ইনুর সাজা ‘অপরাধের তুলনায় নগণ্য’ আপিল বিভাগে দীর্ঘসূত্রতার শঙ্কা
Printed Edition
- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ কর্তৃক প্রদত্ত ১০ বছরের কারাদণ্ডের রায়টি দেশের বিচারিক কাঠামো ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের প্রয়োগ নিয়ে আইনি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসংশ্লিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এটি দ্বিতীয় কোনো শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার দণ্ড। তবে সাজাগুলোর যুগপৎ কার্যকারিতা এবং সুনির্দিষ্ট কিছু খালাসের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষ উভয় মহলেই তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে, যা মামলাটিকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এক দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম রায়ের আইনি ভিত্তির স্ববিরোধিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার এই বিশ্লেষণটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সংবিধির ‘কমন পারপাস’ বা ‘যৌথ চক্রান্ত’ তত্ত্বের আলোকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাজুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের স্পিরিট অনুযায়ী, যখন কোনো রাষ্ট্রযন্ত্র বা নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, তখন সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত প্রত্যেকের দায় সমানভাবে বর্তায়।’
তিনি রায়ের ৭ নম্বর চার্জের (টেলিফোন কথোপকথন ও চক্রান্ত) উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করেন যে, ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই ১৪-দলীয় জোটের নীতিনির্ধারণী বৈঠক এবং ৪ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে আসামির যে কথোপকথন রেকর্ড প্রমাণিত হয়েছে, তা স্পষ্ট করে যে হাসানুল হক ইনু সেই অপরাধের চক্রান্তে সক্রিয় অংশীদার ছিলেন।
তাজুল ইসলামের যুক্তি, ‘যে যৌথ চক্রান্ত ও দেখামাত্র গুলির (শুট অ্যাট সাইট) সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সারা দেশে নির্বিচারে বেসামরিক নাগরিক হত্যা করা হলো, সেই একই চক্রান্তের দায়ে যদি মূল অপরাধী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়, তবে সেই চক্রান্তের অন্যতম কুশীলব ও নীতিনির্ধারককে কেবল ১০ বছরের ‘লঘু দণ্ড’ দেয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট, ১৯৭৩-এর মূল স্পিরিটের সাথে সাংঘর্ষিক।
তার মতে, এই বিশেষ আইনের মূল উদ্দেশ্যই হলো ‘অপরাধের চেয়েও বড় অপরাধের’ ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা, যদি না আসামির সংশ্লিষ্টতা একেবারেই নগণ্য প্রমাণিত হয়।
ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো: মনজুরুল বাসিত রায়ের পর্যবেক্ষণে যে তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করেছেন, তার সাথে সাবেক চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্যের আইনি উপাদানের স্পষ্ট মিল রয়েছে। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত স্বীকার করেছেন যে, শেখ হাসিনার সাথে ইনুর উদ্ধারকৃত অডিও রেকর্ড প্রমাণ করে তিনি কেবল একজন ‘নিষ্ক্রিয় দর্শক’ ছিলেন না। বরং আন্দোলন কঠোর হস্তে দমন, সামরিক আইন বজায় রাখা এবং বিরোধীদের ওপর দমন পীড়নকে বৈধতা দিতে ‘জঙ্গি কার্ড’ খেলার কৌশলে তিনি সরাসরি যুক্ত ও উস্কানিদাতা ছিলেন।
আইন বিশ্লেষকরা বলছেন, আদালতের এই পর্যবেক্ষণ এবং তাজুল ইসলামের বিশ্লেষণ একই বিন্দুতে মিলেছে যে, আসামির পূর্ণ জ্ঞান (অপরাধমূলক মনস্তত্ত্ব) ছিল এবং তিনি অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করেছেন। তবে অমিলটি তৈরি হয়েছে সাজা নির্ধারণের ক্ষেত্রে। আদালত আসামির সরাসরি মাঠপর্যায়ে উপস্থিতি না থাকার বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে প্রচলিত দেশীয় ফৌজদারি কার্যবিধির আদলে সাজা কমিয়েছেন। অন্য দিকে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে তাজুল ইসলাম দাবি করছেন, সুপিরিয়র কমান্ড বা চক্রান্তের মামলায় আসামির ঘটনাস্থলে সশরীরে উপস্থিতি প্রয়োজনীয় নয়, বরং তার কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তই অপরাধের মূল চালিকাশক্তি। বিশেষ করে কুষ্টিয়ায় ছয়জন নিহতের ঘটনায় (৮ নম্বর চার্জ) ইনুকে খালাস দেয়াকে আদালত কর্তৃক সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটির ভুল ব্যাখ্যা হিসেবে দেখছেন এই বিশেষজ্ঞ।
মামলার রায়ের আইনি প্রবাহের সাথে যে তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ইনুকে সাজা দেয়া হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ৩ নম্বর অভিযোগ : প্রসিকিউশনের সাক্ষী রাইসুল হকসহ অন্যান্য বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নির্যাতন ও রাজনৈতিক নিপীড়ন চালানোর নির্দেশনার দায়ে তাকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। ৬ নম্বর অভিযোগ : ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে আন্দোলনকারীদের উগ্রপন্থী আখ্যা দিয়ে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে সমর্থন এবং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হত্যা ও নির্যাতনে উসকানি ও সহায়তা দেয়ার অপরাধে ১০ বছরের কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। ৭ নম্বর অভিযোগ : ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট শেখ হাসিনাকে কারফিউ জারি ও গুলি চালিয়ে ছাত্র আন্দোলন দমনের সুনির্দিষ্ট চক্রান্তমূলক পরামর্শ দেয়ার অপরাধে আরো ১০ বছরের কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
