‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’ অতি পরিচিত কবিতার অংশ। এর আছে অনেক কার্যকারণ। অন্যতম কারণ মামলার দীর্ঘসূত্রতা। অনেক সময় একটি মামলা ‘বিশেষ প্রয়োজনে’ নানাভাবে প্রলম্বিত করা হয়। এ প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন ভুক্তভোগীরা। তবে ব্যক্তি বিশেষের পকেট খানিকটা ভারী হয়।

বিচার প্রলম্বিত হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ বিচারক স্বল্পতা। স্বাধীনতার পর থেকে বেড়েছে জনসংখ্যা। বেড়েছে মামলার পরিমাণ। অনুপাতে বাড়েনি বিচারক বা বিচারিক আদালত। বর্তমানে দেশে গড়ে এক লাখ লোকের বিপরীতে বিচারক আছেন মাত্র একজন। সুপ্রিম কোর্টের হিসাব অনুসারে, সারা দেশে প্রায় ৪৮ লাখ মামলা বিচারাধীন। জেলা আদালতে আছে ৪০ লাখ ৭৮ হাজার মামলা। গত দেড় যুগে অধঃস্তন আদালতে মামলা বেড়েছে দেড়গুণ। মামলার সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সমানুপাতিক হারে বাড়েনি বিচারিক আদালত ও বিচারকের সংখ্যা। স্বাভাবিকভাবেই কর্মরত বিচারকদের পক্ষে বাড়তি চাপ সামাল দেয়া কঠিন হচ্ছে। সিভিল আইন, ক্রিমিনাল আইন, ধর্মীয় বিধিবিধান, আর্থসামাজিক অবস্থা, মামলার ধরন ও প্রকৃতি সব মিলিয়ে একজন বিচারককে প্রচুর সময় দিতে হয় এক একটি মামলার নিষ্পত্তির জন্য। এজন্য যে সংখ্যায় বিচারক প্রয়োজন তা থেকে অনেক পেছনে বাংলাদেশের অবস্থান। ইউরোপীয় দেশগুলোতে যেখানে ১৫ থেকে ২২ জন বিচারক রয়েছেন (ক্ষেত্র ভেদে) সেখানে বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ লোকের বিপরীতে রয়েছেন মাত্র একজন বিচারক। বিচারকদের অনেকে বিভিন্ন প্রয়োজনে থাকেন ছুটিতে। ফলে সংশ্লিষ্ট আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে।

বর্তমানে সারা দেশে বিচারক রয়েছেন দুই হাজার ২৩৭ জন। বিভিন্ন কারণে বিচারিক কাজে থাকেন এক হাজার ৮৩৭ জন। বর্তমানে বছরে যদি ৭০ হাজার মামলার নিষ্পত্তি করতে হয় তাহলে বর্তমান সংখ্যক মামলার নিষ্পত্তির জন্য লাগবে ৬৯ বছর। বছরে এক লাখ মামলার নিষ্পত্তি হলে লাগবে ৪৮ বছর। ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। ফলে অগণিত বিচারাধীন আসামিকে বছরের পর বছর কাটাতে হয় কারাগারে। অবশেষে যখন তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি পান তখন তার জীবন থেকে মূল্যবান সময়টা হারিয়ে গেছে, সংসার তছনছ হয়ে গেছে, সমাজে তিনি পরিত্যক্ত। জীবিত থেকেও তিনি মৃত মানুষে পরিণত হন। অথচ বিচারিক দ্রুততা একজন নিরপরাধ মানুষকে ফিরিয়ে দিতে পারে তার জীবন এবং স্বপ্ন।

বহু বছর আগে বিচারিক দীর্ঘসূত্রতার ওপর নির্মিত একটি ছায়াছবি দেখেছিলাম। ছায়াছবিতে আসামি মামলার ২০ বছর পর যখন মুক্তি পেলেন নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে তখন তার আর্ত চিৎকার, ‘ফিরিয়ে দাও আমার কুড়িটি বছর’ আজও কানে বাজে। বিচারিক দীর্ঘসূত্রতায় এরকম হাজারো আর্তনাদ বিচারালয়ের দেয়ালে নিয়তই প্রতিধ্বনিত হয়।

এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে বিচারক ও বিচারিক আদালতের সংখ্যা বাড়ানোর বিকল্প নেই। প্রয়োজন দক্ষ বিচারকেরও। সরকারি বিভিন্ন নিয়মের বেড়াজালে যা প্রায় অসম্ভব। একটি উদাহরণ থেকেই তা পরিষ্কার হয়ে যায়। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় আইন কমিশন ও সংসদীয় কমিটির সুপারিশে অধঃস্তন আদালতে পাঁচ হাজার বিচারক নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছিল। গত ১১ বছরে কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস ভালো বলতে পারবে। নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক না হলে বিচার বিভাগের কর্মক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হওয়া রোধ করা সম্ভব না।

জুলাই বিপ্লবের পর বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠনের প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন হওয়ায় দেশবাসী সুবিচারের এবং দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির স্বপ্ন দেখেছিল। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসেই সেটি বাতিল করে। ফলে দ্রুত বিচার পাওয়ার স্বপ্ন অধরা থেকে যায়। বর্তমানে মামলা জট নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আইনজীবী ও বিচারকরা অবিলম্বে অধঃস্তন আদালতে ১০ হাজার বিচারক নিয়োগ দেয়ার সুপারিশ করেন। একই সাথে অবিলম্বে বিচারিক আদালতের সংখ্যা, প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামো তৈরি করা দরকার। দরকার বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্র শক্তিশালী করা। হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা দায়েরকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হলে মামলা কমতে পারে।

মনে রাখা দরকার, দেশের ০.৫ শতাংশ জনগণকে দীর্ঘমেয়াদে মামলা টানতে হলে জাতীয় অর্থনীতির ওপর সৃষ্টি হবে বাড়তি চাপ। অন্য দিকে নির্দিষ্ট বিচারকের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক মামলার সীমারেখা থাকা দরকার। বর্তমানে একজন বিচারককে বিচিত্র ধরনের অসংখ্য মামলার বিচারের দায়িত্ব পালন করতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই মামলার চাপে বিচারক প্রচণ্ড মানসিক চাপে থাকেন। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচারের স্বার্থে এগুলোর বিকেন্দ্রীকরণ সময়ের দাবি। বর্তমান মামলা জটের আর একটি কারণ হলো, তুচ্ছ কারণে মামলা করার সুযোগ ও প্রবণতা। এ ব্যাপারে জনসচেতনতা সৃষ্টির দরকার আছে। একই সাথে মামলার তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে তদন্তের সময়সীমা নির্দিষ্ট করে দেয়া যেতে পারে। জনগণকে দ্রুত, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে স্বাধীন বিচার বিভাগীয় সচিবালয়, প্রধান বিচারপতিকে আরো বিস্তৃত ক্ষেত্রে ক্ষমতা প্রদানের বিকল্প নেই। জাতীয় সংসদে বিচারিক ব্যবস্থার ওপর আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হলে তা নিঃসন্দেহে সহায়ক হবে।

লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ

shah.b.islam@gmail.com