নির্বাচনোত্তর প্রথম সপ্তাহেই পুঁজিবাজারে অস্থিরতা

১ কোটি শেয়ার কিনবেন অলিম্পিকের চেয়ারম্যান

Printed Edition
artho-1
নির্বাচনোত্তর প্রথম সপ্তাহেই পুঁজিবাজারে অস্থিরতা

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের বিপুল বিজয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীরা নির্বাচন-পরবর্তী প্রথম কার্যদিবসে ব্যাপক আস্থার প্রতিফলন ঘটালেও খুব দ্রুতই তা শেষ হয়ে যায়। গত সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের দুই পুঁজিবাজার সূচকের বড় ধরনের উত্থান ঘটলেও সপ্তাহের বাকি দিনগুলোর বাজার আচরণ প্রচণ্ডভাবে হতাশ করেছে বিনিয়োগকারীদের।

গত সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিাবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচকটির উন্নতি ঘটে ২০০ পয়েন্ট। কিন্তু সপ্তাহের পরবর্তী চারটি কর্মদিবসের সব ক’টিতে বাজার আচরণ ছিল নেতিবাচক। তবে সপ্তাহের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনের বাজার আচরণকে মুনাফা তুলে নেয়ার প্রক্রিয়ায় সংশোধন হিসেবে দেখলেও পরবর্তী দু’দিন বড় ধরনের পতন ঘটে সূচকের। আর শেষ দু’দিনের পতনই নতুন করে অস্থিরতার বার্তা দিচ্ছে পুঁজিবাজারের।

ঢাকা শেয়ারবাজার সূচকের উন্নতি ধরে রেখেই গত সপ্তাহের লেনদেন শেষ করে। তবে সপ্তাহটির মোট পাঁচটি কর্মদিবসের একটিতেই সূচকের উন্নতি ঘটে। ওই দিন ডিএসইর প্রধান সূচকটি ২০০ দশমিক ৭২ পয়েন্ট উন্নতি ঘটে। আগের সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে সূচকটির অবস্থার পাঁচ হাজার ৩৯৯ দশমিক ৯৩ পয়েন্ট থেকে যাত্রা শুরু করা সূচকটি ওই দিন লেনদেন শেষে পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ৬০০ দশমিক ৬৫ পয়েন্টে। কিন্তু পরবর্তী চারটি কর্মদিবসে বৃদ্ধি পাওয়া সূচকের ১৩৪ দশমিক ৭২ পয়েন্ট হারায়। সে হিসাবে সপ্তাহটিতে ৬৫ দশমিক ৯৯ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয় ডিএসই। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচকের মধ্যে ডিএসই-৩০ ৩৮ দশমিক ৯৩ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখলেও ডিএসই শরিয়াহর ১ দশমিক ৮৭ পয়েন্ট অবনতি ঘটে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা গত সপ্তাহের বাজার আচরণকে শুরুতে বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিফলন হিসেবে দেখলেও শেষদিকে সূচকের টানা পতনের কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তবে স্টেকহোল্ডারদের একটি অংশ মনে করেন নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বাজারের একটি অংশ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুঁজিাবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও ডিএসই বোর্ডে যে পরিবর্তন এনেছিল তার পরিবর্তন চাচ্ছে। তবে এ নিয়ে কেউ সুস্পষ্টভাবে কিছু না বললেও বিষয়টি এ মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচিত। আর এতেই বাজারে বিরূপ প্রভাব পড়ছে বলে মনে করেন বিনিয়োগকারীরা।

প্রসঙ্গত, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুনর্গঠিত বিএসইসি কিছু কিছু মৌলিক বিষয়ে সংস্কার করলেও দেড় বছরেরও বেশি সময়ে তারা কোনো নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত করতে পারেনি। তা ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর প্রকৃত অর্থে গত দেড় বছরেরও বেশি একপ্রকার স্থবিরতার মধ্য দিয়েই পার করে পুঁজিবাজার। বিভিন্ন সময় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভও তৈরি হতে দেখা গেছে। তবে বাজারের এ স্থবিরতার সবচেয়ে বড় ভূমিকাটি ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের। পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংককে একীভূত করার পাশাপাশি ব্যাংগুলোর মূলধন শূন্য ঘোষণা পুঁজিবাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই এক সিদ্ধান্ত তথা কলমের একটি আঁচড়ই মুহূর্তেই নিঃস্ব করে দেয় হাজার হাজার বিনিয়োগকারী এবং একই সাথে কয়েক শ’ প্রতিষ্ঠানকে। পরবর্তী দ্বিতীয় বড় ধাক্কাটিও আসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে। এবার তালিকাভুক্ত আটটি ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার ঘোষণা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ধারণ করে আছেন হাজার হাজার ব্যক্তি বিনিয়োগকারী ও কয়েক শ’ প্রতিষ্ঠান। পুঁজিবাজারের সবচাইতে বড় দুই খাত নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ দু’টি সিদ্ধান্তই বলতে গেলে পুঁজিবাজারকে তলানিতে নিয়ে যায়।

