সিয়াম সাধনার মাস

রমজান তাকওয়ার মাত্রা উন্নয়নের মাস

Printed Edition

লিয়াকত আলী

আজ মাহে রমজানের তৃতীয় দিবস। রমজানের দিনগুলো রোজা দ্বারা সুসজ্জিত এবং রোজা কেবল বাহ্যিক ইবাদত নয়। বরং অন্তর্জগৎকে পরিশুদ্ধ ও উৎকর্ষ করার মাধ্যমও। মহান আল্লাহ বলেন : হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।

এই আয়াতটি স্পষ্ট করে যে, রোজার আসল উদ্দেশ্য তাকওয়া, অর্থাৎ আল্লাহর ভয়, তাঁর আনুগত্য এবং পাপ থেকে বেঁচে থাকার আকাক্সা তৈরি করা। রোজা একজন ব্যক্তির প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে আনে, আকাক্সাকে সীমাবদ্ধ করে এবং ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতার বাস্তব দীক্ষা প্রদান করে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোজার মাহাত্ম্য বর্ণনা করে বলেছেন : “রোজা একটি ঢাল যা মানুষকে পাপ এবং জাহান্নামের আগুন থেকে রা করে।” আরেকটি হাদিসে বলা হয়েছে যে, রমজান এলে জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়। এই হাদিসটি এই মাসের আধ্যাত্মিক পরিবেশকে প্রতিফলিত করে, যেখানে নেকির পথ সহজ হয়ে যায় এবং মন্দের পথ কঠিন হয়ে যায়।

রমজানের রাতগুলোরও অতুলনীয় মহিমা রয়েছে, বিশেষ করে লাইলাতুল কদর। পবিত্র কুরআনে এই রাতের ফজিলত এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে : লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এই রাতের ইবাদত ৮৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে করা ইবাদতের সমতুল্য বলে বিবেচিত হয়। এই রাতে আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতা ও বিশ্বস্ত আত্মা জিবরাইল অবতরণ করেন। এটা শান্তি, যা ভোরের উদয় পর্যন্ত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও সাওয়াবের নিয়তে লাইলাতুল কদর ইবাদতে কাটাবে , তার পূর্ববর্তী সব পাপ মা করা হবে। এই রাত আল্লাহর অসীম রহমতের বাস্তব ঘোষণা, যা তার বান্দাদের পাপের বোঝা থেকে মুক্ত করার জন্য দান করা হয়েছিল।

রমজান উদারতা ও করুণার মাসও। এই মাসে জাকাত, সদকাতুল ফিতর ও অন্যান্য দান প্রদানের জন্য উৎসাহিত করা হয় যাতে সমাজের দুর্বল শ্রেণীর চাহিদা পূরণ হয় এবং সামাজিক ভারসাম্য বজায় থাকে। রমজান মাসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবচেয়ে বেশি দানশীল হতেন। হাদিসে বর্ণিত আছে যে, তাঁর দানশীলতা প্রবল বাতাসের চেয়েও ব্যাপক ছিল। এই মাসে একজন রোজাদারকে ইফতার করানোর বিনিময়ে রোজাদারের মতোই সাওয়াব পায়। অথচ রোজাদারের সাওয়াবে কোনো হ্রাস করা হয় না। এই হাদিস আমাদের নিঃস্বার্থপরতা, ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ববোধের শিা দেয়।

রমজান দোয়া কবুলের একটি বিশেষ মাস। পবিত্র কুরআনে রোজার বিধান বর্ণনার সাথেই দোয়া কবুলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে- আর যখন আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, আমি সত্যিই কাছে। দোয়াকারী যখন আমাকে ডাকে, তখন আমি তার দোয়া কবুল করি।

এই আয়াতটি থেকে নির্দেশনা পাওয়া যায় যে, রমজানে বান্দা ও প্রভুর মধ্যে ঘনিষ্ঠতার অবস্থা আরো বৃদ্ধি পায়। অন্য হাদিসে যেমন উল্লেখ করা হয়েছে, রোজাদারের দোয়া প্রত্যাখ্যান করা হয় না। এ কারণেই এ মাসটি তাওবা, মা প্রার্থনা ও আল্লাহর সহায়তা প্রার্থনার সর্বোত্তম সুযোগ।

রমজানের বার্তা কেবল এক মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি পুরো বছর ও পুরো জীবনকে উন্নত করার জন্য আসে। এটি আমাদের শিা দেয় যে, যদি একমাস নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে বাকি এগারো মাসও আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় করা সহজ হয়। এই মাস আমাদের শৃঙ্খলা, সময়ের মূল্যায়ন, ইবাদতের আনন্দ ও মানবতার সেবার অনুভূতি দেয়। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, দুর্ভাগা ওই ব্যক্তি, যে রমজান পেয়েও মা লাভ করতে পারেনি। এই হাদিসটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই মহান মাসটি গাফিলতির মধ্যে কাটানো সবচেয়ে বড় তি।

সুতরাং, প্রতি বছর রমজান তার রহমত, বরকত ও মাহাত্ম্য নিয়ে আসে, মানুষকে তার প্রভুর সাথে সংযুক্ত করতে, তার হৃদয়কে পবিত্র করতে, তার জীবনের উদ্দেশ্য সফল করতে এবং তাকে তাকওয়ার পথে পরিচালিত করতে। যে ব্যক্তি এই মাসের মূল্য উপলব্ধি করে সে দুনিয়া ও আখেরাতে সাফল্য অর্জন করে, আর যে ব্যক্তি এর চেতনা থেকে বঞ্চিত হয় সে নিজেকে এক মহান সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে। এটিই রমজানের আসল বার্তা এবং এ মাসের প্রকৃত মাহাত্ম্য।