স্বপ্নভঙ্গের জুলাই : মূলধারার রাজনীতিতে অবহেলিত জেন-জি

দুই বছর পেরিয়ে গেলেও অধরা ‘নতুন বন্দোবস্ত’, হতাশ তরুণরা

হাবিবুল বাশার
Printed Edition

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ এবং হাজার হাজার আহত মানুষের স্বপ্ন ছিল একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত। কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ছাত্রসমাজের যে দাবি উত্থাপিত হয়েছিল, তা অল্প সময়ের মধ্যেই জনতার দাবিতে পরিণত হয়। দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের অবসান চেয়েছিল দেশের আপামর জনগণ। সেই আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে সাবেক সরকার রেখে যায় অসংখ্য মানুষের আজীবন পঙ্গুত্বের বেদনাময় স্মৃতি।

তবে অভ্যুত্থানের প্রায় দুই বছর পরও প্রত্যাশিত রাষ্ট্র সংস্কার ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বাস্তবায়ন না হওয়ায় তরুণদের একটি বড় অংশ হতাশ। তাদের অভিযোগ, সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আসেনি; ফ্যাসিবাদের অনেক পুরনো কাঠামো এখনো বহাল রয়েছে।

জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে ছিল যে প্রজন্ম, সেই জেন-জি তরুণদের অনেকেই এখন মনে করছেন, তারা মূলধারার রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। এক দিকে রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা, অন্য দিকে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান- সবমিলিয়ে তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও হতাশা বাড়ছে।

জুলাইয়ের স্বপ্ন এখনো অধরা

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সমন্বয়ক ইভান তাহসীব নয়া দিগন্তকে বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে জনতার ঐতিহাসিক বিজয় হলেও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর যে মৌলিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা আন্দোলনকারীরা করেছিলেন, তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। তার ভাষায়, দুর্নীতি, লুটপাটের সুযোগ এবং জটিল আমলাতান্ত্রিক যে কাঠামো সাধারণ মানুষকে নিপীড়নের মধ্যে রাখে, সেটির পরিবর্তন ঘটেনি। তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে আলোচিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে পারেনি এবং বর্তমান সরকারও এ বিষয়ে যথেষ্ট আন্তরিক নয়। ইভান তাহসীবের মতে, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপি অনেক সময় জুলাই প্রসঙ্গে আক্রমণাত্মক অবস্থান নেয়। আবার কিছু রাজনৈতিক শক্তি জুলাইয়ের স্মৃতিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করলেও আন্দোলনের প্রকৃত চেতনা ধারণ করছে না। ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে এখনো মূলধারায় কেবল একটি ‘রেজিম চেঞ্জ’ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় মুখপাত্র সিনথিয়া জাহিন আয়েশাও একই ধরনের অভিমত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, আন্দোলনে অংশ নেয়া অনেকেই নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও প্রকৃত পরিবর্তনের প্রত্যাশায় রাজপথে নেমেছিলেন। কিন্তু সেই প্রত্যাশা বাস্তবে পূরণ না হওয়ায় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে আন্দোলনে সরাসরি অংশ নেয়া তরুণরা হতাশ। তার মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সময়মতো প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়েছে। পরবর্তীতে নির্বাচিত বিএনপি সরকারও জুলাই সনদ ও সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে যে অবস্থান নিয়েছে, তা আন্দোলনকারীদের কাছে এক ধরনের প্রতারণা বলেই মনে হচ্ছে।

তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক কেন্দ্রীয় সহদফতর সম্পাদক সিয়াম আন নুফাইস মনে করেন, ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি। জুলাই অভ্যুত্থানের অর্জন টিকিয়ে রাখতে হলে সামনে আরো রাজনৈতিক ও সামাজিক লড়াই প্রয়োজন।

