দিল্লিতে দুই মুসলিম নারী সাংবাদিককে মারধর ভারতজুড়ে ক্ষোভ
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে টেনেহিঁচড়ে থানায় নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে মারধরের শিকার হয়েছেন দুই মুসলিম নারী সাংবাদিক। তাদের অভিযোগ, তারা যে মুসলিম তা জানার পরই পুলিশি নির্যাতনের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। তাদের মারধরের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ভারতজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতে রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
দক্ষিণ দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানের সংবাদ সংগ্রহের সময় দিল্লি পুলিশ তাদের আটক ও নির্মমভাবে মারধর করে বলে অভিযোগ করেছেন দুই নারী সাংবাদিক। তারা জানিয়েছেন, পুলিশ কর্মকর্তারা যখন জানতে পারেন যে তারা মুসলিম, তখন নির্যাতনের মাত্রা আরো তীব্র হয়ে ওঠে।
শাহিন খান ও নাফিসা খান নামের এই দুই সাংবাদিক ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম ‘৪পিএম নিউজ নেটওয়ার্ক’-এর সাথে যুক্ত। তাদের শরীরের আঘাত ও জখমের দৃশ্য সম্বলিত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে বিরোধী দল, সাংবাদিক সংগঠন এবং ‘প্রেস কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া’ এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
এ দিকে দিল্লি পুলিশ এই অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে। পুলিশের দাবি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তার উপস্থিতিতে একটি অনুষ্ঠানের সময় নির্ধারিত ভিভিআইপি চলাচলের পথে বাধা সৃষ্টির অভিযোগে ওই দুই নারীকে সাকেত থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সাংবাদিকদের ভাষ্য প্রত্যাখ্যান করে পুলিশ এই অভিযোগগুলোকে ‘বাস্তবসম্মত নয়’, ‘বিভ্রান্তিকর’ ও ‘ভিত্তিহীন’ বলে অভিহিত করেছে।
সাকেতে কী ঘটেছিল?
ঘটনাটি ঘটে গত বৃহস্পতিবার, যখন সাকেতের ‘ম্যাক্স স্মার্ট সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল’-এর একটি নতুন অংশের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শাহ ও গুপ্তা উপস্থিত ছিলেন।
শাহিন খান ও তার সহকর্মীর ভাষ্য মতে, তারা অনুষ্ঠানটির সংবাদ সংগ্রহের জন্য সেখানে গিয়েছিলেন এবং মুখ্যমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন করার চেষ্টা করছিলেন। তাদের অভিযোগ, পুলিশ সদস্যরা তাদের বাধা দেয়, আটক করে এবং সাকেত থানায় নিয়ে যায়।
‘৪পিএম নিউজ নেটওয়ার্ক’-এর ছড়িয়ে দেয়া ভিডিওতে দেখা যায়, শাহিন খান থানার ভেতরে মারধরের বর্ণনা দিচ্ছেন এবং নিজের আঘাতের চিহ্ন দেখাচ্ছেন। আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, নাফিসা খান হাঁটতে পারছেন না এবং তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সাংবাদিকদের অভিযোগ- তাদের লাঠি দিয়ে পেটানো হয়েছে এবং চড় মারা হয়েছে।
শাহিন জানিয়েছেন, পুলিশ সদস্যরা তার নাম জানতে চান এবং ‘খান’ পদবি শুনে জিজ্ঞেস করেন তিনি কোন সম্প্রদায়ের। তার অভিযোগ, তিনি যে মুসলিম তা জানার পরই পুলিশি নির্যাতনের মাত্রা আরো বেড়ে যায়।
শাহিনের ভাষ্যমতে, এক পুলিশ কর্মকর্তা তার ফোনে ‘মোহাম্মদ’ নামের একজনের কাছ থেকে আসা একটি কল দেখতে পান এবং বলেন, ‘মুসলিম হ্যায়... দো ডান্ডে জ্যাদা মারো’ (অর্থাৎ, ‘সে মুসলিম... তাকে লাঠি দিয়ে আরো দুটো বাড়ি বেশি মারো’)। প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়ান উইমেনস প্রেস কোর, দিল্লি ইউনিয়ন অব জার্নালিস্টস, প্রেস অ্যাসোসিয়েশন এবং কেরালা ইউনিয়ন অব ওয়ার্কিং জার্নালিস্টস সাংবাদিকদের- এই সংগঠনগুলো ঘটনায় পুলিশ নির্যাতনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে। তারা স্টেশন হাউজ অফিসারসহ ঘটনায় জড়িত পুলিশ কর্মীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে এবং দিল্লি পুলিশের কমিশনার অনুরাগ কুমারের কাছে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ তদন্তের নির্দেশ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনগুলো ‘প্রেস কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া’-এর কাছেও আবেদন জানিয়েছে যেন তারা বিষয়টি স্বতঃপ্রণোদিতভাবে আমলে নেয় এবং একটি নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করে।
