হুমকির মুখে দেশের একমাত্র স্বয়ংসম্পূর্ণ লবণ শিল্প
উৎপদন খরচ সাড়ে ৩০০ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২২০ টাকা
Printed Edition
মাঠে লবণ উৎপাদন খরচ পড়ছে সাড়ে ৩০০ টাকা আর সেই লবণ পাইকারী বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২২০ টাকায়। এতে চাষিরা প্রতিমণ লবণ বিক্রি করে লোকসান গুণছেন ১৩০ টাকা। সে কারণে চলতি মৌসূমে লবণ উৎপাদনে ধ্বস নেমেছে। উপকূলের চাষিরা লবণ উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন আর চাসিদের মধ্যে এই ধারা অব্যাহত থাকরে দেশের একমাত্র স্বয়ংসম্পূর্ণ লবণ শিল্প হুমকির মুখে পড়তে পারে।
চলতি মৌসূমে ১০ জানুয়ারী সরকারী দিন পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার মিলে লবণ উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৯৮ হাজার ৪১২ মেট্রিকটন। অপরদিকে গত মৌসূমে একই দিন (১০ ফেব্রুয়ারী) পর্যন্ত ২ লাখ ৬১ হাজার ৫১৩ মেট্রিকটন। গত মৌসূমের একই সময়ে পাইকারী ক্রুডলবণ (অপরিশোধিত) প্রতিমন বিক্রি হয়েছিল ২৪০ টাকা আর এ মৌসূমে বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২২০ টাকা।
জানা গেছে, দেশে শিল্প কারখানায় ব্যবহার হচ্ছে কসটিক সোডা ও বিভিন্ন ধরণে ক্যামিকেল যা লবণ দিয়ে তৈরী করা হয়। কসটিক সোডার জন্য প্রয়োজন হয় সোডিয়াম সালফেট ও অন্যান্য ক্যামিকেল তৈরী করতে প্রয়োজন হয় উন্নত মানের সোডিয়াম ক্লোরাইড (ভোজ্য লবণ) সোডিয়াম মালফেট দেশে উৎপাদন হয়না অপরদিকে দেশের উৎপাদিত সোডিয়াম ক্লোরাইড(ভোজ্যলবণ) দিয়ে গুণগতমান ভাল না হওয়া ক্যামিকেল তৈরীতে বিপুল পরিমাণ ঘাটতি দেখা দেয়।
এ দুই কারণে সরকার কসটিক সোডা ও বিভিন্ন ক্যামিকেল তৈরীর জন্য বিদেশ থেকে থেকে সোডিযাম সালফেট ও সোডিয়াম কেক্লাআইড আমদানীর সুযোগ দেন। আর ওই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সোডিয়াম সালফেট ও সোডিয়াম ক্লোরাইড এর আড়ালে মিস ডিকলারেশনের মাধ্যমে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও শিল্প মালিক পক্ষ্য লাখ লাখ টাকার অতিরিক্ত লবণ আমদানী করছেন। ফলে কসটিক সোডা ও ক্যামমিক্যাল তৈরীর পরে উবৃদ্ধ লাখ লাখ মেট্রিকন লবণ অনায়েশে লবণ কারখানায় সরবরাহ করছে। যার ফলে দেশে লবণ উৎপানের ধ্বস নামলেও সংগত কারণে লবন মিল ও চাষদের কাছে লাখ লাখ টন লবণ মৌজুদ থেকে যাচ্ছে। আর এ কারনেই মুলত মাঠে উৎপাদিত লবণের মূল্য এখন সর্বনি¤œ পর্যায়ে রয়েছে।
গত মৌসূম থেকে চলতি মৌসূমের মধ্য সময় পর্যন্ত অব্যাহত ভাবে উৎপাদিত লবণের অস্বাভাবিক দর পতন হওয়ার কারণে লবণ চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন চাষিরা। ফলে চলতি মৌসূমে সময়মত লবণ উৎপাদনে অধিকাংশ চাষি মাঠে নামেনি। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ১০ শতাংশ লবণের মাঠ এখনও পরিত্যাক্ত রয়ে গেছে।
লবণ নীতিমালা-২২ এর পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়া ও উৎপাদিত লবণের পাইকারী ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ না করা এবং বিদেশ থেকে শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত ক্যামিকেল তৈরীর জন্য সোডিয়াম সালফেট ও সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানীর ক্ষেত্রে যথাযথ নজরদারি বা সঠিক তদারকি না থাকার সুযোগে আমদানী কারকগণ অতিরিক্ত লাখ লাখ টন উন্নতমানের সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানী করেন ও অনায়েসে তা বাজারজাত করছে। যার কারণে মাঠে উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে লবণ চাষিরা।
লবণ নীতিমালা-২২ বাস্তবায়ন ও সরকারী ভাবে উৎপাদিত লবণের পাইকারী বিক্রয় মূল্য নির্ধারণ না হওয়া এবং শিল্প কারখানার প্রয়োজনে বিদেশ থেকে লবণ আমদানীতে যথাযথ নজরদারী না থাকার কারণে চাষিরা গত দুইবছর ধরে উৎপাদিত লবণের যথাযথ দাম না পাওয়ায়, উৎপাদন মৌসূম শুরু হলেও লবণ উৎপাদনে অধিকাংশ চাষি এখনও মাঠে নামেনি। একদিকে উৎপাদিত লবণের দাম না পাওয়ায় গতবছরের তুলনায় গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত লবণ উৎপাদনে ধ্বস নেমেছে। এদিকে চলতি মৌসূমে দেশে ২৭ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিকটন লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিসিক লবণ প্রকল্পের জেনারেল ম্যানেজার জাফর ইকবাল ভূঁইয়া ১০ ফেংব্রুয়ারী পর্যন্ত লবণ উৎপাদন পাইকারী লবণের মূল্য বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গতকাল একাধিক লবণ চাষি জানিয়েছেন গতবছর প্রতিমন লবন উৎপাদন খরচের চেয়ে এ বছর উৎপাদন খরচ আরো বেশী পড়ছে। মাঠে প্রতিমন লবণ উৎপাদন খরচ পড়ছে প্রকার ভেদে সাড়ে ৩০০ টাকার উপরে। লবণ চাষিরা জানিয়েছেন উৎপাদিত লবণের মূল্য ঠিকভাবে না পাওয়ার কারণে চাষিরা মাঠে লবণ উৎপাদনে ভরসা পাচ্ছেন না। মাঠ পর্যায়ে লবণ চাষীরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কাছে মাঠে উৎপাদিত লবণের পাইকারী বিক্রয় মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়ার জন্য দাবী করে আসলে তা বাস্তবায়ন হয়নি।
এদিকে গত মৌসূমে (২০২৪-২৫) বিপুল পরিমাণ ঘাটতি নিয়ে লবণ উৎপাদন মৌসূম শেষ হয় (ঘাটতি ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৩৪৯ মেট্রিকন লবণ)। চাহিদার তুলনায় ঘাটতি দেখা দিলে সব ধরনের পণ্যের মুল্য সাভাবিক ভাবে বেড়ে গেলেও উৎপাদিত লবণের ক্ষেত্রে তা হচ্ছে সম্পূর্ণ বিপরীত, লবণের পাইকারী মূল্য বৃদ্ধি পাওয়াত দুরের কথা অস্বাভাবিক ভাবে হ্রাস পাওয়ায় বছরজুড়ে চাষিরা গড়ে প্রতিমনে ১০০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা লোকসান গুনছেন। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার চাষিরা অবিলম্বে লবণ নীতিমালা বাস্তবায়ন ও মাঠে উৎপাদিত লবণের পাইকারী মূল্য নির্ধারণ করে দেয়ার জন্য দাবী জানিয়েছেন।
চলতি ২০২৫-২০২৬ লবণ উৎপাদন মৌসূমে ২৭ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিকটন লবণ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি মৌসূমের ১৫ নভেম্বর থেকে পরবর্তি বছরের ১৫ মে পর্যন্ত লবণ উৎপাদন মৌসূম ধরা হয়। জানা গেছে, গত ২০২৪-২০২৫ মৌসূমে ২৬ লাখ ১০ হাজার মেট্রিকটন লবণ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে লবণ উৎপাদন হয়েছিল ২২ লাখ ৫১ হাজার ৬৫১ মেট্রিকটন। দেশের সমস্ত লবণ উৎপাদন হয় চট্টগ্রামের বাঁশখালী আনোয়ারা পটিয়া উপজেলা কক্সবাজার জেলায়। গত মৌসূমে ৬৩ হাজার ১৯৮ একর জমিতে ৪১ হাজার ৩৫৫ চাষি লবণ চাষে সক্রিয় ছিলেন বলে বিসিক সুত্রে জানা গেছে।
জানা গেছে, দেশে শিল্প কারখানায় সোডিয়াম সালফেট প্রয়োজন রয়েছে প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ মেট্রিকটন। যা দেশে উৎপাদন হয়না। অপর দিকে শিল্পকারখানায় সোডিয়াম ক্লোরাইড (ভোজ্যলবণ) প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার হয়। বিশেষ করে সোডিয়াম ক্লোরাইড থেকে শিল্প কারখানায় ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন ক্যামিকেল তৈরী করা হয়। যা দেশে উৎপাদিত লবণ থেকে ওই ক্যামিকেল উৎপাদন করতে হলে লবণের ঘাটতি বেশী হয়। এসব কারণে সরকার সোডিয়াম সালফেট ও বিদেশে উৎপাদিত সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানীর সুযোগ দেন। আর ওই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আমাদানী কারকগণ প্রয়োজনের অতিরিক্ত লাখ লাখ মেট্রিকটন সোডিয়াম ক্লোরাইড আমাদানী করেন এবং তা অনায়েশেই তা বাজারজাত করছে। যার কারণে লবণ উৎপাদনে ঘাটতি হলেও বিপুল পরিমাণ লবণ মৌজুদ থাকায় চাষিরা পাইকারী লবণ বিক্রি করে লোকসান গুণে চলেছেন চাষিরা।