ক্লাসরুমে শিখন উপকরণের ঘাটতি মুখস্থবিদ্যায় বাধ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীরা
মাউশির পরিদর্শন প্রতিবেদনের তথ্য
Printed Edition
মাধ্যমিকে বিভিন্ন স্কুলের ক্লাসরুমে শিখন উপকরণের ঘাটতিতে মুখস্থ বিদ্যার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে শিক্ষার্র্থীরা। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে প্রায়োগিক শিক্ষা তথা হাতে-কলমে শিক্ষার উপরেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বাস্তবে মাঠপর্যায়ে এর বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) পরিদর্শন বিভাগের করা জরিপের মাধ্যমে স্কুলপর্যায়ের সঠিক তথ্য তুলে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। সেখানে অর্ধেকের বেশি বিদ্যালয়ে শিখন উপকরণের ঘাটতি চরমভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা জরিপের ফলাফল অংশ বলা হয়েছে, শ্রেণিকক্ষে উপকরণ থাকলেও তা অনেক ক্ষেত্রে পাঠ্য বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে শিক্ষার্থীরা যে বিষয় শেখার কথা, তা কতটা শিখছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই মুখস্থ বিদ্যার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
বেশ কিছু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এই জরিপটি পরিচালনা করা হয়েছে। মাউশির এই পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সারা দেশের পাঁচ হাজার ৪৩১টি বিদ্যালয় পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে দুই হাজার ৭৪৭টি বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রম মনিটরিং (পরিবীক্ষণ) করা হয়। এসব বিদ্যালয়ের প্রায় ৫৭ শতাংশে ব্যবহৃত শিখন উপকরণ পাঠ্য বিষয়বস্তুর সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। শুধু উপকরণের সমস্যাই নয়, শিক্ষার্থীরা কী শিখছে ও শেখার অগ্রগতি কতটা, তা যাচাইয়ের ব্যবস্থায়ও বড় দুর্বলতা দেখা গেছে। পরিদর্শন করা বিদ্যালয়গুলোর ৫২ শতাংশে ধারাবাহিক মূল্যায়নের রেকর্ড যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয় না। মাউশির প্রতিবেদনে শিখন উপকরণের ব্যবহার ও ধারাবাহিক মূল্যায়ন এ দু’টি বিষয়কে গুণগত শিখন শেখানোর প্রক্রিয়ার সবচেয়ে দুর্বল দিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মাউশির প্রতিবেদন বলছে, দুই হাজার ৭৪৭টি বিদ্যালয়ের প্রায় ৫৭ শতাংশে ব্যবহৃত শিখন উপকরণ পাঠ্য বিষয়বস্তুর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। পরিদর্শন করা বিদ্যালয়গুলোর ৫২ শতাংশে ধারাবাহিক মূল্যায়নের রেকর্ড যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয় না। শিক্ষক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু শিখন উপকরণের ঘাটতি নয়, শ্রেণিকক্ষে সেগুলোর যথাযথ ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ। উপকরণ পাঠ্য বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে শিক্ষার্থীদের বিষয়টি বুঝতে সমস্যা হয়। এতে কাক্সিক্ষত শিখনফল অর্জিত না হয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিখনের ঘাটতি সৃষ্টি হতে পারে।
শিখন উপকরণ বলতে কী কী বোঝানো হয়েছে, তা ওই প্রতিবেদনে নেই। তবে শিক্ষকেরা একটি ধারণা দিয়েছেন। তারা বলছেন, পড়াশোর বিষয়ভেদে শিখন উপকরণ নানা রকম। পদার্থবিজ্ঞানে ‘বিভব শক্তির সংরক্ষণশীলতা’ বোঝাতে সরল দোলক একটি উপকরণ। বিজ্ঞানের অন্যান্য বিষয়ে টেস্টটিউব, বিকার, ফানেল ও মেজারিং সিলিন্ডার, বিবর্ধক কাচ (ম্যাগনিফাইং গ্লাস), চুম্বক, তার, ছোট বাল্ব ইত্যানি নানা কিছুর দরকার হয়। ঢাকার একটি সুপরিচিত বিদ্যালয়ের একজন বিজ্ঞানের শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তারা শিক্ষার্থীদের ব্যাঙের শরীর ব্যবচ্ছেদ শেখান। কিন্তু অনেক বিদ্যালয়ে সেটা সেখানো হয় না। এভাবে বিজ্ঞানের অনেক বিষয়ই শিক্ষার্থীদের না বুঝে মুখস্থ করতে হয়।
গ্রামে অথবা উপজেলা পর্যায়ে কী অবস্থা, তা জানতে যোগাযোগ করা হলে ঢাকার বাইরের এক উপজেলার একজন সহকারী শিক্ষক বলেন, তিনি যখন একটি বিদ্যালয়ের কৃষিশিক্ষা বিষয়ের ক্লাসে যান, তখন দেখতে পান কোনো উপকরণই ব্যবহার করা হয় না। কৃষিশিক্ষা বিষয়ে কী কী উপকরণ থাকার কথা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ধরেন ধান রোপণ শেখানো হবে। সেটা সেখাতে চারার ব্যবস্থা করা যায়। তখন হাতেকলমে শিক্ষাটা হবে।
সূত্র জানায় মাউশির আওতাধীন মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ২০ হাজারের বেশি। তিন মাস অন্তর ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেমের (ডিএমএস) আওতায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করে মাউশির পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন শাখা। গত ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সারা দেশে পাঁচ হাজারের বেশি বিদ্যালয় পরিদর্শন করে বছরের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক মনিটরিং প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে শিক্ষার্থীদের বই বাসায় নিয়ে পড়ার সুযোগ, শিক্ষক-কর্মচারীদের অননুমোদিত অনুপস্থিতি, যৌন হয়রানির অভিযোগসহ বিভিন্ন বিষয়ের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
মাউশির পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন শাখার কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিষয়টি মাউশির মহাপরিচালককে অবহিত করা হয়েছে। মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানান, শিক্ষকেরা যেন পাঠদানের সময় সঠিক ও সঙ্গতিপূর্ণ শিখন উপকরণ ব্যবহার করেন, সে বিষয়ে বিদ্যালয়গুলোকে সতর্ক করার পাশাপাশি মনিটরিং জোরদার করা হচ্ছে।