শিক্ষার্থীদের চোখে অপূর্ণ প্রত্যাশা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তাহমিদুর রহমান সাদ বলেন, তারা সংবিধানের আমূল পরিবর্তন, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রকাঠামো এবং শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতির স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু প্রশাসনিক কাঠামোয় এখনো বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন চোখে পড়েনি। তবে তিনি এখনো আশাবাদী এবং প্রয়োজন হলে আবারো রাজপথে নামার প্রস্তুতির কথাও জানান। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মোস্তাকিম বিল্লাহর মূল্যায়ন আরো কঠোর। তার ভাষায়, মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো তরুণদের নতুন চিন্তা ও নেতৃত্বকে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে না। সরকারি দলের ক্ষেত্রে দলীয়করণ, দখলদারিত্ব ও মৌলিক অধিকার সঙ্কোচনের প্রবণতা অনেকটাই আগের মতো রয়ে গেছে। অন্য দিকে বিরোধী দলও কার্যকর বিকল্প রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে তুলতে পারেনি। এমনকি তরুণ নেতৃত্বে গঠিত এনসিপিও ধীরে ধীরে পুরনো ধারার রাজনীতিতে ফিরে যাচ্ছে বলে তার অভিযোগ।

রাজনৈতিক অনীহা, বাড়ছে হতাশা : দাবি বিচারের

এবি পার্টির নেতা ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, পুরনো রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদদের প্রতি তরুণদের অনীহা নতুন কোনো ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। তবে দুঃখজনকভাবে নতুন কিংবা পুরনো কোনো রাজনৈতিক শক্তিই নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সুস্পষ্ট রূপরেখা তরুণদের সামনে তুলে ধরতে পারেনি। তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি তরুণদের হতাশা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। আগামী প্রজন্মের চিন্তাচেতনাকে যথাযথ সম্মান না জানানো হলে এবং তাদের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন না ঘটলে তারা আবারো রাজপথে নামতে পারে, যা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য নতুন সঙ্কট সৃষ্টি করতে পারে। তাই নতুন প্রজন্মের সাথে সম্মানজনক রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

জুলাই যোদ্ধার ক্ষোভ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে এক হাত হারানো জুলাই যোদ্ধা আতিকুল গাজী বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকেই জুলাই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল শুধু সরকারের পতন নয়; বরং গুম, খুন, লুটপাট, চাঁদাবাজি ও দমন-পীড়নের রাজনীতির অবসান ঘটানো। তিনি বলেন, ‘আমরা যে পরিবর্তন চেয়েছিলাম, তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। গণভোটের রায় কার্যকর হলে হয়তো সেই পরিবর্তনের পথ তৈরি হতো। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছ থেকেও আমরা যতটা প্রত্যাশা করেছিলাম, ততটা পাইনি।’ তিনি আরো বলেন, ‘যদি কোনো সরকার আবারো ফ্যাসিবাদী পথে হাঁটতে চায়, তাহলে জনগণ তাকেও প্রতিহত করবে। আমি আগেও বলেছিলাম, প্রয়োজনে আরেকটি হাতও দেশের জন্য দিতে প্রস্তুত আছি।’

এনসিপির বক্তব্য

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জুলাই আন্দোলনের শীর্ষনেতা নাহিদ ইসলাম এমপি বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তী সরকারকে সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন এই তিনটি দায়িত্ব দিয়ে ক্ষমতায় বসানো হয়েছিল। কিন্তু তারা ন্যূনতম সংস্কার ও বিচারের চেষ্টা করেই নির্বাচন সম্পন্ন করেছে।’

তিনি অভিযোগ করেন, ‘নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীনরা সংস্কারের উদ্যোগ কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে এবং বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিও সর্বোচ্চ উদাসীনতা দেখিয়েছে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে পরাজিত ফ্যাসিবাদী শক্তি।’ নাহিদ ইসলাম দ্রুততম সময়ের মধ্যে জুলাই গণহত্যাসহ ফ্যাসিবাদী শাসনামলে সংঘটিত সব হত্যার বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।