দেশে শিল্প বিকাশে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্যাস সঙ্কট। সরবরাহ না থাকায় বিতরণ কোম্পানিগুলো নতুন শিল্পে গ্যাসসংযোগ দিতে পারছে না। সমস্যা দু’-চার মাস বা বছরের নয়, প্রয়োজনীয় সবরকম প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে, টাকা জমা দিয়ে বছরের পর বছর অপেক্ষায় আছে শত শত শিল্পপ্রতিষ্ঠান। সংযোগ না পাওয়ায় কারখানা চালু করতে পারছে না। এর ফলে সম্ভাব্য কর্মসংস্থান হচ্ছে না, যন্ত্রপাতি অচল হয়ে পড়ছে। ব্যাংক ঋণের সুদ ক্রমাগত বাড়ছে। অনেক উদ্যোক্তা ঋণখেলাপি হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন।
একটি জাতীয় দৈনিকের খবরে জানা যায়, তিতাস, জালালাবাদ, কর্ণফুলী ও বাখরাবাদ গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কাছে বর্তমানে প্রায় দুই হাজার গ্যাস সংযোগের আবেদন জমা আছে। গ্যাসের সরবরাহ না থাকায় এসব সংযোগ বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এক তিতাসের কাছেই টাকা-পয়সা জমা দিয়ে অপেক্ষায় আছে প্রায় ৫০০ প্রতিষ্ঠান। আবেদন জমা আছে প্রায় দেড় হাজার।
অভিযোগের তীর সেই স্বৈরাচারী সরকারের দিকে। গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ না বাড়িয়েই বিপুলসংখ্যক শিল্প সংযোগের অনুমোদন দেয়া হয়। ফলে ব্যাংকঋণ নিয়ে কারখানা নির্মাণ করা অনেক উদ্যোক্তা উৎপাদনে যেতে না পেরে ঋণখেলাপির ঝুঁকিতে পড়েছেন।
বর্তমানে দু’টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল-এফএসআরইউ থেকে বাড়তি গ্যাস সরবরাহ চলছে। এর বাইরে অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব নয়। অথচ শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রফতানি আয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিসহ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
আশার কথা, সরকার নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু নতুন গ্যাসক্ষেত্র পাওয়া, গ্যাস তোলা ও সরবরাহ দেয়া যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ। তত দিনে সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোর আদৌ অস্তিত্ব থাকবে না।
এটি আমাদের জাতিগত অদক্ষতা ও স্থবিরতার লক্ষণ। এক দিকে বলা হচ্ছে শিল্পের বিকাশ, কর্মসংস্থান বাড়ানোর কথা, অন্য দিকে জ্বালানির অভাবে শিল্প প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
শিল্পের অনুমোদন এমন পর্যায়ে রাখা দরকার যাতে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি সক্ষমতার বিবেচনায় প্রতিটি কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি চালু রাখা যায়। এটি শুধু শিল্পের ক্ষেত্রে বা শুধু গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে নয়। জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই চাহিদা ও জোগানের সামর্থ্যরে মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।
গত চার বা পাঁচ বছর ধরে যেসব শিল্প-কারখানা গ্যাসসংযোগের অপেক্ষায় আছে, তাদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন জ্বালানিমন্ত্রী। কিন্তু এ জন্য যুগের পর যুগ অপেক্ষার সুযোগ নেই। সরকারকে এমন ব্যবস্থা করতে হবে যাতে উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ করা যায়। বর্তমান সরকার বন্ধ থাকা বেশ কিছু শিল্প নতুন বিনিয়োগ দিয়ে চালু করতে যাচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহ করা না গেলে এ উদ্যোগও নিশ্চিত ব্যর্থ হবে।
আসলে সমস্যা ঝুলিয়ে রাখার প্রবণতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা দরকার। সরকারকে এমন সক্রিয় হতে হবে যেন, কোনো সমস্যাই হস্তক্ষেপহীনভাবে ঝুলে না থাকে।