রংপুরে ফোর মার্ডার : ফরেনসিক ল্যাবে আলামত যায়নি ৬ দিনেও

খুনি দু’জনই, নিশ্চিত তদন্ত সংস্থা; স্বচ্ছতা নিশ্চিতে জবানবন্দীর পরও রিমান্ডের প্রস্তুতি

Printed Edition

রংপুর ব্যুরো

রংপুরের চাঞ্চল্যকর চার খুনের ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা ৩৫টি আলামত গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য আদালতের কাছে অনুমতির আবেদন করেনি তদন্ত সংস্থা। তবে গ্রেফতারকৃত দুই আসামি-সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসই যে সরাসরি এ নির্মম হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তদন্তকারীরা। অন্য দিকে, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে ধর্ষণ কিংবা কোনো বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের প্রমাণ না মেলায় ঘটনার রহস্য ও মূল মোটিভ উদঘাটন প্রায় শেষ পর্যায়ে বলে দাবি পুলিশের।

তবে তদন্তের প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা নানা প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব মিলবে কেবল জব্দকৃত আলামতের ফরেনসিক প্রতিবেদন এলে-এমনটাই বলছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। এ দিকে গ্রেফতার আসামিরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিলেও ঘটনার আদ্যোপান্ত এবং আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আসামিদের রিমান্ড আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।

সিআইডি ও পুলিশ সূত্রের তথ্যানুযায়ী, ঘটনার পর ওই বাড়িটি থেকে জব্দ করা ৩৫টি আলামতের মধ্যে রয়েছে- খেজুর, শসা, সিগারেটের অংশ, প্রিয়মের হাতে লেখা ২২ আগস্টের হোমওয়ার্ক, প্রিয়মের লাশের চারপাশের তরল পদার্থ এবং ‘পলক হোটেল’ থেকে আনা নানরুটি ও ইয়াবা সেবনের ব্যবহৃত ফয়েল। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব আলামতের সঠিক ফরেনসিক ও ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন হলেই নিশ্চিত হওয়া যাবে এ হত্যাকাণ্ডে ওই দুইজন ছাড়া অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের সম্পৃক্ততা ছিল কি না।

আলামত পাঠাতে বিলম্বের বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের পরিদর্শক (ওসি) জিন্নাত আলী জানান, আলামতগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সিআইডি ল্যাবে পাঠানোর আইনি প্রক্রিয়া প্রক্রিয়াধীন। তবে তার আগে আসামিদের পুনরায় রিমান্ডে এনে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন রয়েছে। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নির্দেশনায় আদালতের কাছে রিমান্ড এবং পরবর্তীতে আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষার অনুমতির আবেদন একসঙ্গেই করা হবে।

একই বিষয়ে সিআইডির রংপুর কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার (এসপি) সুমিত চৌধুরী জানান, উদ্ধারকৃত খেজুর, শসা ও সিগারেটের ফিল্টার থেকে সহজেই আসামিদের ডিএনএ সংগ্রহ করা সম্ভব। সংগৃহীত নমুনা যদি সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধর ডিএনএর সাথে মিলে যায়, তবে অন্য কারো উপস্থিতির সম্ভাবনা নাকচ হবে। আর মিল না পাওয়া গেলে স্পষ্ট হবে নতুন কারো নাম। তবে সিআইডি ল্যাবে কেসের চাপ থাকায় রিপোর্ট আসতে কিছুটা সময় লাগে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে এবং আদালতে অনুমতি মিললেই দ্রুত ফরেনসিক কাজ সম্পাদন করতে বলা হবে।

রংপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) সনাতন চক্রবর্তী জানান, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন তারা হাতে পেয়েছেন। এতে দেখা যায়, চারজনকে একই সময়ে নয়, বরং ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ও ভিন্ন স্থানে নির্মমভাবে গলায় ফাঁস দিয়ে বা শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। দুই আসামির বিরুদ্ধে হত্যায় অংশ নেয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে এবং তারা ঘটনার সময় প্রবলভাবে ইয়াবাসক্ত ছিলেন।

