বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে শেখ হাসিনা প্রতিপক্ষ নিধনের অস্ত্র বানিয়েছিলেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিঃশেষ করে দিতে আদালতকে ব্যবহারের এমন নিকৃষ্ট নজির বিশ্ব ইতিহাসে দ্বিতীয়টি রয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। নিজের দলের নেতাদের হত্যার বিচার না করে তাকেও প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কাজে লাগিয়েছেন। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার জ্বলন্ত উদাহরণ। যে হামলা থেকে শেখ হাসিনা নিজে বেঁচে গেলেও দলের উচ্চপর্যায়ের নেতাসহ ২৪ জন প্রাণ হারান। বিশেষ আদালত গঠন করেও তিনি বিরোধীদের বিচারিক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। অবশেষে শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার পর বিচারের নামে ওই সব অনাচারের অবিশ্বাস্য ঘটনা সামনে আসছে। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে সঙ্গতিতে দাঁড় করাতে হলে ওই সময়ে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ সব অবিচারের প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে হবে।
২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার গতিপথ ঘুরিয়ে দেয়। বিরোধী দল বিএনপি-জামায়াত নেতাদের এতে আসামি করা হয়। শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যে এর দায় বিরোধীদের ওপর চাপিয়ে বক্তব্য দিতে শুরু করেন। এ দিকে ওই হামলার তদন্তে আগত যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডকে নিবৃত্ত করা হয়, যেন ঘটনায় নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ কেউ করতে না পারেন। মুফতি হান্নানকে দিয়ে জোরপূর্বক বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে জবানবন্দী নেয়া হয়। এ সময় তাকে বছরের অধিককাল নজিরবিহীন রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন চালানো হয়। পরে মুফতি হান্নান তার আগের দেয়া জবাবন্দী বাতিলের আবেদন করলেও তা গ্রাহ্য করা হয়নি। এ দিকে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে সবকিছু আড়াল করা হয়। বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়, গ্রেনেড হামলা মামলাকে নিজেদের সুবিধার্থে ভিন্ন খাতে পরিচালিত করা হয়েছে।
শুধু তাই নয়, শেখ হাসিনার আমলে গঠিত কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধ আদালতে সংঘটিত হয় শতাব্দীর সবচেয়ে বড় প্রহসন। সেখানে হত্যা-খুন-ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের কল্পিত অভিযোগ এনে নিরপরাধ ছয় রাজনৈতিক নেতাকে বিচারিক হত্যা করা হয়। সাক্ষীদের সেফ হাউজে এনে আসামিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা হয়। যারা পালিয়ে গিয়ে মিথ্যা সাক্ষী এড়াতে চেয়েছিলেন, তারাও রেহাই পাননি। পরিবারের সদস্যদের অপহরণ করে আটকে রেখে তাদেরও বাধ্য করা হয়। সেফ হাউজে সাক্ষীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। তারা আদালতে গিয়ে কী বলবেন; শিখিয়ে দেয়া হতো। যারা আদালতে গিয়ে ঠিকমতো সাক্ষী দিতে ব্যর্থ হতেন, তাদের ওপর চালানো হতো নির্যাতন। তৎকালীন আইনমন্ত্রীসহ বিচারকাজে জড়িত শীর্ষ ব্যক্তিরা হাজির হয়ে প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন। নতুন পরিস্থিতিতে ওই সব সাক্ষী তাদের দুঃসহ পরিস্থিতির কথা আদালতে এসে বলছেন। তখন সাক্ষী হওয়ায় এখন তারা ক্ষমা চাইছেন।
বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি আদালত হাসিনার আদেশের অধীন করা হয়। শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, এর ফলে সাধারণ নাগরিকদের বিচার পাওয়ার অধিকার সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। বিচারব্যবস্থাকে সে অবস্থা থেকে উদ্ধার করতে হলে প্রথমত, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা ও কথিত মানবতাবিরোধী আদলাতে যে বড় বড় অবিচার হয়েছে; সেগুলোর প্রতিকার করতে হবে। যারা এ দুষ্কর্মে শেখ হাসিনার সহযোগী হয়েছেন, তাদের প্রত্যেককে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।