রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায়— ‘রাজনৈতিক উন্নয়ন’ (political development) কোনো একরৈখিক কিংবা কেবল অর্থনৈতিক প্রপঞ্চ নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক সামাজিক রূপান্তর। মার্কিন রাষ্ট্রচিন্তক লুসিয়ান ডব্লিউ পাই (Lucian W. Pze) তার কালজয়ী গ্রন্থ ‘Aspects of Political Development’-এ ১০টি ভিন্ন সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করে অবশেষে একে অভিহিত করেছেন একটি ‘development syndrome’ বা উন্নয়ন-লক্ষণসমষ্টি হিসেবে— যার তিনটি মৌলিক মাত্রা : সাম্য (equality), সামর্থ্য (capacity) এবং পার্থক্যকরণ (differentiation)। সাম্য বলতে তিনি বুঝিয়েছেন আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিকের সমতা, রাজনীতিতে ব্যাপক ও সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং যোগ্যতাভিত্তিক রাজনৈতিক নিয়োগের সংস্কৃতি; সামর্থ্য বলতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা, প্রশাসনিক যৌক্তিকতা ও ফলপ্রসূ নীতিনির্ধারণ; আর পার্থক্যকরণ বলতে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশেষায়ন এবং দায়িত্ব ও ভূমিকার সুসংহত বিন্যাস। স্যামুয়েল হান্টিংটন যাকে বলেছেন ‘রাজনৈতিক সংগঠন ও প্রক্রিয়ার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ’ এবং এডওয়ার্ড শিলস যাকে চিহ্নিত করেছেন ‘জাতিরাষ্ট্র নির্মাণ’ হিসেবে— রাজনৈতিক উন্নয়ন এই সমগ্রকেই ধারণ করে। পাই সতর্ক করে দিয়েছেন, এই তিন মাত্রা সহজে বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে একসাথে অগ্রসর হয় না; বরং একটির অতিরিক্ত চাপ অন্যটির ভারসাম্য বিঘ্নিত করতে পারে। তাই রাজনৈতিক উন্নয়ন কোনো সরলরৈখিক অগ্রযাত্রা নয়— এটি সঙ্কট, সমন্বয় ও ভারসাম্যের এক নিরন্তর দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া।

পাই আরো দেখিয়েছেন, উন্নয়নের এই দুর্গম পথে প্রতিটি জাতিকেই কিছু সঙ্কট পেরিয়ে আসতে হয়— পরিচয়ের সঙ্কট (identity), বৈধতার সঙ্কট (legitimacy), অংশগ্রহণের সঙ্কট (participation), অনুপ্রবেশ (penetration), সংহতি (integration) ও বণ্টনের সঙ্কট (distribution)। এই তাত্ত্বিক আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে বাংলাদেশের গত চার দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে একটি দল বারবার ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে— বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। নিরপেক্ষ বিশ্লেষণেও এ কথা অস্বীকার করা কঠিন যে, এ দেশের রাজনৈতিক উন্নয়নের প্রায় প্রতিটি সন্ধিক্ষণে দলটি প্রত্যক্ষ ও নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছে।

বিশ্লেষণের সুবিধার্থে প্রথমেই স্পষ্ট করা প্রয়োজন, বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান কেন এ দেশের রাজনৈতিক উন্নয়নের আলোচনায় অনিবার্য হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বর্ণালিতে দলটি বরাবরই দাঁড়িয়েছে দুই প্রান্তিক ধারার ঠিক মাঝখানে— একদিকে চরম বামঘেঁষা রাজনীতি, অন্যদিকে সঙ্কীর্ণ ধর্মীয় উগ্রতা; এই দুইয়ের মধ্যবর্তী একটি মধ্যপন্থী, উদার-জাতীয়তাবাদী অথচ ইসলামী ঐতিহ্যসচেতন বিপুল জনগোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষাকে বিএনপি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব দিয়েছে। হান্টিংটনের ভাষায়— কোনো সমাজের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করে তার প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মাত্রার উপর; এই মানদণ্ডে বিএনপি নিছক একটি নির্বাচনী যন্ত্র নয়; বরং একটি টেকসই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে— নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ও আদর্শিক ভিত্তির উপর ভর করে যে দল অন্তত চার দশক ধরে জীবন্ত।