বাকি পাঁচটি অভিযোগ থেকে আদালত ইনুকে খালাস দেয়ায় ট্রাইব্যুনালের বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। রাষ্ট্রপক্ষের অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি বলেন, প্রসিকিউশন ১০ জন সাক্ষী এবং অডিও-ভিডিওর অকাট্য প্রমাণাদি উপস্থাপন করেছিল, যেখানে আসামি নিজেও তথ্যচিত্রের সত্যতা অস্বীকার করেননি। চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপক্ষ এই সাজার কোয়ান্টাম বৃদ্ধি এবং খালাসপ্রাপ্ত চার্জগুলোর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করবে। অন্য দিকে, আসামি পক্ষ এই রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত দাবি করে সরাসরি আপিল বিভাগে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
এই মামলার রায়ের পর উচ্চ আদালতে যাওয়ার যে প্রক্রিয়া, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত ব্যাখ্যা দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের ৪৭ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সিনিয়র আইনজীবী এস এম শাহজাহান। তিনি সংবাদ বিশ্লেষণের ধারাবাহিকতায় উল্লেখ করেন, সাধারণ মামলার ক্ষেত্রে বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি সুনির্দিষ্ট ধাপ রয়েছে। কোনো রায়ে সংক্ষুব্ধ হলে সংক্ষুব্ধ পক্ষকে প্রথমে হাইকোর্টে আপিল করতে হয়। এরপর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে যাওয়া যায় সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ আপিল বিভাগে। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ক্ষেত্রে এই নিয়মটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ট্রাইব্যুনাল মূলত বিশেষায়িত ও গুরুতর অপরাধের (যেমন- মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ) দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট বিচারের জন্য গঠিত হয়। এর আইনি কাঠামো এমনভাবে তৈরি যেন দীর্ঘ আইনি জটিলতা এড়িয়ে সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা যায়, এখানে হাইকোর্টে যাওয়ার কোনো বিধান বা মধ্যবর্তী ধাপ নেই।
তবে এই বিশেষ ব্যবস্থার সুবিধা সত্ত্বেও দেশের বর্তমান বিচারিক বাস্তবতায় মামলাটি এক দীর্ঘ প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতার মুখে পড়তে যাচ্ছে বলে মনে করছেন এই জ্যেষ্ঠ আইনবিদ। এস এম শাহজাহান জানান, ‘দেশের বিচারিক বাস্তবতায় অনেকের মধ্যেই একটি সাধারণ ধারণা রয়েছে যে, কোনো মামলা আপিল বিভাগে যাওয়া মানেই তার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এক প্রকার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাওয়া। এর নেপথ্য কারণ হলো, পূর্বে আপিল বিভাগে মামলার শুনানির জন্য তিনটি বেঞ্চ সচল ছিল, কিন্তু বর্তমানে মাত্র একটি বেঞ্চ কার্যকর রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই একটি মাত্র বেঞ্চ দিয়ে বিপুল সংখ্যক মামলার চাপ সামলানো কঠিন, যা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বড় ধরনের দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করছে।’
নিজের একটি বাস্তব উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি জানান, বৃহস্পতিবার (গতকাল) বহুল আলোচিত আহসানুল্লাহ মাস্টার হত্যাকাণ্ড মামলার একজন আসামি, যিনি দীর্ঘ ২০ বছর ধরে কনডেম সেলে বন্দী রয়েছেন, তার মামলাটি কার্য তালিকায় ৮ নম্বরে থাকা সত্ত্বেও বিচারক ও বেঞ্চ সঙ্কটের কারণে সেদিন সেটির শুনানি সম্ভব হয়নি। শুধু এই একটি মামলাই নয়, এমন আরো অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল মামলা বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে।
এর আগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নবগঠিত ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে সেই যাবজ্জীবন সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড করার আবেদন জানিয়ে প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে আপিল বিভাগে আপিল দায়ের করা হলেও পর্যাপ্ত বিচারক এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক বেঞ্চ না থাকার কারণেই মূলত সেই আপিলের শুনানিও এখনো অনুষ্ঠিত হয়নি।
এই প্রাতিষ্ঠানিক সঙ্কটের সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম সতর্ক করে বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারে যদি ‘লঘু দণ্ড’ প্রদানের পর আপিল বিভাগেও এমন দীর্ঘ বিচারিক জট তৈরি হয়, তবে তা ভিকটিম ও সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম হতাশার জন্ম দেবে। দীর্ঘসূত্রতার কারণে একসময় সাক্ষীরা জীবনের ঝুঁঁকি নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য দিতে আগ্রহ হারাবেন, যা দীর্ঘমেয়াদে এই বিশেষ ট্রাইব্যুনালের গ্রহণযোগ্যতা ও জন-আস্থাকে বড় ধরনের সঙ্কটের মুখে ঠেলে দিতে পারে। প্রবীণ আইনজীবী এস এম শাহজাহান এই বিচারিক সঙ্কট থেকে উত্তরণের একমাত্র সমাধান হিসেবে উল্লেখ করেন, দেশের আপিল বিভাগে বিচারকের সংখ্যা বাড়িয়ে অবিলম্বে একাধিক বেঞ্চ গঠন করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর ও দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।