মৌলিক সংস্কার ও রাজনৈতিক ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক উদ্যোগে ভাটা!
Printed Edition
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম ও দ্বিতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়েছেন, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই অগ্রগতির জন্য জাতীয় সঙ্কটগুলোর সমাধান কেবল পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব। তিনি উল্লেখ করেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গঠিত নতুন সরকারের মেয়াদে সংসদকে সব যুক্তিতর্ক ও সমস্যা সমাধানের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের শুরু থেকেই দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক অভূতপূর্ব ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গিয়েছিল। দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক মেরুকরণ ও আস্থার সঙ্কট কাটিয়ে সংসদকে কার্যকর করার ব্যাপারে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী জোরালো অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। সংসদের সমাপনী ভাষণগুলোতে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই সংসদ সরকারি ও বিরোধী দল- উভয়ের সমন্বয়ে গঠিত। যেকোনো এক পক্ষ ব্যর্থ হলে পুরো দেশ ব্যর্থ হবে। তাই সব জাতীয় সমস্যার সমাধান বিরোধী দলের সাথে সংলাপের মাধ্যমেই করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে সংলাপ ও সমঝোতার সম্ভাবনা জাগিয়ে তোলে। সংলাপের মূল বিষয় ছিল সংবিধান সংশোধন ও ‘জুলাই সনদ’-এর বাস্তবায়ন। সংসদের প্রথম অধিবেশনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ও জুলাই সনদকে পথনির্দেশক ধরে দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধী দল সংসদের ভেতরে যৌথভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়। কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি রোধে সাংবিধানিক ভারসাম্য আনা এবং বিচার বিভাগ ও মানবাধিকার কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের জন্য সংলাপের টেবিল প্রস্তুত করা হয়েছিল।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান জিডিপি-কর অনুপাত (যা আঞ্চলিকভাবে বেশ নিচে) বৃদ্ধি করা, শুল্ক ও রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার এবং ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা আনার মতো জটিল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর জন্য জাতীয় রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কট নিরসন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বিরোধী দলের গঠনমূলক প্রস্তাব গ্রহণে সরকার সংলাপের সদিচ্ছা দেখিয়েছিল। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজগঠন, মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়ন, তরুণ ও নারীসমাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার সুরক্ষায় সংসদকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়েছিল। তবে সময় গড়ানোর সাথে সাথে সেই ইতিবাচক রাজনৈতিক উদ্যোগে ভাটা পড়ছে বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ মহল।
প্রধানমন্ত্রীর সংলাপের ঘোষণা ও এর সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র কিন্তু আশাব্যঞ্জক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী এবং দলের নীতিনির্ধারকদের মতে, অতীতের যেকোনো সরকারের চেয়ে বর্তমান সরকার অনেক বেশি উদার ও আলোচনায় বিশ্বাসী। দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, ফ্যাসিবাদী বা মাফিয়া ব্যবস্থার চিরতরে অবসান ঘটাতে সংবিধান সংশোধন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারে তারা বিরোধী দলের সাথে শর্তহীন আলোচনায় প্রস্তুত। তারা মনে করেন, সংসদের ভেতরে ও বাইরে সংলাপের মাধ্যমেই দেশকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