পটভূমিটি রক্তাক্ত ও জটিল। ১৯৭৫-পরবর্তী রাজনৈতিক শূন্যতা, একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থার তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থানের ঘূর্ণাবর্তের ভেতর থেকে আবির্ভূত হন শহীদ জিয়াউর রহমান। তিনি সেনানিবাসের আবদ্ধ শৃঙ্খলা থেকে রাজনীতির উন্মুক্ত ময়দানে নেমে এসে এক দীর্ঘ, ধৈর্যশীল ও সুপরিকল্পিত ‘সিভিলিয়ানাইজেশন’ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সামরিক শাসনকে ক্রমে বেসামরিক, জনগণের সরকারে রূপান্তরিত করেন। ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি রুদ্ধ বহুদলীয় গণতন্ত্রের দুয়ার আবার উন্মোচন করেন; গণভোট, রাষ্ট্রপতি ও সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় রাজনীতিকে ফিরিয়ে দেন জনগণের হাতে। এ ছিল বৈধতার সঙ্কট নিরসনের এক সাহসী ও ইতিবাচক প্রয়াস।

পাইয়ের কাঠামোয় জিয়ার বৃহত্তম অবদান সম্ভবত ‘পরিচয়ের সঙ্কট’ নিরসন। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ধারণায় তিনি এ ভূখণ্ডের মানুষকে একটি স্বতন্ত্র জাতিরাষ্ট্রীয় আত্মপরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ করেন, যা আঞ্চলিক আধিপত্যের বিপরীতে আত্মমর্যাদার ভিত্তি রচনা করে। উৎপাদনের রাজনীতি, খালখনন কর্মসূচি, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার প্রয়াস এবং ১৯ দফা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তিনি জাতিকে একটি উদ্যমশীল, পরিশ্রমী ও আত্মনির্ভর জাতি হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখান। জিয়ার কাছে উন্নয়ন ছিল নিছক অবকাঠামোর সূচক নয়— উন্নয়ন নৈতিকতার, উন্নয়ন পারস্পরিক সহাবস্থানের, উন্নয়ন সম্মিলিত আত্মমর্যাদার। রাজনীতির এই নৈতিক পুনর্গঠনই ছিল তার স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দর্শন, যা আজও বিএনপির আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। একই সাথে তিনি রাজনীতিকে নাগরিকের অংশগ্রহণের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে পরিণত করেন— প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদ থেকে শহুরে মধ্যবিত্ত পর্যন্ত বিশাল জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করে তিনি পাইয়ের ভাষায় ‘অংশগ্রহণের সঙ্কট’ মোকাবেলার বাস্তব পথ দেখিয়ে যান।

জিয়ার শাহাদতের পর ইতিহাস দ্বিতীয় অগ্নিপরীক্ষা হাজির করে। নেতৃত্বের শূন্যতায় আবির্ভূত হন বেগম খালেদা জিয়া— রাজনীতিতে যার অভিষেককে অনেক বিশ্লেষক প্রথমে সংশয়ের চোখে দেখেছিলেন। কিন্তু স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘ ৯ বছরের আন্দোলনে তিনি হয়ে ওঠেন ‘আপসহীন নেত্রী’; স্বৈরশাসনের সাথে ন্যূনতম সমঝোতায়ও রাজি না হয়ে তিনি গণতন্ত্রের দাবিতে অবিচল থাকেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বহু পর্যবেক্ষককে হতবাক করে বিএনপির বিজয় প্রমাণ করে— জনগণ আপসহীন নৈতিক দৃঢ়তাকেই পুরস্কৃত করেছে। পরবর্তীকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার সাংবিধানিক স্বীকৃতি দানেও বিএনপি রাখে নির্ধারক ভূমিকা, যা ছিল নির্বাচনী সাম্য প্রতিষ্ঠায় ঐতিহাসিক মাইলফলক। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের বিপুল বিজয় আরো একবার প্রমাণ করে দেয়, গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতায় দলটির শিকড় জনমানসে কতটা গভীরে প্রোথিত।

