এবার পাকিস্তানের জালে ৫ গোল

জয়ের গল্পটা একদিনের নয়

Printed Edition

জসিম উদ্দিন রানা

এক ম্যাচে সাত গোল, পরের ম্যাচে পাঁচ! চায়নিজ তাইপেকে ৭-০ গোলে উড়িয়ে দেয়ার পর পাকিস্তানকে ৫-১ গোলে হারিয়ে জুনিয়র এশিয়া কাপে বাংলাদেশের মেয়েদের পথচলা এখন স্বপ্নের মতো। দুই ম্যাচে ছয় পয়েন্ট, গোলের ব্যবধানও ঈর্ষণীয়। কিন্তু এই সাফল্যকে শুধু স্কোরবোর্ডের সংখ্যায় মাপলে ভুল হবে। কারণ এই মেয়েদের আজকের আলোয় আসার গল্পটা একদিনের নয়, এর পেছনে আছে দীর্ঘ অপেক্ষা, পরিশ্রম, ত্যাগ আর নিজেদের মধ্যে গড়ে ওঠা এক অটুট বন্ধনের গল্প। জুনিয়র এশিয়া কাপে বাংলাদেশের পরবর্তী ম্যাচ আগামীকাল। প্রতিপক্ষ কাজাখস্তান।

বাংলাদেশের মেয়েদের হকির বাস্তবতাটা খুব একটা সহজ নয়। দেশের বিভিন্ন জেলা ও শহর থেকে উঠে এসেছে এই মেয়েরা। কেউ কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলের মাঠে স্টিক হাতে নিয়েছে, কেউ স্থানীয় পর্যায়ে অনুশীলন করেছে, কেউ আবার সুযোগের অপেক্ষায় থেকেছে দিনের পর দিন। একেকজনের বেড়ে ওঠার গল্প একেক রকম। ছিল সুযোগের সীমাবদ্ধতা, ছিল নিয়মিত অনুশীলনের অভাব, ছিল পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার ঘাটতিও। বিচ্ছিন্ন সেই প্রতিভাগুলো একসময় এক ছাদের নিচে এসে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান- বিকেএসপিতে।

সেখানেই বদলেছে গল্পের গতিপথ। আলাদা আলাদা জেলা শহরের মেয়েরা ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে একটি দল। ব্যক্তিগত স্বপ্নগুলো মিশেছে জাতীয় দলের স্বপ্নে। মাঠের বাইরের বন্ধুত্ব জায়গা করে নিয়েছে মাঠের বোঝাপড়ায়। কে কখন কোথায় দৌড়াবে, কার পাসে কে ছুটবে, পেনাল্টি কর্নারে কার দায়িত্ব কী- এসবের সাথে তৈরি হয়েছে একে অন্যের প্রতি বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসই এখন মাঠে প্রতিফলিত হচ্ছে।

চায়নিজ তাইপের বিপক্ষে প্রথম কোয়ার্টারে গোল না পেলেও বাংলাদেশ ধৈর্য হারায়নি। এরপর একের পর এক আক্রমণে প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করে সাত গোলের জয় তুলে নেয়। কনা আক্তার, নাদিরা তালুকদার ইমা, আইরিন আক্তার রিয়া ও অধিনায়ক সারিকা রিমনের গোলে তৈরি হয় বড় ব্যবধান।

চীনের ইনার মঙ্গোলিয়ার হুলুনবুইর সিটির মরিন দাউর গ্রাউন্ডে পাকিস্তানকে প্রতিকূল আবহাওয়া ও তীব্র ঠাণ্ডা উপেক্ষা করে ৫-১ গোলে উড়িয়ে দিলো বাংলাদেশের মেয়েরা। কনকনে ঠাণ্ডার চ্যালেঞ্জ নিয়ে ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক কৌশল নেন কোচ আরিফ আলীর শিষ্যরা। প্রথম কোয়ার্টারের ৯ মিনিটে লনিমা নূপুরের দুর্দান্ত ফিল্ড গোলে লিড নেয় বাংলাদেশ। দ্বিতীয় কোয়ার্টারের ১৯ মিনিটে নাদিরা ইমা আরো একটি চোখধাঁধানো ফিল্ড গোল করলে ব্যবধান দ্বিগুণ হয়। প্রথমার্ধেই ২-০ গোলে এগিয়ে থেকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ নেয় লাল-সবুজ দল।

তৃতীয় কোয়ার্টারে বৃষ্টির বেগ বাড়লেও আক্রমণের ধার কমেনি বাংলাদেশের। ৩৩ মিনিটে পেনাল্টি স্ট্রোক থেকে নিখুঁত শটে দলের তৃতীয় গোলটি করেন অধিনায়ক শারিকা রিমন। ম্যাচের ৪১ মিনিটে পাকিস্তানের মারিয়া শাকিল একটি ফিল্ড গোল করে ব্যবধান ৩-১ করলেও, তার ঠিক দুই মিনিট পর ৪৩ মিনিটে বাংলাদেশের কনা আক্তার দারুণ এক ফিল্ড গোলে দলের চতুর্থ গোলটি নিশ্চিত করেন। এরপর ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার ঠিক আগ মুহূর্তে, ৫৭ মিনিটে পেনাল্টি কর্নার থেকে দলের পঞ্চম ও শেষ গোলটি উপহার দেন আইরিন আক্তার রিয়া। দুই ম্যাচে বাংলাদেশের মেয়েদের গোল ১২, বিপরীতে হজম করেছে মাত্র একটি।

তবে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়তো এই জয়-পরাজয়ের হিসাবের বাইরেও। যে মেয়েরা একসময় দেশের নানা প্রান্তে বিচ্ছিন্নভাবে হকি খেলত, তারাই আজ একই জার্সিতে, একই স্বপ্নে, একই লক্ষ্যে ছুটছে। বিকেএসপির সেই দলীয় বন্ধন এখন এশিয়ার মঞ্চে বাংলাদেশের শক্তি হয়ে উঠেছে।

এশিয়া কাপের পথ এখনো অনেক বাকি। সামনে আরো কঠিন প্রতিপক্ষ, আরো কঠিন পরীক্ষা। কিন্তু শুরুটা যে আত্মবিশ্বাসী, তাতে সন্দেহ নেই। ২০২৪ আসরে নবম হওয়া বাংলাদেশ এবার দ্বিতীয়বারের অংশগ্রহণেই বদলে দিতে চাইছে নিজেদের গল্প।

এই মেয়েদের তাই শুধু ‘জয়ী দল’ হিসেবে দেখলে হবে না। তারা বাংলাদেশের নারী হকির সম্ভাবনার প্রতিচ্ছবি। তাদের সাফল্য বলছে- প্রতিভাকে যদি পরিচর্যা করা যায়, বিচ্ছিন্ন প্রতিভাগুলোকে যদি দলীয় বন্ধনে বাঁধা যায়, তবে বাংলাদেশের মেয়েরাও এশিয়ার হকি মঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। আজকের ৭-০ কিংবা ৫-১ তাই কেবল দু’টি জয় নয়; এগুলো বহু দিনের ঘাম, অপেক্ষা আর স্বপ্নের সম্মিলিত ফল।