হরমুজে অস্থিরতার জেরে তেল-গ্যাস মজুদের পরিকল্পনায় এশিয়া
Printed Edition
আলজাজিরা
টানা ছয় মাস ধরে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আগ্রাসনের জেরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। এ সময় জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে সীমিত হয়ে আসে। এতে এশিয়া দেশগুলোর ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়।
তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় এশীয় দেশগুলো দ্রুত জ্বালানি সাশ্রয়ের নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এমন পরিস্থিতিতে দামের ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ, গাড়ির চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট দিন ভাগ করে দেয়া এবং সরকারি কর্মীদের জন্য বাড়ি থেকে কাজ করার (ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম) পরিকল্পনা হাতে নেয়। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই জ্বালানি সরবরাহ বিঘিœত হওয়ার ঘটনার একটি স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজতে শুরু করেছে এশিয়া। যার মূল লক্ষ্য প্রয়োজনীয় তেল ও গ্যাস নিজেদের অঞ্চলের কাছাকাছি কোথাও মজুদ রাখা। অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো পারুল বকশি বলেন, এই সঙ্কট দুই ধরনের ভিন্ন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করছে। এক. এমন অবকাঠামো যা ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি এড়িয়ে চলে এবং দুই. এমন অবকাঠামো যা আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি দূর করে।
এই সঙ্কট থেকে উদ্ভূত সবচেয়ে উচ্চাকাক্সক্ষী প্রস্তাবগুলোর একটি এসেছে জাপানের কাছ থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়া সত্ত্বেও দেশটি অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় এই সঙ্কটটি ভালোভাবেই সামাল দিয়েছে। কারণ তাদের রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম কৌশলগত তেল মজুদ। টোকিও চায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোও তাদের এই পথ অনুসরণ করুক। গত এপ্রিলে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ১০ বিলিয়ন ডলারের ‘পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের ঘোষণা দেন। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য সংগ্রহে সহায়তা করা এবং দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত মজুদ গড়ে তুলতে সাহায্য করা।
সরকারি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরান কেন্দ্রিক সংঘাত শুরুর সময় ভিয়েতনামের জাতীয় মজুদ ভাণ্ডারে মাত্র ৫ থেকে ৭ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো তেল ছিল। তবে বাণিজ্যিক মজুদ ও অন্যান্য উৎসের সরবরাহ বিবেচনায় নিলে এই সময়সীমা আরো ৬৫ দিন পর্যন্ত বাড়তে পারত। মার্চের শুরুর দিকে থাইল্যান্ডের সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে প্রায় ৬১ দিনের মজুদ ছিল। যেখানে তাদের জন্য ন্যূনতম ২৫ দিনের মজুদ রাখা বাধ্যতামূলক এবং ফিলিপাইনের বেসরকারি বাণিজ্যিক মজুদে ৫০ থেকে ৬০ দিনের সরবরাহ ছিল বলে ধারণা করা হয়। এই সবকটি পরিসংখ্যানই ছিল ‘ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি’ (আইইএ)-এর নির্ধারিত ৯০ দিনের ন্যূনতম মানদণ্ডের চেয়ে কম।
ব্যাংকক ও ম্যানিলায় এই যুদ্ধের ফলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি পূর্ণাঙ্গ কৌশলগত তেল মজুদ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নতুন করে গতি পেয়েছে। গত মাসে ফিলিপাইনের একটি সংসদীয় কমিটি ৬০ দিনের সরকারি মজুদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটি বিল অনুমোদন করেছে। ব্যাংককভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ম্যাভেরিক কনসাল্টিং গ্রুপ’-এর বেন কিয়াতকোয়ানকুল জানান, থাই কর্মকর্তারা উপদ্বীপজুড়ে অপরিশোধিত তেলের নতুন পাইপলাইন ও বিশাল সংরক্ষণাগার (ট্যাংক ফার্ম) তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। এর মাধ্যমে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অপরিশোধিত তেল সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে চাইছে থাইল্যান্ড।