পুলিশ কমিশনারের নতুন ব্রিফিং

বৃহস্পতিবার সকালে রংপুর মহানগর পুলিশ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন বিদায়ী মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ। তিনি জানান, গ্রেফতার হওয়া সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাস পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ এবং আদালতে দেয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছে।

পুলিশ কমিশনার স্পষ্ট করেন যে, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও তার মেয়ে আগামী চক্রবর্তীকে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। তাদের গলায় নরম বা নমনীয় কোনো বস্তু (যেমন কাপড় বা দড়ি) পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া, আলামত হিসেবে প্রাপ্ত ভিকটিমদের শরীরজাত নিঃসরণকে অনাকাক্সিক্ষতভাবে ভুল ব্যাখ্যা না করার আহ্বান জানান তিনি।

হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ সম্পর্কে কমিশনার জানান, জমিজমাসংক্রান্ত পুরনো ক্ষোভ এবং অর্থনৈতিক লেনদেন এর পেছনে কাজ করে থাকতে পারে। সিদ্ধার্থের পূর্বপুরুষদের একটি জমি ভিকটিম গণপতি চক্রবর্তী ক্রয় করেছিলেন, যা নিয়ে শরিকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ছিল। তিনি আরো জানান, হত্যাকাণ্ডের আগে অভিযুক্তরা বন্ধু সীমান্তের বাড়িতে ইয়াবা সেবন করেছিল। সীমান্ত দাস ইতোমধ্যেই আদালতে সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দিয়েছেন। এ ছাড়া, ঘটনার পর মুগ্ধ দাস পালিয়ে শ্মশানের কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ দাসের কাছে আশ্রয় চাইলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং পরবর্তীতে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। বিদ্যুৎ দাসও আদালতে তার সাক্ষ্য প্রদান করেছেন।

ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে যা রয়েছে

এ প্রতিবেদকের হাতে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের ময়নাতদন্তের কপি এসেছে। এতে আঘাতের ধরন হিসেবে বলা হয়, প্রত্যেকটি লাশের গলায় অণুভূমিক লিগেচার মার্ক বা গলায় ফাঁস দেয়ার স্পষ্ট চিহ্ন মিলেছে। তবে কোনো ধারালো অস্ত্রের কোপ বা কাটাছেঁড়ার চিহ্ন নেই; সবগুলো আঘাতই ভোঁতা বস্তু বা ঘুষি-লাথির। প্রিয়ম চক্রবর্তীর (১২) মাথায় ও বুকে মারাত্মক আঘাতের কারণে রক্ত জমার চিহ্ন এবং নাকের তরুণাস্থি ভাঙা পাওয়া গেছে। গণপতি চক্রবর্তীর (৬০) মাথার দুই পাশে একাধিক রক্তজমা জখম ও বুকে গভীর আঘাতের চিহ্ন ছিল। আগামী চক্রবর্তীর (২৪) মুখের ডান পাশে ফোলা কালচে জখম পাওয়া গেছে। পচন ও বাহ্যিক অবস্থা : লাশ উদ্ধার হতে বিলম্ব হওয়ায় লাশগুলো আংশিক পচে গিয়েছিল, মুখ থেকে পচা তরল নির্গত হচ্ছিল এবং গ্যাস জমে চোখ ও জিহ্বা বের হয়ে এসেছিল।

রংপুর মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা: বাবুল কিশোর কুমার জানান, ভিকটিমদের ওপর শারীরিক সহিংসতা হলেও কোনো যৌন নির্যাতনের প্রমাণ মেলেনি। ধস্তাধস্তির কারণেই শরীরে ভোঁতা অস্ত্রের বা হাতের আঘাতের চিহ্ন তৈরি হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ২১ আগস্ট (শুক্রবার) ভোরে রংপুর নগরীর মাছখোয়া পাড়ার নিজ বাড়িতে সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা, মাস্টার্স উত্তীর্ণ কন্যা আগামী চক্রবর্তী ও পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র প্রিয়ম চক্রবর্তীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ২২ আগস্ট রাতে পুলিশ তাদের লাশ উদ্ধার করে এবং পরদিন প্রধান দুই অভিযুক্তকে পুলিশ গ্রেফতার করে। এ ঘটনার দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে রংপুরে সর্বস্তরের শিক্ষার্থী ও সুশীল সমাজ আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন।