ভিএআর বিতর্ক কমাচ্ছে নাকি নতুন বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে
Printed Edition
- ভার কি তার উদ্দেশ্য পূরণ করছে
- সফট পেনাল্টির মানদণ্ড নতুন করে ভাবতে হবে
- ফুটবলে প্রযুক্তি কি সত্যিই বিতর্ক কমিয়েছে
ফুটবলের সবচেয়ে নির্মম মুহূর্তগুলোর একটি হলো পেনাল্টি। একটি বাঁশি, একটি শট, আর তাতেই বদলে যেতে পারে একটি দেশের স্বপ্ন। কিন্তু সেই পেনাল্টি যদি এতটাই বিতর্কিত হয় যে সেটি বোঝাতে লাগে ১০টি রিপ্লে, তিনটি ভিন্ন ক্যামেরা অ্যাংগেল এবং পাঁচ মিনিটের তর্ক-বিতর্ক, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই।
নকআউট পর্বে এমন সফট পেনাল্টিতে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হওয়া ফুটবলের সৌন্দর্যকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। ঘটনাটি মোটেও সাদা-কালো নয়। আর যখন একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে পুরো বিশ্ব বিভক্ত হয়ে যায়, তখন প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
বেলজিয়াম ও সেনেগাল ম্যাচে পেনাল্টির সিদ্ধান্তটি ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ। ল্যামিন কামারার চ্যালেঞ্জে বেলজিয়ামের ইউরি টিলেমানস বক্সে পড়ে গেলে ভিএআর রিভিউ দেখে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি সাইদ মার্টিনেজ। এ সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত সেনেগালের পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়ার স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দেয়। ম্যাচ শেষ হতেই পুরো ফুটবল বিশ্ব এই আলোচনায় মুখর হয়ে ওঠে। আসল সমস্যা সম্ভবত অন্য জায়গায়। ফুটবলের অনেক নিয়ম এখনো ব্যাখ্যানির্ভর। ফলে একই ধরনের স্পর্শ একজন রেফারির কাছে পেনাল্টি, অন্যজনের কাছে স্বাভাবিক শারীরিক লড়াই। প্রযুক্তি ভিডিও দেখাতে পারে, কিন্তু মানুষের বিচারবোধকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না। ফুটবলপ্রেমীরা প্রযুক্তির বিরোধী নন। তারা শুধু চান, প্রযুক্তি যেন বিতর্ক কমায়, নতুন বিতর্ক সৃষ্টি না করে।
সম্প্রচার চলাকালে কানাডিয়ান ধারাভাষ্যকার ক্রেইগ ফরেস্টও বলেছিলেন, আমার মনে হয় সেনেগালের প্রতি এটি অত্যন্ত নিষ্ঠুর আচরণ হয়েছে। কেবল এই ম্যাচেই নয়, আফ্রিকান কাপ অফ নেশন্সের ফাইনালেও তাদের বিপক্ষে এমন কিছু বড় সিদ্ধান্ত গিয়েছিল।
এই বিশ্বকাপে প্রযুক্তির এআই ক্যামেরা/ভার এত ছড়াছড়ি, অথচ মাঠের আসল অবিচারগুলো ঢাকা পড়ে যাচ্ছে! প্রথমে ইরান, আফ্রিকার লড়াকু দল সেনেগাল যেভাবে নোংরা পক্ষপাতিত্বের শিকার হলো, তা সত্যিই লজ্জাজনক। ফুটবলের জন্য কলঙ্কজনক অধ্যায়! খালি চোখেই পরিষ্কার দেখা গেল, সেনেগালের প্লেয়ার বলে কিক নেয়ার মুহূর্তে বেলজিয়ামের প্লেয়ার এসে পা ঢুকিয়ে দিল। ইচ্ছাকৃত ফাউল আর স্বাভাবিক পা লাগার মধ্যে যে আকাশ-পাতাল তফাত, সেটা বোঝার ন্যূনতম কমন সেন্সও কি রেফারিদের ছিল না? ম্যাচের শেষ মুহূর্তে এসে এমন একটা পেনাল্টি দেয়া জুলুম ছাড়া আর কী হতে পারে!
২০১৮ সালে রাউন্ড অফ সিক্সটিনে বেলজিয়াম বনাম জাপান। খেলার ৪৮ মিনিটে হারাগুচি আর ৫২ মিনিটে তাকাশি ইনুইর গোলে লিড ব্লু সামুরাইদের। নিশ্চিত বিদায় ইউরোপিয়ান রেড ডেভিলদের। সেই ম্যাচে নির্ধারিত ৯০ মিনিটেই অবিশ্বাস্য কামব্যাকে তিন গোল আদায় করে জিতে যায় বেলজিয়াম
২০২৬ বিশ্বকাপে রাউন্ড অফ ৩২ এ বেলজিয়াম-সেনেগাল। এবারো দৃশ্যপট প্রায় অভিন্ন। ৫০ মিনিটের মধ্যে সেনেগালের ২-০ লিড। ৮৬ মিনিটে লুকাকুর গোলের পরও পুরো আস্থা ছিল না বেলজিয়াম ম্যাচে ফিরবে। মনে হচ্ছিল, সেনেগাল বাকি সময়টা আটকে দেবে বেলজিয়ামের ফেরার পথ। কিন্তু না। ৮৯ মিনিটে ম্যাচে সমতা। আর ১২০+ মিনিটে পেনাল্টি গোল। এ ধরনের ম্যাচ দেখলেই ১৯৮৫ সালের আবাহনী-ব্রাদার্স আর ১৯৯৬ সালের মোহামেডান-মুক্তিযোদ্ধার ম্যাচের কথা মনে হয়। দুই গোলে পিছায়ে পড়েও আবাহনী আর মোহামেডান ম্যাচ জিতে যায়।
এমন পরিস্থিতিতে ষড়যন্ত্রের গন্ধও খুঁজতে শুরু করেন অনেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন ঘুরছে ফিফা কি বড় দলগুলোর পক্ষ নেয়? বেলজিয়াম কি বাড়তি সুবিধা পেল? সেনেগাল কি বঞ্চিত হলো? এসব প্রশ্ন আবেগ থেকে জন্ম নেয়, বিশেষ করে যখন সিদ্ধান্তটি এত বিতর্কিত হয়। কিন্তু আবেগ আর প্রমাণ এক জিনিস নয়। আসল সঙ্কট প্রযুক্তিতে নয়, এর প্রয়োগে। যদি একই নিয়ম ভিন্ন ম্যাচে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে প্রযুক্তিও মানুষের আস্থা ফেরাতে পারে না; বরং প্রতিটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নতুন করে প্রশ্ন তোলে। ভার দেখেও যদি এত বিতর্ক থাকে, তাহলে প্রযুক্তির উদ্দেশ্য কী?’