মধ্যস্থতা প্রচেষ্টায় গতি আনতে তেহরানে কাতারের প্রধানমন্ত্রী

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ অবসানে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আবার শুরু করার লক্ষ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার তেহরান গেছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুর রহমান আলে সানি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে তিনি হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে মাইন অপসারণ এবং একটি অস্থায়ী শিপিং করিডোর চালুর প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেছেন। খবর আলজাজিরার।

গতকাল বৃহস্পতিবার তেহরানে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে আঞ্চলিক পরিস্থিতির সর্বশেষ অবস্থা পর্যালোচনা করা হয়। বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পায় অঞ্চলজুড়ে চলমান উত্তেজনা কমানো এবং আলোচনার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির উদ্যোগ। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদার করার লক্ষ্যে উত্তেজনা কমানোর বিভিন্ন প্রচেষ্টা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। দুই দেশের মন্ত্রীরা সংলাপের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দেন।

বৈঠকে হরমুজ প্রণালীর জন্য একটি প্রস্তাবিত কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর আওতায় প্রণালীর মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য সাময়িক একটি শিপিং করিডোর বা নৌপথ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে কাতার। একই সাথে হরমুজ প্রণালীতে সম্ভাব্য মাইন অপসারণে ইরান ও কাতারের মধ্যে একটি ‘যৌথ প্রকল্প’ বাস্তবায়নের জন্য চুক্তি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। মাইন অপসারণ করা গেলে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা বাড়ানো এবং গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে বাণিজ্যিক পরিবহন সচল রাখতে সহায়তা করতে পারে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, উত্তেজনা কমিয়ে সংলাপের পরিবেশ সৃষ্টি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং হরমুজ প্রণালীতে নৌচলাচলের পরিস্থিতি উন্নত করাই আলোচনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

ইরানের বাণিজ্যে অংশীদারদের নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্যস্থল করে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছে ওয়াশিংটন। সরাসরি লড়াই বন্ধ থাকলেও এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে আর এ পরিস্থিতির জন্য দুইপক্ষ একে অপরকে দোষারোপ করছে। রয়টার্স লিখেছে, ইরানের পারস্য উপসাগরীয় প্রতিবেশী কাতার যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র। দেশটি পর্দার আড়ালে যুদ্ধরত দুইপক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দায়িত্বপালন করছে। কাতার জুন মাসের যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরাসরি ভূমিকা রেখেছিল, যার ফলে অল্প সময়ের জন্য সঙ্ঘাত বন্ধ ছিল। প্রায় ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধে এখন লড়াই অধিকাংশ ক্ষেত্রে বন্ধ থাকলেও সঙ্ঘাত অবসানে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। এ পরিস্থিতিতেই তেহরান গেলেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি জানিয়েছিলেন, কাতারের প্রধানমন্ত্রী আলে সানি বৃহস্পতিবার তেহরান সফরকালে কাতারের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা এবং ওই অঞ্চলের অন্যান্য অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করবেন। এক্স এ কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছিলেন, আলে সানি হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি যে অবস্থায় ছিল তাতে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও কথা বলবেন। পাশাপাশি ইরানি কর্মকর্তাদের সাথে ‘উত্তেজনা প্রশমন এবং আলোচনার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির উপায় নিয়েও আলোচনা করা হচ্ছে।

নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় কোনো ফল হবে না : ইরান

প্রায় এক মাস হয়ে গেল যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানের ওপর কোনো হামলার কথা জানায়নি। দুইপক্ষের বন্দুকগুলো নিশ্চুপই আছে। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, ওয়াশিংটন কঠোর নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানকে তার বাণিজ্যিক অংশীদারদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা ঘোষণা করে সামরিক পদক্ষেপের চেয়ে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির ওপরই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্যোগে কোনো ফল হবে না বলে বুধবার দৃঢ়ভাবে জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। এর আগে ওয়াশিংটন ইরানের অর্থনীতি ধ্বংসের পরিকল্পনা প্রকাশ করে। যুদ্ধ শুরুর প্রায় ছয় মাস পরও দুই পক্ষ অচলাবস্থায় রয়েছে। ইরান গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ রেখেছে। অন্য দিকে ওয়াশিংটন ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ অব্যাহত রেখেছে। তেহরান থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে দেশে রাজনৈতিক চাপের মুখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক পদক্ষেপ থেকে সরে অর্থনৈতিক চাপের দিকে ঝুঁকেছেন। তিনি নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর পাশাপাশি এতে যোগ না দেয়া দেশগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সতর্কতা দিয়েছেন।

তবে কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা সামলে আসা ইরান এখনো অনড় রয়েছে। দেশটির কর্মকর্তারা বলেছেন, এই চাপ মোকাবেলায় তাদের দুই বছরের পরিকল্পনা রয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইএসএনএ জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বুধবার বলেন, এই পর্যায়ে অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে আমেরিকা কোনো কিছু অর্জন করতে পারবে না। যুদ্ধেও তারা কিছু অর্জন করতে পারেনি। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত যেভাবে করেছি, সেভাবেই অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে আমরা দৃঢ় থাকব এবং তা অব্যাহত রাখব।

