‘ঈদ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ খুশি হওয়া, ফিরে আসা, আনন্দ উদযাপন করা ইত্যাদি। আর ‘মিলাদ’ শব্দের অর্থ জন্মতারিখ, জন্মদিন, জন্মকাল ইত্যাদি। অতএব ‘মিলাদুন্নবী’ সা: বলতে নবীজি সা:-এর আগমন বোঝায়। আর ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ সা: বলতে নবী করিম সা:-এর আগমনে আনন্দ উদযাপন করা বোঝায়। সুতরাং অশান্তি আর বর্বরতায় ভরপুর সঙ্ঘাতময় আরবে আঁধার চিড়ে শেষ নবী সা: শান্তির বারতা নিয়ে মানবজাতিকে সত্যের, সভ্যতা ও ন্যায়ের দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশসহ মুসলিম উম্মাহ অধ্যুষিত প্রায় প্রতিটি দেশে বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের বিভিন্ন দল-উপদলের মধ্যে ঈদে মিলাদুন্নবী সা: ও সিরাতুন্নবী সা: উদযাপন নিয়ে মতবিরোধ আছে। যদিও ঈদে মিলাদুন্নবী সা: ও সিরাতুন্নবী সা:-এর একটি অথবা দুটো উদযাপন করা না করা ইসলামের মৌল উৎসগুলোর অন্যতম কোনো ফরজিয়াতের তরক হওয়া বা না হওয়ার বিষয় নয়। তবে নবী সা: যেহেতু পুরো বিশ্বমানবতার জন্য রহমতস্বরূপ তাই উম্মতে মুহাম্মদি হিসেবে তাঁর জন্মোৎসব পালন, তাঁর জীবন-চরিত পাঠ ও তাঁর জীবনাদর্শ যথাযথ অনুকরণ-অনুসরণ করা প্রত্যেকের অবশ্য কর্তব্য।
সিরাতুন্নবী সা: বলতে যেহেতু নবী করিম সা:-এর সামগ্রিক জীবন-চরিতাদর্শ বোঝায়। আর ঈদে মিলাদুন্নবী সা: বলতে শুধু নবী করিম সা:-এর জন্মোৎসব পালন বোঝায়; তাই সিরাতুন্নবী সা: পালনের মাধ্যমে মিলাদুন্নবী সা: স্বয়ংক্রিয়ভাবে পালিত হয়ে যায়। অতএব, এ মীমাংসিত বিষয় নিয়ে অহেতুক মতবিরোধ, মত-দ্বৈধতা, পরস্পরে বিদ্বেষপূর্ণ উষ্মা প্রদর্শন মুসলিম উম্মাহর দ্বীনি ভ্রাতৃত্ববোধের মধ্যে ফাটল সৃষ্টি বৈ কিছু নয়; যার কারণে এ সুযোগে দেশী-বিদেশী ইসলামবিদ্বেষীরা মুসলিম মিল্লাতের অপূরণীয় ক্ষতির মওকা খুঁজে পাচ্ছে। এমনকি প্রতিনিয়ত ক্ষতি করেও যাচ্ছে; যা আমরা শেষ নবীর উম্মত হয়েও পুরোপুরিভাবে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হচ্ছি।
ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, নবী সা:-এর আমলে, খোলাফায়ে রাশেদিনের সময় এমনকি তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের সময়েও ঈদে মিলাদুন্নবী সা: নামে কোনো উৎসবের প্রচলন ছিল না। জমহুর মুহাদ্দিসিনে কিরাম, ফিকহবিদ এবং ঐতিহাসিকরা এ বিষয়ে একমত পোষণ করেন। ইতিহাসবেত্তাদের মতে, রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে মিসরের ফাতেমীয় শাসকরা মিলাদুন্নবী উদযাপন করতেন। ঈদে মিলাদুন্নবীর প্রচলন শুরু হয় হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে। রাসূল সা:, হজরত আলী রা:, হজরত ফাতিমা রা:, ইমাম হাসান রা: ও ইমাম হুসাইন রা:-এর জন্মোৎসব উদযাপনের মূল প্রবর্তক ছিলেন খলিফা মুয়িজলি দিনিল্লাহ।