তবে রাজনৈতিক উন্নয়নের পথ কখনোই মসৃণ থাকে না। পাই নিজেই সতর্ক করেছিলেন, সাম্য, সামর্থ্য ও পার্থক্যকরণের সূক্ষ্ম ভারসাম্য বিঘ্নিত হলে ব্যবস্থা ‘উন্নয়ন-ফাঁদে’ (development trap) আটকে যায় এবং নেমে আসে রাজনৈতিক অবক্ষয়। ২০০৭ সালের তথাকথিত ওয়ান-ইলেভেন ছিল তেমনি এক জাতীয় বিপর্যয়। অনেক বিশ্লেষকের পর্যবেক্ষণ, বহিঃশক্তির প্রচ্ছন্ন মদদ ও আধিপত্যবাদী ষড়যন্ত্রের ছায়ায় এক অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিএনপিকে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। এরপর দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর দলটিকে থাকতে হয় ক্ষমতার বাইরে; দলীয় নেতৃত্বকে সইতে হয় কারাবরণ, মামলা ও নির্বাসনের নিরন্তর যন্ত্রণা— তারেক রহমান কাটান সুদীর্ঘ প্রবাসজীবন। অনেকে ভেবেছিলেন, এ যেন বিএনপির অবসান; কিন্তু ইতিহাস প্রস্তুত করছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিণতি। পাইয়ের কাঠামোয় এ ছিল বাংলাদেশের গণতন্ত্রের এক দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক ‘বৈধতার সঙ্কট’-যেখানে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা বজায় থাকলেও জনগণের প্রকৃত সম্মতি ও অংশগ্রহণ ছিল সুপরিকল্পিতভাবে অনুপস্থিত।

চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতির চাকা আমূল ঘুরিয়ে দেয়। দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানে গঠিত হয় নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। অতঃপর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন— যাকে বহু পর্যবেক্ষক বহু বছরের মধ্যে প্রথম প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হিসেবে আখ্যায়িত করছেন, বিএনপি জনগণের বিপুল রায়ে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। একই সাথে গণভোটে অনুমোদিত হয় সংস্কারের রূপরেখা ‘জুলাই সনদ’। ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে তারেক রহমান অধিষ্ঠিত হন রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর আসনে— তিন প্রজন্মের নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় এ যেন এক ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন ও পুনর্জাগরণ। শহীদ জিয়াউর রহমান যে দল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, প্রায় দুই দশকের বন্ধুরতা পেরিয়ে তারই উত্তরসূরির হাতে সেই দলের রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসা— এ যেন ইতিহাসের এক পূর্ণবৃত্ত সম্পন্ন হওয়া।

এখন সঙ্গত প্রশ্ন— এই যাত্রা কি নিছক ক্ষমতার হাতবদল, নাকি প্রকৃত রাজনৈতিক উন্নয়ন? পাইয়ের তিন মানদণ্ডে যাচাই করলে উত্তর ক্রমেই স্পষ্ট হয়। সাম্যের প্রশ্নে, প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিয়ে জাতির উদ্দেশে দেয়া প্রথম ভাষণেই তারেক রহমান ঘোষণা করেন— দল, ধর্ম কিংবা জাতিসত্তা নির্বিশেষে রাষ্ট্রে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার সমান; শাসন পরিচালিত হবে দলীয় প্রভাব বা শক্তির দ্বারা নয়; বরং আইনের দ্বারা। জিয়ার হাতে প্রতিষ্ঠিত বহুদলীয় ও অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই এ যেন পরিণত উত্তরাধিকার— যা পাইয়ের ‘equality’ মাত্রার এক বাস্তব প্রতিফলন।

বৈধতার প্রশ্নটিও এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ। পাইয়ের অভিমত— একটি সরকারের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতির মধ্যে, বলপ্রয়োগের মধ্যে নয়। দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনে যখন নির্বাচন পরিণত হয়েছিল নিছক প্রহসনে, তখন ২০২৬-এর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোটে জনগণের যে বিপুল রায় বিএনপি অর্জন করেছে, তা কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরিসংখ্যান নয়, এটি রাষ্ট্রীয় বৈধতার এক পুনঃপ্রতিষ্ঠা। জনগণের এই সম্মতিই নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পুঁজি এবং সংস্কার-কর্মসূচি বাস্তবায়নের নৈতিক ভিত্তি।

সামর্থ্যরে প্রশ্নে, নবগঠিত সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে এক ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল প্রশাসন ও নড়বড়ে আইনশৃঙ্খলা। এর জবাবে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষিত হয়েছে দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অভিযান, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন— ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উত্তরণের লক্ষ্য যার অন্যতম উচ্চাভিলাষী প্রকাশ। জুয়া, মাদক ও চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট ভাঙা থেকে শুরু করে প্রশাসনিক যৌক্তিকতা ফিরিয়ে আনার এই প্রয়াস আসলে পাইয়ের ‘capacity’ বা রাষ্ট্রীয় সক্ষমতারই বাস্তব অনুশীলন। একই সাথে বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ঘোষিত অঙ্গীকার এই সক্ষমতাকে দিয়েছে এক ভবিষ্যৎমুখী মাত্রা।