কিন্তু নেতিবাচক বাজার পরিস্থিতির দায়ের পুরোটাই বিএসইসির ঘাড়ে এসে পড়ে। এই মুহূর্তে সংস্থাটিতে পরিবর্তন চাচ্ছে বাজার সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ যারা নতুন সরকারকে দিয়ে দ্রুত পুনর্গঠন চাচ্ছেন বিএসইসির। আর এ কারণেই দীর্ঘদিন পর সাময়িকভাবে আস্থায় ফিরলেও আবার অস্থিরতার দিকে যাচ্ছে পুঁজিবাজার। বিনিয়োগকারীরা মনে করেন বিষয়টি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বাজার পরিস্থিতির উন্নতি আশা করা যায় না।

এদিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের কোম্পানি অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজের প্রায় ১৫৫ কোটি টাকার শেয়ার কিনবেন কোম্পানিটির চেয়ারম্যান আজিজ মোহাম্মদ ভাই। বৃহস্পতিবার দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে কোম্পানির পক্ষ থেকে শেয়ার কেনার এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। ডিএসই সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

ডিএসইর ওয়েবসাইটে দেয়া ঘোষণা অনুযায়ী, আজিজ মোহাম্মদ ভাই বাজার থেকে তার মালিকানাধীন এই কোম্পানিটির এক কোটি শেয়ার কেনার ঘোষণা দিয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী, আগামী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তিনি এই শেয়ার কেনা সম্পন্ন করবেন। ডিএসইর ব্লক মার্কেটের মাধ্যমে তিনি এই শেয়ার কেনার কাজ সম্পন্ন করবেন বলেও ঘোষণায় বলা হয়।

কোম্পানির চেয়ারেম্যান আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের উল্লেখযোগ্য পরিমাণে শেয়ার কেনার ঘোষণায় কোম্পানিটির শেয়ারদর ও লেনদেনে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। ওই দিন ঢাকা শেয়ারবাজারে অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারের লেনদেনও বেড়েছে। বেড়েছে দরও। আগের দিন ১৫২ টাকায় লেনদেন হওয়া শেয়ার গত বৃহস্পতিবার সকালে ১৬০ টাকা পর্যন্ত দর উঠে যায়। তবে দিনশেষে তা ১৫৫ টাকায় স্থির হয়।

বিদায়ী সপ্তাহে ডিএসইর লেনদেনের বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে। এ সময় পুঁজিাবাজারটি মোট পাঁচ হাজার ২৫০ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয় যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা ৬৪ দশমিক ৫১ শতাংশ বেশি। আগের সপ্তাহের তিন কার্যদিবসে বাজারটির মোট লেনদেন ছিল এক হাজার ৯১৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। আর এভাবে ডিএসইর গড় লেনদেন দাঁড়ায় এক হাজার ৫০ কোটি টাকা যা আগের সপ্তাহে ছিল ৬৩৮ কোটি টাকা।

গত সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষে ছিল ওষুধ ও রসায়ন খাতের স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস। এ সময় কোম্পানিটির গড়ে ৪১ কোটি ৬৯ লাখ শেয়ার হাতবদল হয়েছিল যা ছিল বাজারটির মোট লেনদেনের ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ। গড়ে ৩৭ কোটি ২৩ লাখ টাকার শেয়ার বেচাকেনা করে লেনদেনের তালিকায় দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল সিটি ব্যাংক। ডিএসইতে গত সপ্তাহে লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ঢাকা ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, রবি অজিয়াটা, মুন্নু ফ্যাব্রিকস, ওরিয়ন ইনফিউশন, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন ও কে অ্যান্ড কিউ।