অমর একুশে আজ

Printed Edition
Font-1

মনিরুল ইসলাম রোহান

অমর একুশে আজ। ভাষা আন্দোলনের ৭৪ বছর পূর্ণ হলো আজ। রাষ্ট্রীয়ভাবে মায়ের ভাষা বাংলায় কথা বলার অধিকার আদায়ের দিন আজ। ১৯৫২ সালের এ দিনে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে আমাদের তরুণ ছাত্র-যুবকদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ঢাকার রাজপথ। সেদিন শহীদ হয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ নাম না জানা আরো অনেকেই। তাদের সেই সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগ বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। ভাষা আন্দোলন জাতি হিসেবে আমাদেরকে পৃথিবীর ইতিহাসে মহিমান্বিত ও স্মরণীয় করে রেখেছে। বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলা ভাষা মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে। ২০০০ সাল থেকে সারা বিশ্বে একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। আমাদের দেশে এটি শহীদ দিবস হিসেবে পরিচিত।

বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে আজ শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করা হবে ভাষা আন্দোলনে জীবন উৎসর্গকারী শহীদ সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার ও শফিউরদের। শ্রদ্ধা জানানো হবে ভাষা আন্দোলনের উৎস পুরুষ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সংগঠক অধ্যাপক আবুল কাসেম থেকে শুরু করে ভাষা সৈনিক মোহাম্মদ তোয়াহা, আব্দুল মতিন, গাজিউল হক, অলি আহাদ, শামসুল আলম, গোলাম মওলা, আব্দুল গফুর, আনোয়ারুল হক খান, আলী আজমল, ইব্রাহিম তাহা-সহ ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নাম জানা-অজানা সবাইকে।

আজ দেশের প্রতিটি শিাপ্রতিষ্ঠানে, প্রতিটি শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের গভীর শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করা হবে। প্রতিটি শহীদ মিনার ভরে উঠবে ফুলে ফুলে। ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে রাজধানীবাসী ছুটে যাবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। ঢাকার সব অলিগলি রাজপথ থেকে খালি পায়ে ফুল হাতে সব শ্রেণী পেশার মানুষ আজ ছুটবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজসংলগ্ন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দিকে। তাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হবে ভাষা শহীদদের স্মরণে লেখা গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি / আমি কি ভুলিতে পারি’। তেমনিভাবে ‘একুশ মানে অহংকার, একুশ মানে মাথা নোয়াবার নয়’ - এ অমোঘ বাণীটি ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করে, যা বাঙালির জাতীয় জীবনে আত্মশক্তি, আত্মমর্যাদা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের প্রতীক বলা হয়। এটি শুধু নিজের ভাষায় কথা বলার অধিকার নয়, বরং যে কোনো শোষণের বিরুদ্ধে মাথা নত না করার দীপ্ত শপথের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

ধাপে ধাপে ভাষা আন্দোলন এক সময় চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়

রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি হরতালের ডাক দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। আলাদা কর্মসূচি গ্রহণ করে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদও। হরতাল প্রতিহত করতে তৎকালীন সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে কি না এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ২০ ফেব্রুয়ারি বৈঠকে বসেন ভাষা আন্দোলনকারী নেতারা। বৈঠকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে কি না তা নিয়ে নেতাদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয়।

২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমতলায় ছাত্রসমাবেশের কর্মসূচি ছিল। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা নিয়ে ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ছাত্র নেতাদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয়ায় শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয় পরের দিন অর্থাৎ ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাবি আমতলার সমাবেশে এ বিষয়ে উপস্থিত ছাত্রদের মতামত নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তবে রাতেই অনেক ছাত্র নেতা পরের দিন ১৪৪ ধারা ভাঙার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই ছাত্ররা আসতে থাকে আমতলায় (বর্তমান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ইমার্জেন্সি বিভাগের সামনের মাঠ)। বেলা ১১টায় বিস্ফোরণোন্মুখ ছাত্র-যুবকদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। বক্তব্য দেন শামসুল হক, তোয়াহা, কাজী গোলাম মাহবুব, খালেক নওয়াজ চৌধুরী, শাহাবুদ্দীন আহমদ খালেদ, আব্দুল মতিন। ঘণ্টাখানেক সভার কাজ চলার পর সভাপতির বক্তব্যে গাজিউল হক ১৪৪ ধারা ভাঙার পে মত দেন। এতে সম্মতি দেন উপস্থিত সব ছাত্র-জনতা।

পাঁচ জন করে ছাত্র বের হলে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ হয়। ১০ জনের প্রথম গ্রুপের নেতৃত্ব দেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র আলী আজমল। তাকে প্রথম গ্রেফতার করা হয়। এ ভাবে দ্বিতীয় ১০ জনের গ্রুপটির নেতৃত্ব দেন ইসলামী ভ্রাতৃসঙ্ঘের নেতা ইব্রাহিম তাহা ও আব্দুস সামাদ, তৃতীয় দলের নেতৃত্ব দেন আনোয়ারুল হক ও আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। তাদের সবাইকে গ্রেফতার করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্রদের পুলিশ ঘেরাও করে রাখে। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে মেডিক্যাল কলেজ এলাকায় প্রথম ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে পুলিশ। এতে ছাত্ররা আরো প্তি হয়ে ওঠে। বিকেল ৪টায় মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে বিােভকারীদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে নিহত হন রফিকউদ্দিন আহমদ। রাত ৮টার পরে আহতদের মধ্যে মারা যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবুল বরকত এবং গফরগাঁওয়ে আব্দুল জব্বার।