অন্য দিকে বিরোধীদলীয় নেতারা প্রধানমন্ত্রীর সংলাপের আহ্বানকে স্বাগত জানালেও কিছু বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান সংসদকে আরো কার্যকর করার তাগিদ দিয়ে বলেন, সংলাপকে কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে প্রকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিরোধী দলের মতামতকে মূল্যায়ন করতে হবে। তারা সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর যথাযথ কার্যকারিতা এবং জুলাই সনদের পুঙ্খানুপুঙ্খ বাস্তবায়নে সরকারের স্পষ্ট রোডম্যাপ দাবি করছেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সুশাসন বিশেষজ্ঞরা সংসদের এই নতুন আবহ ও সংলাপের সম্ভাবনাকে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক’ (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, এই সঙ্কটকালীন সময়ে জাতীয় ঐক্যই দেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। তিনি সতর্ক করে বলেন, যুব ও তরুণ সমাজের নেতৃত্বে নতুন ভবিষ্যতের যে আশা তৈরি হয়েছে, তা রাজনৈতিক বিভাজন ও অপ্রয়োজনীয় মেরুকরণের কারণে নস্যাৎ হতে দেয়া যাবে না। তার মতে, সঙ্কটের স্থায়ী সমাধানে সংলাপের কোনো বিকল্প নেই।
একই সাথে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, অতীতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনেক সময় সরকারের জন্য স্বৈরতান্ত্রিক পথে হাঁটার কারণ হয়েছিল। বর্তমান সরকারকে সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি এড়াতে বিরোধী দলের সাথে অর্থপূর্ণ সংলাপের ধারা বজায় রাখতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ব্যারিস্টার সারা হোসেন মনে করেন, নতুন সরকারের এই বহুত্ববাদী ও বৈচিত্র্যময় অবয়ব ইতিবাচক। তবে সমাজের প্রান্তিক গোষ্ঠী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং তরুণদের কণ্ঠস্বর যেন সংসদে প্রতিফলিত হয়, সে জন্য সংলাপের পরিধি সংসদের বাইরে সুশীলসমাজের সাথেও বিস্তৃত করা প্রয়োজন।
সংলাপের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হলেও তা পুরোপুরি সফল করার পথে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ ও প্রতিপক্ষ কোন্দল এবং সহিংসতা কেন্দ্রীয় সংলাপের ইতিবাচক আবহকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এ ছাড়া দীর্ঘদিনের দলীয়করণের ফলে ভেঙে পড়া প্রশাসনিক কাঠামো রাতারাতি সংস্কার করা কঠিন, যা সংলাপের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে ধীরগতি সৃষ্টি করতে পারে। একই সাথে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং অর্থনৈতিক মন্দা দেশের অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরিতে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের আন্দোলন-সংগ্রামের অধিকার রয়েছে। তবে আন্দোলনে যাওয়ার আগে বিদ্যমান সব গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উপায় কাজে লাগিয়ে সমস্যার সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা উচিত। বর্তমান সরকারের স্বল্প সময়ের মধ্যেই আবার আন্দোলনের পরিস্থিতি তৈরি হলে অন্য কোনো শক্তি সেই সুযোগ নেয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলবে। তিনি আরো বলেন, আন্দোলন প্রায়ই সঙ্ঘাত, সহিংসতা ও জনভোগান্তির কারণ হয়; তাই সংলাপ ও আলোচনার মধ্য দিয়েই সঙ্কট সমাধানের চেষ্টা করা দরকার। আন্দোলন হলেও সেটি অবশ্যই গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ পন্থায় পরিচালিত হওয়া উচিত। তবে বিরোধী দলের সাথে আলোচনার পথটি সরকারকেই সুগম করে দিতে হবে।
জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই জাতীয় সঙ্কট মোকাবেলাসহ যেকোনো সমস্যা সমাধানে সংলাপের কথা বলেছেন। বর্তমান সরকার মনে করে, জাতিকে বিভক্ত করে দেশকে কোনোভাবেই সামনের দিকে এগিয়ে নেয়া যায় না; দেশের স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। জুলাই আন্দোলনের আকাক্সক্ষাই ছিল সবাই মিলে দেশ গড়া- সরকার বিরোধী দলসহ সবার প্রতি সেই আহ্বানই জানাচ্ছে।
এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী নয়া দিগন্তকে বলেন, বিএনপি সরকার সংলাপ ও আলোচনায় বিশ্বাসী। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী সংসদে সেই সংলাপের কথাই পুনর্ব্যক্ত করেছেন। আন্দোলনের নামে অরাজকতা না করে বিরোধীদের উচিত হবে সরকারকে সহযোগিতা করা।