সাকেত পুলিশ স্টেশনের স্টেশন হাউজ অফিসার (এসএইচও)সহ সেখানে কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এই দাবি তোলা হয়েছে; কারণ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তার সাকেতের ম্যাক্স হাসপাতালে একটি নতুন বিভাগের উদ্বোধনের বিষয়ে সংবাদ সংগ্রহের সময় তারা ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক শাহিন খান ও নাফিসা খানকে নির্মমভাবে লাঞ্ছিত করেছিলেন।
‘৪ পিএম নিউজ নেটওয়ার্ক’ কয়েকটি ভিডিও প্রকাশ করার পর এই বিতর্ক আরো তীব্র হয়ে ওঠে; ওই ভিডিওগুলোতে দুই সাংবাদিকের শরীরে আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন দেখা যায় এবং তারা পুলিশ স্টেশনের ভেতরে তাদের সাথে হওয়া আচরণের বর্ণনা দেন। রাজনৈতিক নেতা ও সংবাদমাধ্যমসহ অনেকেই এই ফুটেজটি ব্যাপকভাবে শেয়ার করেছেন।
মারধরের ঘটনায় বিরোধী দলগুলোর নিন্দা
বিরোধী দল কংগ্রেসের মুখপাত্র পবন খেরা এই দৃশ্যগুলোকে ‘ভয়াবহ’ বলে অভিহিত করেছেন এবং প্রশ্ন তুলেছেন যে দিল্লি কি একটি ‘পুলিশি রাষ্ট্রে’ পরিণত হচ্ছে। কংগ্রেস নিজেই ভিডিওটি ছড়িয়ে দেয় এবং অভিযোগ করে যে, মুখ্যমন্ত্রীকে প্রশ্ন করার চেষ্টার পর বিজেপি সরকার ও দিল্লি পুলিশ ওই সাংবাদিককে (খান) আটক ও তার ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছে দলটি।
আম আদমি পার্টিও দিল্লি সরকারের সমালোচনায় সরব হয়েছে; দলের নেতা সৌরভ ভরদ্বাজ অভিযোগ করেছেন যে, মুখ্যমন্ত্রীকে প্রশ্ন করার কারণে ওই সাংবাদিকদের ওপর নৃশংসভাবে হামলা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি, দলের আরেক নেতা সোমনাথ ভারতী এ বিষয়ে দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নরের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
বিরোধী শিবিরের এই নিন্দার সুরে কণ্ঠ মিলিয়েছেন রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতা তেজস্বী যাদবও। ‘এক্স’ -এ দেয়া এক পোস্টে তিনি এই ঘটনাকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার ওপর গুরুতর আঘাত বলে অভিহিত করেছেন।
তিনি লিখেছেন, “মোদিজির তথাকথিত ‘অমৃত কাল’ ও ‘নতুন ভারত’-এ মুসলিম হওয়া, নারী হওয়া এবং নিরপেক্ষ সাংবাদিক হওয়াটাই এখন সবচেয়ে বড় অপরাধ।” তিনি আরো বলেন, সারা দেশে বিজেপি তাদের স্বৈরাচারী ও কর্তৃত্ববাদী আচরণের সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
উল্লেখ্য, ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতের উন্নয়নের যে রূপকল্প বা ভিশন সরকার গ্রহণ করেছে, তাকে তারা ‘অমৃত কাল’ বলে অভিহিত করছে; আর ‘নতুন ভারত’ হলো একটি আধুনিক ও রূপান্তরিত ভারতের লক্ষ্যে তাদের ঘোষিত বৃহত্তর স্লোগান।
সাংবাদিকদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘৪পিএম নিউজ নেটওয়ার্ক’ বিষয়টি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক কার্যালয় পর্যন্ত নিয়ে গেছে। তারা ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে হস্তক্ষেপের আবেদন জানিয়েছে এবং কথিত হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে।
সংস্থাটি সংশ্লিষ্ট সিসিটিভি ফুটেজ ও ভিডিও প্রমাণাদি সংরক্ষণ করার এবং ঘটনায় দায়ী পুলিশ কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারও আহ্বান জানিয়েছে।