ইবনে জারির সূত্র মতে, আব্বাসীয় শাসনামলে বাদশাহ হারুনুর রশিদের মা খায়জুরান বিবি ১৭৩ হিজরিতে মদিনা শরিফে নবী সা:-এর রওজা মোবারক জিয়ারত ও সেখানে দরুদ পাঠের যে ব্যবস্থা আছে, ঠিক সেভাবে নবী সা: মক্কায় যে ঘরে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন, সেটির জিয়ারত ও সেখানে দোয়া করার প্রথা সর্বপ্রথম চালু করেন। পরবর্তীকালে ১২ রবিউল আউয়ালে তার নেতৃত্বে তীর্থযাত্রীরা প্রতি বছর নবী সা:-এর জন্মদিবস ধরে নিয়ে ওই ঘরে আনন্দোৎসব পালন শুরু করেন।
মুসলিমদের মধ্যে এই জন্মবার্ষিকী চালু হওয়ার পর আফজাল ইবনে আমিরুল জাইশ (৪৮৫-৫১৫ হি:) মিসরের ক্ষমতায় এলে মিলাদুন্নবীসহ আরো পাঁচটি (আলী রা:, ফাতিমা রা:, হাসান রা:, হুসাইন রা: ও জাইনুল আবেদিন রা:) জন্মবার্ষিকীর প্রথা বাতিল করে দেন। ৫১৫ হিজরিতে খলিফা আমির বিল আহকামিল্লাহ পুনরায় তা চালু করেন। মিলাদুন্নবীর প্রবর্তক হিসেবে সবচেয়ে বেশি প্রসিদ্ধ হলেন ইরাক অঞ্চলের ইরবিল প্রদেশের শাসক আবু সাঈদ মুজাফফর উদ্দিন কুকুবুরি। তিনি প্রথম সুন্নিসহ বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঈদে মিলাদুন্নবীর প্রবর্তন করেন। সিরাতুন্নবী গবেষক ও ঐতিহাসিকরা তাকেই মিলাদুন্নবীর প্রকৃত উদ্ভাবক বলে আখ্যায়িত করেন। কারণ, তিনি প্রথম এই উৎসবকে বড় আকারে উদযাপন শুরু করেন। সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ উৎসবের প্রচলন করেন। সে হিসেবে, ৬০৪ হিজরি থেকে আনুষ্ঠানিক মিলাদ উদযাপন শুরু হয়। মিলাদের উপর সর্বপ্রথম ‘কিতাবুল তানভিল ফি মাউলিদিস সিরা-জিল মুনির’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন স্পেনের অধিবাসী আবুল খাত্তাব ওমর ইবনে হাসান ইবনে দেহিয়া আল কালবি। যিনি ৯০ বছরের দীর্ঘ জীবনে ইসলামী বিশ্বের সর্বত্র ভ্রমণ করেন। ঈদে মিলাদুন্নবী নিয়ে মানুষের মধ্যে আগ্রহের সৃষ্টি করেন।
ভারতীয় উপমহাদেশে মিলাদুন্নবী প্রচলনকারী ছিলেন মোগল শাসকরা। ইসলামী অনুশাসনে মিলাদ, মিলাদুন্নবী প্রচলনকারী হলেন ফাতেমীয় শাসক মুয়িজলি দিনিল্লাহ। আর ভারতীয় উপমহাদেশে মিলাদ প্রচলনকারী মোগল সম্রাট হুমায়ুন ও সম্রাট আকবরের মা, তাদের অভিভাবক বৈরাম খাঁ। মোগল শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহের মাধ্যমে উপমহাদেশে সুন্নিদের মধ্যে মিলাদুন্নবীর প্রচলন হয়।
পরিশেষে বলা যায়, ঈদে মিলাদুন্নবী সা: উদযাপন নিয়ে নানা মত থাকার পরও ভারতীয় উপমহাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে দিনটি কালক্রমে উৎসবে রূপ নিয়ে প্রতি বছর সাড়ম্বরে পালিত হয়। বাংলাদেশসহ কিছু মুসলিম দেশে দিনটি সরকারি ছুটির দিন।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক