দোহায় পরোক্ষ বৈঠক : আলোচনা চালিয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
কাতারের রাজধানী দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদলের মধ্যে অনুষ্ঠিত পরোক্ষ বৈঠক শেষ হয়েছে। বৈঠকে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং এতে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। খবর আল জাজিরার।
বৈঠকের স্থান সম্পর্কে এখনো কিছু জানানো হয়নি। তবে এক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনার পরবর্তী পর্ব ১৮ জুলাই শুরু হবে। এ দিকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের প্রতিনিধি দলের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা ‘ইতিবাচক অগ্রগতি’র মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে কাতার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে দেয়া পোস্টে এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি পোস্টে উল্লেখ করেন, মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতার ও পাকিস্তান গতকাল দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচকদের সাথে পৃথক বৈঠক সম্পন্ন করেছে। লেক লুসার্ন সম্মেলনের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’-এর বিষয়গুলোতে ইতিবাচক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। তিনি আরো জানান, উভয় পক্ষই আগামী সময়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে এবং ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের পরপরই যত দ্রুত সম্ভব পরবর্তী বৈঠকের সময় নির্ধারণ করা হবে।
এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় জানায়, উভয় পক্ষ আলোচনা অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছে। ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতার জানাজা ও দাফনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব পরবর্তী বৈঠকের সময় নির্ধারণ করা হবে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, চলমান সংলাপের মাধ্যমে আলোচনায় থাকা বিভিন্ন বিষয়ে সমাধানের পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। তবে বৈঠকে ঠিক কোন কোন বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। তবে তারা এমন বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছে যেগুলো দুই সপ্তাহ আগে স্বাক্ষরিত একটি অন্তর্বর্তী চুক্তির ঘোষণার মাধ্যমে সমাধান হয়েছে বলে দাবি করেছিল তারা।
রয়টার্স জানায়, এই আলোচনার বিষয়ে অবগত সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই দুই দেশের আলোচকরা দোহায় দুই দিন ধরে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ও ইরানের জব্দ থাকা তহবিল অবমুক্তি নিয়ে আলোচনা করে কাটিয়েছে। দু’টিই অন্তর্বর্তী চুক্তির দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পারস্য উপসাগরে প্রবেশ বা বের হওয়া জাহাজ থেকে টোল আদায় এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাওয়ার বিষয়ে অনড় অবস্থান নিয়েছে ইরান। প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও এই নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ইরানের দু’জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ কথা জানিয়েছেন।
এ দিকে দ্বিতীয় দফার শান্তিবৈঠক কবে হবে, তা নিয়ে এখনোও চূড়ান্ত কোনো ঘোষণা না আসার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে ইরান। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাকের কলিবফ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সমঝোতা চুক্তি বাস্তবায়ন না করে তাহলে তেহরান যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।
তিনি এও জানান, ওয়াশিংটন যদি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় তবে চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা এগোবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তিন মাসের সংঘাতের অবসান ঘটাতে চলতি মাসে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা চুক্তি সই হয়। এরপর তেল ইরানের তেল রফতানির ওপর চাপানো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বাকের বলেন, ‘হরমুজ প্রণালীতে অবরোধ উঠে যাওয়ার পর থেকে ইরান চার কোটি ব্যারেলেরও বেশি অপরিশোধিত তেল রফতানি করেছে।’
তিনি জানান, হরমুজের ওপর ইরান এবং ওমানের কর্তৃত্ব রয়েছে। ওই জলপথের ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকবে। সমঝোতা স্মারকের কথা উল্লেখ করে বাকের বলেন, ‘বিনামূল্যে হরমুজ দিয়ে ৬০ দিন যাতায়াত করতে পারবে পণ্যবাহী জাহাজগুলো। ইরান কোনো অবস্থাতেই হরমুজের ওপর নিজেদের অধিকার ছেড়ে দেবে না। এটা আমদের আঞ্চলিক জলসীমা।’
সমঝোতা চুক্তির অধীনে, ইরান আগামী ৬০ দিন কোনো টোল ছাড়াই জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে। তবে তেহরানের বিশ্বাস, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কোন কোন জাহাজ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে যাবে এবং কোন রুট ব্যবহার করবে, তা নির্ধারণের চূড়ান্ত ক্ষমতা তাদের হাতেই রয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এই প্রণালীর ওপর স্থায়ী ও আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে চায় তেহরান। দেশটির সূত্রগুলো জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের সাথে চলমান শান্তি আলোচনায় এই বিষয়ে কোনো রফা না হওয়া পর্যন্ত ইরানি আলোচকেরা অন্য কোনো বিরোধপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করবেন না। যদি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির মেয়াদ না বাড়ে, তবে আগামী আগস্টের মাঝামাঝি সময় থেকে জাহাজগুলোর কাছ থেকে টোল আদায় শুরু করবে ইরান। তবে কী পরিমাণ টোল নেয়া হবে বা কীভাবে আদায় করা হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। সংঘাত শুরুর সময় ইরান এই প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছিল এবং ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, পারস্য উপসাগর ছাড়ার সময় কিছু জাহাজ থেকে নৌ-চলাচল কিংবা অন্যান্য টোল আদায় করা হয়েছিল।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানের নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায় পর দুই পক্ষের মধ্যে পরবর্তী আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। ৯ জুলাই আলি খামেনির দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। মন্ত্রণালয়টির মুখপাত্র এক্স এ করা এক পোস্টে বলেছেন, দোহা আলোচনায় জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে ‘ইতিবাচক অগ্রগতি’ হয়েছে আর এটি সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত একটি শীর্ষ সম্মেলনের ‘ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে এগিয়েছে’।
ওয়াশিংটন ডিসিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সম্ভাব্য সীমাবদ্ধতার বিষয়ে উভয়পক্ষ অগ্রগতি করছে। ফেব্রুয়ারিতে ইসরাইলকে সাথে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার মূল কারণ এই পারমাণবিক কর্মসূচি।
সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ভালোভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের বৈঠক খুব ভালো হয়েছে আর আমরা দেখব।’ কিন্তু সূত্রগুলো রয়টার্সকে জানিয়েছে, এই আলোচনায় পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি ওঠেনি, সেটি ধরনে কারিগরি আলোচনার বিষয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, এই বিষয়টি নিয়ে পরে আলোচনা হবে। সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, ‘অবশ্যই, আমরা পারমাণবিক বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমরা সেটি নিয়ে কথা বলতে যাচ্ছি।’ কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আমেরিকান ও ইরানি আলোচকরা কাতারি ও পাকিস্তানি মধ্যস্থতকারীদের সাথে পৃথক বৈঠক করেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেকটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এই পর্বের আলোচনায় যোগ দেননি। হোয়াইট হাউজ যাকে ‘উচ্চ পর্যায়ের’ আলোচনা বলে অভিহিত করেছিল তাতে যোগ দিতে কুশনার ও উইটকফ দোহায় উপস্থিত ছিলেন।