আর পার্থক্যকরণের প্রশ্নে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত— দল ও সরকারকে অভিন্ন সত্তা হিসেবে না দেখার সাংগঠনিক অঙ্গীকার এবং জুলাই সনদের সাংবিধানিক সংস্কার, যা স্বাধীন কমিশন, ক্ষমতার ভারসাম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশেষায়নের অভিমুখে যাত্রা সূচিত করেছে। রাষ্ট্রক্ষমতা যখন এককেন্দ্রিক না থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিভাজিত অথচ সমন্বিত হয়, তখনই একটি ব্যবস্থাকে ‘পরিণত’ বলে গণ্য করা যায়। উত্তর-ঔপনিবেশিক দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে দল ও রাষ্ট্রের একীভবন— যাকে বলা হয় ‘পার্টি-স্টেট’-যে বিকৃতি ও কর্তৃত্ববাদের জন্ম দিয়েছিল, তা থেকে সচেতনভাবে বেরিয়ে আসার এ এক তাৎপর্যপূর্ণ অঙ্গীকার। এভাবে পাইয়ের চিহ্নিত পরিচয়, বৈধতা, অংশগ্রহণ, অনুপ্রবেশ ও বণ্টনের সঙ্কটগুলো একে একে অতিক্রম করে বিএনপি বাংলাদেশের রাজনৈতিক উন্নয়নের প্রধান বাহকে পরিণত হয়েছে।

উপসংহারে বলা যায়, এ অর্জন কোনো তাৎক্ষণিক বা আকস্মিক ঘটনা নয়। জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান— তিন প্রজন্মের নেতৃত্বে বিএনপি তিনটি স্বতন্ত্র পর্বে বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে : প্রতিষ্ঠার পর্ব, সংগ্রামের পর্ব ও উত্তরণের পর্ব। দলটি প্রকৃত অর্থেই সেই বিপুল জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে, যারা রাজনীতিতে মধ্যপন্থায় আস্থা রাখে, ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী এবং দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাজনীতির অভিলাষী। এই তিন ধারার সুষম সমন্বয়েই নির্মিত হয়েছে বিএনপির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয়— আর এই পরিচয়ের অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতাই চার দশক ধরে দলটির টিকে থাকার মূল রহস্য।

তবে বিজয় অর্জনের চেয়ে বিজয়ের রক্ষণাবেক্ষণ সর্বদাই কঠিনতর। বিশ্লেষকদের অভিমত, এ মুহূর্তে বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তার বিশাল জনবলকে সুশৃঙ্খল ও আদর্শনিষ্ঠ রাখা। নেতাকর্মীদের একাংশের মধ্যে যে ‘খাই খাই’ প্রবণতার অভিযোগ ইতোমধ্যে উচ্চারিত হচ্ছে, তা অতিক্রম করে আদর্শিক শিক্ষা ও কঠোর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহির মধ্য দিয়ে একটি সংযমী, নিয়ন্ত্রিত ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলে পরিণত হওয়াই এখন সময়ের অনিবার্য দাবি। মধ্যযুগীয় মনীষী ইবনে খালদুন তার ‘আসাবিয়্যাহ’ বা গোষ্ঠীসংহতির তত্ত্বে বহু আগেই সাবধান করেছিলেন— যে সংহতির বলে কোনো শক্তি উত্থিত হয়, বিলাসিতা ও স্বার্থপরতার আগ্রাসনে সেই সংহতি শিথিল হলেই সূচিত হয় তার অবক্ষয়। বিএনপির জন্য এ যেন এক কালোত্তীর্ণ সতর্কবার্তা। পাইয়ের সতর্কবাণীও এ প্রসঙ্গে গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক— সাম্য, সামর্থ্য ও পার্থক্যকরণের সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে যেকোনো ব্যবস্থাই অবক্ষয়ের অতল গহ্বরে গড়িয়ে পড়ে। সুশাসনের নিরলস সাধনায় বিএনপি যদি সেই ভারসাম্য অক্ষুণ্ন রাখতে পারে, তবেই চার দশকের এই দীর্ঘ পরিক্রমা রূপ নেবে বাংলাদেশের টেকসই রাজনৈতিক উন্নয়নে। ইতিহাস তখন নিঃসংশয়ে সাক্ষ্য দেবে— জনগণের আস্থাই যেকোনো রাজনৈতিক দলের শ্রেষ্ঠ ও অক্ষয় পুঁজি।

লেখক : অধ্যাপক (অব:), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Mal55ju@yahoo.com