ই.ফ.তা.র
ঐতিহ্যের দস্তরখান : হাইকোর্ট মাজার মসজিদের ইফতার ও মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ইমারত
Printed Edition
হাবিবুল বাশার
রাজধানীর ব্যস্ততম কদম ফোয়ারা মোড় পেরিয়ে হাইকোর্ট মাজারের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলেই এক শান্তিময় আধ্যাত্মিক আবহ। এখানে শায়িত আছেন ঢাকার আদি আউলিয়া হিসেবে পরিচিত হজরত শাহ শরফুদ্দিন চিশতী (রহ.)। শত বছরের প্রাচীন এই মাজার ও মসজিদকে কেন্দ্র করে প্রতি রমজানে জমে ওঠে এক অনন্য মানবিক মিলনমেলা, যা এখন ঢাকার ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
হাইকোর্ট মাজার মসজিদ মূলত হজরত শাহ শরফুদ্দিন চিশতী (রহ.)-এর খানকাহ ও মাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ঐতিহাসিকদের মতে, তিনি ছিলেন চিশতিয়া তরিকার একজন প্রখ্যাত সুফি সাধক, যিনি মুঘল আমলেরও কয়েক শ বছর আগে এ দেশে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এসেছিলেন।
সুনির্দিষ্ট কোনো একক ব্যক্তি এই মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা না হলেও, মুঘল আমলে এখানে একটি ইবাদতখানা ছিল বলে ধারণা করা হয়। পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলে ১৯০৫ সালের পর এলাকাটি প্রশাসনিক গুরুত্ব পেলে মাজার ও মসজিদটি বর্তমান কাঠামোর ভিত্তি পায়। বর্তমানে এটি সুপ্রিম কোর্ট মাজার ও মসজিদ প্রশাসন কমিটির অধীনে পরিচালিত হয়।
মুসাফিরখানা থেকে গণ-আয়োজন
হাইকোর্ট মাজারে ইফতারের শুরুর ইতিহাসটি মূলত সুফি ঐতিহ্যের ‘লঙ্গরখানা’ সংস্কৃতির সাথে মিশে আছে। বিশ শতকের শুরুর দিকে এখানে আসা মুসাফির ও ভক্তদের জন্য সামান্য ডাল-ভাত বা খিচুড়ির ব্যবস্থা থাকত। রমজান এলে তা ইফতারে রূপ নিত।
প্রবীণ খাদেমদের মতে, ১৯৫০-এর দশকের পর যখন ঢাকায় আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের আনাগোনা বাড়ে, তখন থেকেই ইফতার আয়োজনটি প্রাতিষ্ঠানিক ও বড় আকার ধারণ করে। আশির দশকে এটি পূর্ণাঙ্গ ‘গণ-ইফতারে’ রূপ নেয়।
সুপ্রিম কোর্ট হাফেজি মাদরাসার শিক্ষক হাফেজ রফিকুল ইসলাম বলেন, আমি ২০০৪ সাল থেকে এই মাজারে রমজান মাসের আবহ দেখে আসছি। প্রতি বছরই রমজানে এখানে প্রায় এক থেকে দেড় হাজার মানুষের ইফতারের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা করা হয়। ইফতারের মেনুতে সাধারণত পুষ্টিকর খিচুড়ি, নানা পদের ফল এবং শরবতসহ ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী থাকে। এ ছাড়া এই দরবারের বিশেষত্ব হলো, এখানে কেবল রমজানেই নয়, বরং সারা বছরই প্রতিদিন দুপুরে এবং সন্ধ্যায় কয়েক শ মানুষের জন্য নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা থাকে।
বর্তমানে হাইকোর্ট মাজার মসজিদের ইফতার আয়োজন এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। প্রতিদিন এখানে গড়ে এক হাজার থেকে এক হাজার ৫০০ মানুষ একসাথে ইফতার করেন। এই ইফতারের কোনো সরকারি স্থায়ী বাজেট নেই। এর ব্যয়ভার বহন করেন সুপ্রিম কোর্টের প্রথিতযশা আইনজীবী, বিচারক এবং সাধারণ দানশীল ব্যক্তিরা। অনেকে তাদের মনের আশা পূরণে বা মৃত আত্মীয়দের আত্মার মাগফেরাত কামনায় এখানে বড় ডেকচিতে তেহারি বা বিরিয়ানি মানত হিসেবে প্রদান করেন।
হাইকোর্ট মাজার ও মসজিদ পরিচালনা কমিটির সহকারী সচিব মো: হাবিবুর রহমান বলেন, হাইকোর্ট মাজারের এই বিশাল ইফতার আয়োজন মূলত ভক্ত ও অনুরাগীদের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। যারা এই দরবারের আশেকান ও অনুরাগী আছেন, তারাই মূলত স্বতঃস্ফূর্তভাবে এখানে ইফতারের যাবতীয় ব্যবস্থা করে থাকেন। এটি একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল, যেখানে মানুষের সেবা করাই মূল লক্ষ্য।
ইফতার তালিকায়
সাধারণ ছোলা-মুড়ি, পিঁয়াজু, বেগুনি ও শরবতের পাশাপাশি মাজারের ‘খাস তাবারক’ হিসেবে খিচুড়ি একই পাত্রে পরিবেশন করা হয়। বড় গোলাকার একপাত্রে একসাথে ৪-৫ জন বসে। এখানে দস্তরখানে কোনো ভেদাভেদ নেই। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীর পাশে বসেই ইফতার করেন কোনো আশ্রয়হীন ছিন্নমূল মানুষ।
প্রতিদিন ইফতারের ঠিক আগে মাজার চত্বরে এক পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। মাজার মসজিদের ইমাম সাহেবের নেতৃত্বে যখন সম্মিলিত মুনাজাত হয়, তখন আইনজীবী থেকে শুরু করে পথশিশু সবার হাত একযোগে উঠে স্রষ্টার দরবারে। এই দৃশ্যটি কেবল ক্ষুধার নিবারণ নয়, বরং মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভ্রাতৃত্বের এক পরম নিদর্শন।
হাইকোর্ট মাজারের সিনিয়র খাদেম মো: শফিউর রহমান বলেন, এই খানকায় প্রতিদিন শত শত মানুষের জন্য দুপুর ও রাতে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। বিশেষ করে অনেক ছিন্নমূল মানুষ ও দরিদ্র মানুষরা এখানে নিয়মিত খাবার খান। তবে শুধু নিম্ন আয়ের মানুষই নয়, মাঝে মাঝে অফিস-আদালতের কর্মজীবী লোকেরাও বরকতের আশায় এই লঙ্গরখানায় শরিক হন। রমজান মাসে এই আয়োজনের পরিধি আরো অনেক বেড়ে যায়।
হাইকোর্ট মাজার মসজিদের ইফতার আয়োজন প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় ঐতিহ্য যখন মানবিকতায় মিশে যায়, তখন তা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অনন্য সম্পদ হয়ে দাঁড়ায়। শত বাধা ও পরিবর্তনের মাঝেও এই আয়োজন আজও আপন মহিমায় ভাস্বর।