে বিষয়টির সামরিক ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন আবার করা আবশ্যক। যে প্রযুক্তি দেশীয় প্রকৌশলীদের স্বাধীন সার্বভৌম সক্ষমতা দেয় না, কেবল বিদেশী পার্টস জোড়া লাগানোর মেকানিক বানিয়ে রাখে; তা প্রযুক্তি স্থানান্তর হতে পারে না। একইভাবে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে চীনের মতো পরীক্ষিত বাণিজ্যিক অংশীদারদের সাথে সম্পর্কের গভীরতা নষ্ট করা মোটেও দূরদর্শী পদক্ষেপ হবে না।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

rintuanowar.com