বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ, বিশেষ করে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগে অনিয়ম দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। এই খাতে স্বচ্ছতা প্রায় অনুপস্থিত ছিল। নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় চাপ, আর্থিক লেনদেন কাজ করত। এতে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় দেখা দিয়েছে অদক্ষতা। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ২০০৫ সালে সহকারী শিক্ষকসহ বিভিন্ন পদে নিয়োগের জন্য গঠন হয় ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ’-এনটিআরসিএ। এর পর থেকে শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার মাধ্যমে সনদ দেয়া শুরু হয়। ২০১৫ সালের পর থেকে মেধার ভিত্তিতে সরাসরি সুপারিশের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ চালু করা হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগে অস্বচ্ছতা থেকেই যায়।

এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষক নিয়োগে নতুন কৌশল নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি সাহসী ও প্রশংসনীয়।

ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির একচ্ছত্র ক্ষমতা খর্ব করে এনটিআরসিএর হাতে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এটি কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; বরং শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারে একটি মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। কারণ দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় পর্যায়ের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অভিযোগ ছিল ‘ওপেন সিক্রেট’।

নতুন এই কৌশলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো— মেধাভিত্তিক নির্বাচন। লিখিত, মৌখিক ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সমন্বয়ে ১০০ নম্বরের একটি সুস্পষ্ট কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় থাকবে ৮০ নম্বর। এতে প্রার্থীর বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ও প্রশাসনিক সক্ষমতা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সাথে লিখিত ও মৌখিক উভয় পরীক্ষায় ন্যূনতম ৪০ শতাংশ নম্বর বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মাধ্যমে অযোগ্য প্রার্থীদের ছেঁটে ফেলা সম্ভব হবে। মেধাতালিকা ও প্রার্থীর পছন্দক্রম অনুযায়ী নিয়োগ সুপারিশের বিধানেও পক্ষপাতের সুযোগ কমাবে।

আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো— এই সংস্কারের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকা প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার প্রশাসনিক পদ পূরণ হওয়ার পথ খুলেছে। এসব পদে অচলাবস্থার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রশাসনিক দুর্বলতায় ভোগছিল।

এই উদ্যোগকে টেকসই ও কার্যকর করতে কিছু বিষয়ে বিশেষ নজর দেয়া জরুরি। প্রথমত, নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও মূল্যায়নে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। এখানে গাফিলতি থাকলে পুরো সংস্কার উদ্যোগের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দ্বিতীয়ত, মৌখিক পরীক্ষায় স্বচ্ছতা হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। এ ক্ষেত্রে বোর্ড গঠন ও নম্বর দেয়ার মানদণ্ড স্পষ্ট করতে হবে। এগুলো লিখিতভাবে প্রকাশ করাও দরকার।

তৃতীয়ত, এনটিআরসিএর ওপর এই নিয়োগের চাপ সামাল দিতে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা যতটা দরকার, ততটা করতে হবে। জনবল, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও সময়সূচির ক্ষেত্রে প্রস্তুতি না থাকলে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বিলম্ব হওয়ার শঙ্কা আছে। চতুর্থত, নিয়োগের পরও প্রতিষ্ঠান প্রধানদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কর্মমূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা দরকার। এতে নিয়োগ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে শিক্ষার মান উন্নয়নে বাস্তব হাতিয়ার হবে।

শিক্ষক নিয়োগে এই নতুন কৌশল শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃঢ় বার্তা। এটি প্রমাণ করে, সঠিক রাজনৈতিক ইচ্ছা থাকলে জটিল সমস্যারও কার্যকর সমাধান সম্ভব। এখন প্রয়োজন এই উদ্যোগকে ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা। এতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সত্যিকার অর্থে মেধা, নৈতিকতা ও দক্ষতার ওপর দাঁড়াতে পারবে বলে আশা করা যায়।