এ দিকে ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বুধবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, যুদ্ধের সময় দুর্বল হয়ে পড়া সামরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেছে সেনাবাহিনী। ক্ষতিগ্রস্ত সব অস্ত্রব্যবস্থার পুনর্নির্মাণ এবং বিদেশ থেকে নতুন সরঞ্জাম আমদানি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। সোমবার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করেছে, দেশটির প্রায় ১০০ শতাংশ সামরিক কারখানা ধ্বংস করেছে এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কবর দিয়েছে। বেসেন্ট বলেন, নতুন অর্থনৈতিক পদক্ষেপ ঘোষণা করে বর্ধিত মাধ্যমিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় ইরানের ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি, স্বর্ণ, বিমান চলাচল ও নৌপরিবহন খাতকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। ইরানের কথিত পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করার অঙ্গীকার করে তারা। একই সাথে তেহরানের সরকার উৎখাতের হুমকিও দেয়া হয়। ইরান দীর্ঘদিন ধরে পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। দেশটি উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের পাল্টা হামলা চালায় এবং তেল ও গ্যাসের বৈশ্বিক সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। পণ্যবাহী জাহাজগুলো বড় বাজারে পৌঁছাতে পারছে না। এতে তেলের দাম বেড়েছে এবং নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ছে। ট্রাম্প প্রায়ই বলেন, একটি চুক্তি খুব কাছাকাছি। তবে পরে তিনি কূটনীতি থেকে সরে আসেন। ইরানের সাথে আলোচনার জন্য কত সময় দিচ্ছেন- বুধবার আলজাজিরার এ প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার কোনো সময়সীমা নেই, একেবারেই নেই। আমি তাড়াহুড়া করছি না। আমার কোনো সময়সীমাই নেই।’

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু মঙ্গলবার কোনো চুক্তির সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের বলছি- কোনো চুক্তি হতে পারে না।’ ইরানের নেতাদের তিনি ‘বর্বর’ বলেও অভিহিত করেন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সঙ্ঘাতের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালী। ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের দাবি মেনে না নেয়া পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ খুলবে না। প্রণালী পার হওয়ার চেষ্টা করা জাহাজগুলোতেও তারা প্রায়ই হামলা চালিয়েছে।

তেহরান আরো জানিয়েছে, প্রণালী ব্যবহারের জন্য তারা ফি নেয়ার পরিকল্পনা করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশ এর তীব্র বিরোধিতা করছে। ট্রাম্প দাবি করছেন, হরমুজ প্রণালীর ওপর মার্কিন নৌবাহিনীর ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে। এমনকি তিনি এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড বলেও অভিহিত করেছেন। তবে সেখানে জাহাজ চলাচল যুদ্ধের আগের মাত্রার তুলনায় অনেক কম রয়েছে।

ইরানের বিপরীত পাশে অবস্থিত ওমান তেহরানের সাথে একটি অস্থায়ী নৌপথ চালুর বিষয়ে আলোচনা করছে। এর মাধ্যমে জাহাজ চলাচল আবার শুরু করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। বুধবার ইরানের সামরিক বাহিনীর আদর্শিক শাখা রেভুলিউশনারি গার্ডস জানিয়েছে, ওমানের সাথে আলোচনায় দুই দেশ প্রণালীর ব্যবস্থাপনা থেকে আদায় করা যেকোনো রাজস্ব ভাগাভাগি করতে সম্মত হয়েছে। চুক্তিটি চূড়ান্ত করার কাজে যুক্তরাষ্ট্র ‘বাধা সৃষ্টি করছে’ বলেও অভিযোগ করেছে তারা। প্রায় এক মাস হয়ে গেল যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানের ওপর কোনো হামলার কথা জানায়নি। দুইপক্ষের বন্দুকগুলো নিশ্চুপই আছে। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, ওয়াশিংটন কঠোর নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানকে তার বাণিজ্যিক অংশীদারদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা ঘোষণা করে সামরিক পদক্ষেপের চেয়ে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির ওপরই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি মঙ্গলবার বলেন, তিনি আশা করছেন, তার দেশ ও ইরান ‘শিগগিরই’ অস্থায়ী নৌপথ চালুর ঘোষণা দেবে। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি স্থানীয় গণমাধ্যমকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, অস্থায়ী নৌপথ চালুর বিষয়ে চুক্তি হলে সেটির বিকল্প হিসেবে একটি স্থায়ী নৌপথ নিয়ে আলোচনার জন্য ইরান ও ওমান ৩০ থেকে ৬০ দিন সময় পাবে। তিনি আরো বলেন, আলোচনায় রেভুলিউশনারি গার্ডসও যুক্ত রয়েছে। আলোচনায় থাকা মানচিত্রগুলো সশস্ত্রবাহিনী তৈরি করেছে।