একটি দেশের স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকা অনেকটা এখন নির্ভর করে তার জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার নিশ্চয়তায়। ইরানের ওপর আক্রমণের জের ধরে হরমুজ প্রণালী অবরোধের পর জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উন্নত ও প্রভাবশালী দেশগুলো জ্বালানিপ্রাপ্তি ও এর পরিবহন নিয়ে এখন উদ্বিগ্ন। যেকোনো মূল্যে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে নতুন নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে। এমনকি বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান রুটগুলো নিয়ন্ত্রণে নেয়ার চেষ্টাও করছে। যাতে বিশেষ পরিস্থিতিতে সঙ্কটে পড়তে না হয়। এ সময়ে জ্বালানি খাতে বাংলাদেশ সরকার বেসরকারি অংশগ্রহণ নিয়ে একটা খসড়া নীতি প্রণয়নের কাজ করছে, এমন খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। দেশের বড় বড় কেম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে একচেটিয়া ব্যবসার বহু অভিযোগ সামনে এনে জ্বালানি নীতির এমন পরিবর্তনে উদ্বেগ জানিয়েছে নাগরিকসমাজ ও বিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠী।

জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভর। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) দেশে এর আমদানি ও বিপণন করে। ফলে এর ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে। তারপরও অসাধু চক্র সঙ্কটকালে সুযোগ হাতছাড়া করে না। ইরানের ওপর আক্রমণের পর এ ধরনের একটি সমস্যায় পড়তে হয় দেশকে। পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার পরও কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে নাজুক অবস্থার উদ্ভব করা হয়। বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের খসড়া নীতি প্রণয়নের মধ্যে দেখা গেল, একটি বৃহৎ কোম্পানি প্রায় ৩৪ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির আবেদন জানিয়েছে সরকারের কাছে। এটি দেশের মোট আমদানির অর্ধেক। সরকারের নতুন নীতি প্রণয়নের সাথে বিষয়টি মিলিয়ে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের বৃহৎ কোম্পানিগুলোর দেশের বাজার নিয়ন্ত্রণের নেতিবাচক খবর আছে। বিশেষ পরিস্থিতিতে গ্রাহককে অসহায় করে বিপুল ফায়দা লুটে নিতেও দেখা গেছে। ভোজ্যতেলসহ কিছু নিত্যভোগ্যপণ্যে সিন্ডিকেট গড়ে পকেট কাটার নজির আছে।

বাংলাদেশ জ্বালানি নিয়ে বিপদে আছে। ফ্যাসিবাদী সরকার রেন্টাল-কুইক রেন্টাল করে জনগণের ঘাড়ে বিদ্যুতের বাড়তি দাম চাপিয়ে দেয়। ভারতীয় কোম্পানি আদানির সাথে এক অসম চুক্তি করে দেশকে ফাঁসিয়ে দিয়ে গেছে। বিদ্যুতের উচ্চদামে দেশের মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো অর্থনৈতিক চাপে আছে। তবু বিদ্যুতের দাম সামনে আরো বাড়ানোর ঘোষণা আছে। এ অবস্থায় জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিপিসিকে যখন আরো সক্ষম করতে ঢেলে সাজানো দরকার ছিল, তখন ‘বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানির আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনসংক্রান্ত নীতিমালা, ২০২৬’ শিরোনামে খসড়া নীতিপ্রণয়ন সন্দেহ তৈরি করেছে। বেসরকারি যেসব প্রতিষ্ঠানকে জ্বালানি আমদানির অনুমতি দেয়া হবে সেগুলোর যদি জনবান্ধব হওয়ার সুনাম থাকত, তাহলে একটি কথা ছিল। এ ছাড়া বিপিসি এ কাজ করতে গিয়ে বড় ধরনের ব্যর্থতা দেখিয়েছে এমন নজিরও নেই।

রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় জ্বালানি তেল ভবিষ্যতে আরো বড় অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। কারণ, এর সাথে পুরো অর্থনীতি জড়িত। এ অবস্থায় অনির্ভরযোগ্য বেসরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে এর দায়িত্ব ছেড়ে দেয়া কোনোভাবে ঠিক হবে না। জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহ পুরোপুরি সরকারের অধীনে থাকাটাই নিরাপদ।