সাংবাদিক মোদাব্বের সে সময় ঢাকা মেডিক্যালে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং একুশের ঘটনা জানতে পারেন। একুশের রাতে তিনি পুলিশের গাড়িতে ৯টি লাশ তুলতে দেখেন। ভাষা আন্দোলনের মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিক পত্রিকায় আটজন নিহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয় ২৩ ফেব্রুয়ারি। তবে পরবর্তীতে ইতিহাস অন্বেষণে ছয়জন শহীদের প্রকৃত নাম পরিচয় পাওয়া গেছে। উপরে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তারা বাদে বাকিরা হলেন ঢাকা হাইকোর্টের কর্মচারী শফিউর রহমান, নবাবপুর রোডের বাসিন্দা সরকারি অফিসের পিওন আব্দুস সালাম। নবাবপুরে অহিউল্লাহ নামে এক কিশোর শহীদ হয়।

প্রধানমন্ত্রীর বাণী

মহান শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২০২৬ উপলে দেয়া এক বাণীতে আমাদের মাতৃভাষা বাংলাসহ বিশ্বের সব ভাষাভাষী মানুষ ও জাতিগোষ্ঠীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাণীতে তিনি বলেছেন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জনগণের অধিকার ও সমতা প্রতিষ্ঠাই ছিল একুশের মূল চেতনা। এ চেতনাকে ধারণ করে দীর্ঘ লড়াই সংগ্রাম পার হয়ে দেশে আজ গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গণতন্ত্রের এই অগ্রযাত্রাকে সুসংহত করতে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের এই দিনে, আমি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সব শহীদকে, যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা প্রতিষ্ঠা করেছি মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা। তারেক রহমান বলেন, আমরা ভাষাশহীদ এবং ’৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন ও ২০২৪-এর স্বাধীনতা রার যুদ্ধসহ এ যাবৎকালে দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সব শহীদের আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে একটি স্বনির্ভর, নিরাপদ, মানবিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়তে চাই। বাণীতে প্রধানমন্ত্রী সব ভাষাশহীদের মাগফিরাত কামনা করে মহান শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলে গৃহীত সব কর্মসূচির সফলতা কামনা করে বলেন, আসুন, আমরা দেশে বিদ্যমান ভাষাবৈচিত্র্যকে সংরণ করি, নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরণের পাশাপাশি সর্বস্তরে বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহার ও চর্চা নিশ্চিত করি।

কর্মসূচি

আজ সরকারি ছুটির দিন। প্রতি বছরের মতো এবারো একুশে ফেব্রুয়ারি যথাযোগ্য মর্যাদায় ‘শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ পালন করা হবে। এ জন্য সরকারের প থেকে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। একুশের প্রথম প্রহরে ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে একুশের কর্মসূচি শুরু হবে। এ ছাড়াও কালো ব্যাজ ধারণ, প্রভাতফেরি সহকারে আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও শ্রদ্ধা জানানো হবে। একুশে ফেব্রুয়ারি দেশের সব শিাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভবনগুলোয় সঠিক নিয়মে, সঠিক রঙ ও মাপে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। দিবসটি উদযাপন উপলে জাতীয় কর্মসূচির সাথে সঙ্গতি রেখে দেশের সব শিাপ্রতিষ্ঠান, সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলো যথাযথ কর্মসূচি গ্রহণ করবে। বাংলাদেশ মিশনগুলেঅ শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদগুলো ভাষা আন্দোলনবিষয়ক আলোচনা সভা, পুস্তক ও চিত্র প্রদর্শনীসহ রাষ্ট্রীয় আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবেন, যেখানে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক এবং বাঙালি অভিবাসীরা উপস্থিত থাকবেন। বাংলা একাডেমিও বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

আজিমপুর কবরস্থানে ফাতেহা পাঠ ও কুরআনখানির আয়োজনসহ দেশের সব উপাসনালয়ে ভাষাশহীদদের রূহের মাগফিরাত কামনায় প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এবং দিবসটি পালনে নিয়োজিত সব প্রতিষ্ঠান ও সংলগ্ন এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারকরণে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। দিবসটি উদযাপন উপলে ঢাকা শহরের বিভিন্ন সড়কদ্বীপ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাজনক স্থানে বাংলাসহ অন্যান্য ভাষার বর্ণমালা সম্বলিত ফেস্টুন দ্বারা সজ্জিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো একুশের বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচারের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। প্রিন্ট মিডিয়াগুলোতে থাকছে অমর একুশের ওপরে বিশেষ ক্রোড়পত্র ও আয়োজন। দিবসটি উদযাপন উপলে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদফতরও বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।