গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদে ইসরাইলি তৎপরতা অব্যাহত

Printed Edition
onno-1
ইসরাইল কাৎস

আলজাজিরা

গাজা উপত্যকা থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ইসরাইল এখনো তৎপর রয়েছে বলে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎস। তিনি জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজার ফিলিস্তিনিদের অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার প্রস্তাবটি স্থায়ীভাবে বাতিল করেননি, বরং সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছেন।

ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াইনেট’ আয়োজিত একটি সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে কাৎস জোর দিয়ে বলেন, গাজাকে ফিলিস্তিনি জনসংখ্যাশূন্য করা- যাকে ইসরাইলি প্রশাসন স্বেচ্ছায় ‘স্থানান্তর’ হিসেবে দাবি করে-সেটিই উক্ত অঞ্চলের একমাত্র কার্যকর স্থায়ী সমাধান। তিনি আরো উল্লেখ করেন, গাজা সঙ্কটের বাইরে কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প নেই। দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মীরা অভিযোগ করে আসছেন যে, গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্যই হলো ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ভূখণ্ড থেকে পুরোপুরি বিতাড়িত করা। এর আগে ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে এ উচ্ছেদ প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়ে এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেয়ার কথা বলেছিলেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ও ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক মিত্রদের তীব্র বিরোধিতার মুখে ট্রাম্প একটি ১২ দফার যুদ্ধবিরতি চুক্তির মধ্যস্থতা করেন, যেখানে ফি লিস্তিনিদের গাজায় বসবাসের অধিকার এবং অবাধ যাতায়াতের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছিল।

তবে ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই গাজায় ত্রাণ সরবরাহে বাধা দেয়া, নিয়মিত হামলা পরিচালনা এবং পুনর্গঠন কাজ আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে ইসরাইলের বিরুদ্ধে। কাৎস স্পষ্ট জানান, সমুদ্র বা আকাশপথ ব্যবহার করে গাজার পুরো নিয়ন্ত্রণ নিতে তারা প্রস্তুত। তবে সীমান্তবর্তী দেশ মিসর ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের গ্রহণ করতে নারাজ হওয়ায় অন্যান্য আগ্রহী দেশগুলোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন। কাৎস আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ট্রাম্প এটি সাময়িক স্থগিত রাখলেও চূড়ান্তভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে সাথে নিয়েই এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। বিগত তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দেয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মতো সংস্থায় ইসরাইলের বিরুদ্ধে তদন্তকারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে সার্বিক সুরক্ষা দিয়ে আসছে। জুলাই মাসে ট্রাম্প হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ ও সেনা প্রত্যাহারের মাধ্যমে যুদ্ধ সমাপ্তির একটি প্রস্তাব দিলেও গাজা পুরোপুরি সমরাস্ত্র মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত তা প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরাইল। ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এ চরমপন্থী বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মার্কিন ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, গাজাকে ফিলিস্তিনিমুক্ত করার ইসরাইলি পরিকল্পনা এখন তাদের মন্ত্রীর নিজস্ব স্বীকারোক্তিতেই প্রমাণিত। এ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্তরাষ্ট্রের মদদ দেয়া অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানান তিনি।

আল-আকসায় আগস্টে ৫ সহস্রাধিক ইসরাইলির অনুপ্রবেশ

এদিকে আনাদোলু জানিয়েছেন, পবিত্র আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে গত আগস্ট মাসজুড়ে মোট পাঁচ হাজার ২০৯ জন ইসরাইলি জোরপূর্বক প্রবেশ করেছে। গত মঙ্গলবার জেরুসালেম গভর্নরেট থেকে প্রকাশিত এক মাসিক রিপোর্ট এ তথ্য জানিয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, পুরো আগস্ট মাসজুড়েই ইসরাইলি পুলিশের নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে আল-আকসা প্রাঙ্গণ ও এর প্রবেশদ্বারগুলোতে এই বহিরাগতদের আনাগোনা এবং ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পরিচালনা অব্যাহত ছিল। এর মধ্যে গত ১৩ আগস্ট এক দিনেই সর্বোচ্চ ৭৫১ জন সেখানে প্রবেশ করে। একই সময়ে ফিলিস্তিনিদের আল-আকসায় যাতায়াত রুখতে পাঁচটি পৃথক নিষেধাজ্ঞা জারি করে ইসরাইলি প্রশাসন।

সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে এ সময়কালে ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় দু’জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান এবং আহত হন আরো ৮৩ জন। পাশাপাশি পাঁচ শিশুসহ ১১৪ জন ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি অধিবাসী ও তাদের বাসস্থানে ৪৪টি হামলার ঘটনা নথিভুক্তের পাশাপাশি জেরুসালেমজুড়ে ৪০টি ঘরবাড়ি ও সম্পত্তি ধ্বংস এবং ৮৬টি ভাঙচুর বা কাজ বন্ধের নোটিশ জারি করা হয়েছে। ইসরাইলি গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, আগামী ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য নেসেট নির্বাচনকে সামনে রেখে কট্টর ডানপন্থী দলগুলোকে সন্তুষ্ট রাখতে এবং নিজের অবস্থান শক্ত করতে উত্তেজনা উসকে দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, আল-আকসাসহ অধিকৃত জেরুসালেমের ইসলামিক ও আরব ঐতিহ্য মুছে ফেলে এলাকাটিকে ইহুদিকরণের লক্ষ্যে এসব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। ফিলিস্তিনিরা তাদের ভবিষ্যতের স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে পূর্ব জেরুসালেমকে দাবি করে আসছে। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে জেরুসালেম ও পশ্চিম তীরের বিভিন্ন জনপদ ও শরণার্থী শিবিরে সেনাতল্লাশি, গণগ্রেফতার এবং রক্তক্ষয়ী হামলার পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে ২ ফিলিস্তিনি কিশোর নিহত

অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লা সংলগ্ন আল-মুঘাইয়ের গ্রামে ইসরাইলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের যৌথ হামলায় দুই ফিলিস্তিনি কিশোর প্রাণ হারিয়েছে। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে, নিহতদের বয়স ছিল ১৬ ও ১৯ বছর। অঞ্চলটিতে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সশস্ত্র হামলা বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় গতকাল বুধবার এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়, পুলিশ কর্মকর্তা এবং এক ইসরাইলি নাগরিককে নিরাপত্তা দিতে তাদের সৈন্যরা আল-মুঘাইয়ের গ্রামে ঢুকেছিল। সে সময় পাথর নিক্ষেপকারীদের ওপর পাল্টা গুলি চালানো হয় বলে জানায় তারা। পুরো বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে বলেও তাদের তরফে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত আগস্টে কুসরা গ্রামে বসতি স্থাপনকারীদের তাণ্ডবের ঘটনা বিশ্বজুড়ে সমালোচিত হলেও পশ্চিম তীরে এই আগ্রাসন থামেনি। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ইসরাইলি প্রশাসন ১৯৬৭ সালে দখল করা পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের কাজ দ্রুতগতিতে চালিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে সেখানে একাধিক নতুন বসতি ও সামরিক চৌকি তৈরি করা হয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার মতে, ফিলিস্তিনি জনপদের কাছে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের এভাবে বসিয়ে দেয়া মূলত জমি দখলের এক সুপরিকল্পিত কৌশল, যা স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পথকে দিন দিন আরো রুদ্ধ করে দিচ্ছে।