দেশে ৮২ লাখ মাদকসেবী সর্বাধিক ঢাকায়
৫৯ শতাংশই তরুণ
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে এবং এদের বড় অংশই তরুণ। ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে মাদক ব্যবহারকারীর হার ৫৯ শতাংশ, আর ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোরদের মধ্যে এ হার ৩৩ শতাংশ। একজন মাদক ব্যবহারকারী প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৬ হাজার টাকা মাদক কেনায় ব্যয় করে। ব্যবহৃত মাদকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সেবিত হচ্ছে গাঁজা (ক্যানাবিস)।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি (বিএমইউ) ও রিসার্চ অ্যান্ড কনসালটেন্টস লিমিটেড (আরএমসিএল) যৌথভাবে পরিচালিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে পরিচালিত এ গবেষণায় নেটওয়ার্ক স্কেলআপ মেথড ব্যবহার করে দেশের ৮ বিভাগের ১৩ জেলা ও ২৬ উপজেলা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
গবেষণা অনুযায়ী, দেশে মোট মাদকসেবীর সংখ্যা প্রায় ৮২ লাখ। এর মধ্যে ৬০ লাখ ৭৯ হাজার ৯১৪ জন গাঁজা সেবন করে। অ্যালকোহল সেবনকারীর সংখ্যা ২ লাখ ২০ হাজার ৯৭৭ জন। বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগে মাদকসেবী ২২ লাখ ৯০ হাজার, যা মোটের ২৮ শতাংশ। চট্টগ্রাম বিভাগে ১৮ লাখ ৭৯ হাজার ৫০৩ জন, রংপুরে ১০ লাখ ৮০ হাজার ৫৮৮ জন, ময়মনসিংহে ৭ লাখ ৬০ হাজার ৮১২ জন, খুলনায় ৭ লাখ ২৬ হাজার ২১০ জন, রাজশাহীতে ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৫০৯ জন, সিলেটে ৪ লাখ ৮৮ হাজার ১৪১ জন এবং বরিশাল বিভাগে ৪ লাখ ৪ হাজার ১১৮ জন মাদক ব্যবহারকারী রয়েছে।
মাদক প্রকারভেদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, গাঁজার পর সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক ইয়াবা (মেথামফেটামিন), যা ব্যবহার করে প্রায় ২৩ লাখ মানুষ। অ্যালকোহল পান করে প্রায় ২০ লাখ। এ ছাড়া কোডিনযুক্ত কাশির সিরাপ সেবন করে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৬৬০ জন, হেরোইন ব্যবহার করে ৩ লাখ ২২ হাজার ৬৭৭ জন এবং ঘুমের ওষুধ সেবন করে ৩ লাখ ৫ হাজার ৬৯৪ জন। ইনহেল্যান্ট (আঠা, পেইন্ট থিনার) ব্যবহার করে ১ লাখ ৫২ হাজার ৮৪৭ জন। ইনজেকশনের মাধ্যমে শিরায় মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৩৯ হাজার, যারা এইচআইভি, হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
গবেষণায় আরো বলা হয়, অনেকেই একাধিক মাদক ব্যবহার করে। বেকারত্ব, বন্ধুমহলের প্রভাব, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক চাপ এবং অনানুষ্ঠানিক পেশায় যুক্ত থাকা মাদক ব্যবহারের প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ কারণ। প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী মাদক সহজলভ্য বলে জানিয়েছেন।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দিক থেকে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। মাত্র ১৩ শতাংশ মাদক ব্যবহারকারী কখনো চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা পেয়েছেন। অর্ধেকের বেশি ব্যবহারকারী মাদক ছাড়ার চেষ্টা করলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসা, কাউন্সেলিং এবং সামাজিক ও আর্থিক সহায়তার অভাবে বেশিরভাগই সফল হতে পারেননি। ব্যবহারকারীরা চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবা (৬৯ শতাংশ), কাউন্সেলিং (৬২ শতাংশ) এবং কর্মসংস্থান সহায়তাকে (৪১.২ শতাংশ) সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সাথে ৬৮ শতাংশ মাদক ব্যবহারকারী সামাজিক ও পারিবারিক পর্যায়ে অপবাদ ও বৈষম্যের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
গবেষণার উপসংহারে বলা হয়েছে, মাদক সমস্যা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কট। দমনমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক পুনঃএকত্রীকরণকে অন্তর্ভুক্ত করে সমন্বিত জনস্বাস্থ্যভিত্তিক কৌশল গ্রহণ করা জরুরি।
গতকাল বাংলাদেশ মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটির সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের অডিটরিয়ামে গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা: মো: শাহিনুল আলম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো: হাসান মারুফ। প্রধান গবেষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএমইউর ডিন অধ্যাপক ডা: সাইফ উল্লাহ মুন্সী। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট গবেষক, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।