পদোন্নতি জটে থমকে আছে তিন হাজার এসআইয়ের ভাগ্য

হতাশায় ক্ষুণœ হচ্ছে মনোবল

Printed Edition

আমিনুল ইসলাম

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে মাঠপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টররা (এসআই)। দিন-রাতের পার্থক্য ভুলে, প্রতিকূল পরিবেশে জনগণের জানমাল ও নিরাপত্তা রক্ষায় তাদের প্রচেষ্টা সবার আগে চোখে পড়ে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি বঞ্চিত হয়ে চরম হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন প্রায় তিন হাজার এসআই।

পদোন্নতির জন্য সব যোগ্যতা অর্জন করেও বছরের পর বছর একই পদে কর্মরত রয়েছেন তারা। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত পেশাগত অগ্রগতি ব্যাহত হওয়ায় কর্মস্পৃহা ও মনোবলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। তবে পুলিশ সদর দফতর বলছে, বিগত দিনের সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে কাজ করা হচ্ছে।

জানা গেছে, ২০২০ সাল থেকে প্রায় তিন হাজার সাবইন্সপেক্টর পরীক্ষায় পাস করে পিএলভুক্ত হয়েছিলেন। অথচ বছরের পর বছর কেটে গেলেও পদোন্নতি পাচ্ছেন না। একবার ক্লিয়ারেন্স নিয়ে ৩-৪ মাস ধরে ফাইল আটকে যাচ্ছে। দীর্ঘকাল ধরে পদোন্নতি না পাওয়ায় বেতনভাতা, সামাজিক পদমর্যাদা এবং পেশাগত মর্যাদায় পিছিয়ে পড়ছেন, যা পারিবারিক জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ৩৩তম ব্যাচের (২০১২ সালে প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী) একজন এসআই বলেন, পরিবার ও আত্মীয়স্বজনরা পদোন্নতির কথা জিজ্ঞেস করলে বিব্রত হতে হয়। প্রায় ১৪ বছর ধরে একই পদে কাজ করার ফলে কাজেও স্থবিরতা চলে আসে। পদোন্নতির তালিকাভুক্ত হওয়ার পরও পদোন্নতি না পাওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করেন তিনি। ৩৪ ও ৩৫তম ব্যাচের একাধিক উপপরিদর্শক বলেন, ১০ থেকে ১২ বছর কাজ করে আমরা যে পোস্টে আছি, সদ্য পাস করা একজন সাবইন্সপেক্টরও আমাদের সাথে একই পোস্টে কাজ করেন। বিষয়টি সিনিয়রদের জন্য বিব্রতকর। পরীক্ষায় পাস করে সব ধাপ সম্পন্ন করার পরও পদোন্নতির নিশ্চয়তা থাকে না। মেধা ও সিনিয়রিটির সাথে সাথে রাজনৈতিক বিষয়গুলোও পদোন্নতিতে বিবেচনা করা হয়।

কয়েকজন ভুক্তভোগী এসআই বলেন, পরিবারের কাছে ছোট হয়ে যাই। আত্মীয়-পরিবারের সদস্যরা সবসময় পদোন্নতির কথা জিজ্ঞেস করে। কিন্তু কোনো উত্তর দিতে পারি না। এক পদে দীর্ঘ সময় কাজ করতে গিয়ে একঘেয়েমি ও কাজে স্থবিরতা চলে আসে, যা অনেক সময় পেশাগত কাজে স্বাভাবিকভাবেই প্রভাব ফেলে। আমরা কার কাছে এসব কথা বলব- সেটিও জানি না। আমাদের নিয়ে যেন কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। তারা বলেন, কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তাকে আর পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করা হয় না। অথচ সেই অভিযোগটি সঠিক কি না তাও যাচাই করা হয় না।

জানা গেছে, পুলিশের মধ্যে যারা কনস্টেবল থেকে পদোন্নতি পেয়ে এসআই হন, তাদের সরাসরি এসআই পদে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা একটু ভিন্ন চোখে দেখেন। আবার এসআই থেকে যারা এএসপি বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা হন, তারা প্রাপ্য মর্যাদা পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

একজন এসআই প্রশিক্ষণ সমাপ্তি শেষে কাজে যোগদানের পাঁচ বছর পর ইন্সপেক্টরশিপ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেন। বুক (বই দেখে), নন-বুক (বই না দেখে) এবং ক্রিমোনলজি এই তিনটি বিষয়ে ২০০ নম্বর করে ৬০০ নম্বর পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। পুলিশি আইন ও বিধি, ফৌজদারি আইন ও কার্যবিধি, তদন্তসংক্রান্ত বিষয়, পুলিশ রেগুলেশন ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান এবং ব্যবহারিক পুলিশিং জ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে এসব লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তিনটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর বিআইসি এবং ডিটিএস প্রশিক্ষণ কমপ্লিট করতে হয়। এরপর বিভাগীয় পরীক্ষা ও অন্যান্য যোগ্যতা পূরণ করার পর যোগ্য এসআইদের রেঞ্জভিত্তিক তালিকায় (আরএল) অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রেঞ্জে তালিকাভুক্তির জন্য সন্তোষজনক বার্ষিক গোপন প্রতিবেদন (এসিআর) যাচাই করা হয়। এরপর প্রমোশন লিস্ট (পিএল) বা পদোন্নতি তালিকাভুক্ত হন এবং তাদের সার্ভিস বুক ও প্রশাসনিক রেকর্ডও যাচাই-বাছাই করে যোগ্যতার ভিত্তিতে মেধা তালিকা তৈরি করা হয়। পিএলে অন্তর্ভুক্তির জন্যও এসিআর যাচাই করা হয়। জানা যায়, এসআই পদে ৪৩তম ক্যাডেটদের বর্তমানে প্রশিক্ষণ চলছে রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে।

পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, গত প্রায় এক বছরে চার ধাপে বাংলাদেশ পুলিশের ৬৬৫ জন সাবইন্সপেক্টরকে ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। সবশেষ গত ৯ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এসআই থেকে ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি দেয়া হয় ১৫৩ কর্মকর্তাকে। ২০২৫ সালের ১৮ মার্চ পদোন্নতি দেয়া হয় ১২৯ কর্মকর্তাকে। ১৭ জুলাই পদোন্নতি দেয়া হয় ১১০ জনকে এবং ৩ নভেম্বর ২৭৩ জন এসআইকে ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি দেয়া হয়।

পুলিশ সদর দফতরের উচ্চপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, এসআইদের দাবি এবং তাদের হতাশা যুক্তিগত। তবে বিগত সরকারের সময়ে সৃষ্টি হওয়া জটিলতা নিরসনে কাজ করা হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে সব বিষয় বিবেচনায় রেখে একটি বিষয় সমাধান করা সম্ভব হবে।