ছোটদের বাংলা ভাষা : জাকির সেতু
Printed Edition
নাগডেমরা গ্রামের পাশ দিয়ে এঁকে বেঁকে বয়ে গেছে বড়াল নদী। নদীর দুপাশে সারি সারি বাড়ি গাছপালা ও ফসলি জমি। এই বড়াল নদীর তীরে রামিনদের বাড়ি। রামিনের আরো দুই বোন আছে উরশিয়া ও অর্নিলা তিন বোন মিলে সবসময় একসাথে খেলাধুলা করে। একসাথে পলাশ ও শিমুল ফুল কুড়িয়ে মালা গাঁথে। তিন বোন খুবই দুরন্ত প্রকৃতির।
তাদের বাবা রুহুল আমিন একজন শিক্ষক। তিনি সবসময় তিন মেয়েকে উপদেশ দেন। তিন বোন মাঝে মাঝে বাবার কাছে আবদার করে, আর বাবা সব সময় তাদের আবদার পূরণ করেন।
এক বিকাল বেলা রামিনের হাতে অনেক শিমুল ফুল। বাবা জিজ্ঞেস করলেন শিমুল ফুল দিয়ে কী করবে রামিন? রামিন বলল, বাবা মালা গেঁথে আমরা তিন বোন গলায় দেবো।
এদিকে উরশিয়া এসে বাবার পাশে বসল। বাবা তিনজনকে কাছে ডাকলেন। বাবা অর্নিলাকে জিজ্ঞেস করলেন, এই মাসের নাম কী? তুমি বলতে পারবে? অর্নিলা বলল, হ্যাঁ বাবা, পারব। এটি হচ্ছে ফেব্রুয়ারি মাস।
রামিন সুন্দরভাবে ছোট বোন অর্নিলা বলল, ফেব্রুয়ারি মাস ভাষার মাস। এই ভাষার জন্য আমাদের বাংলার সন্তানরা জীবন দিয়েছে। তাদের আত্মত্যাগের জন্য আমরা পেয়েছি বাংলা ভাষায় কথা বলার স্বাধীনতা। বাবা তাদের কথা শুনে খুব খুশি হলেন। এদিকে উরশিয়া বলল, একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এই দিবস উপলক্ষে আমরা আমাদের শহীদ ভাইদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি। সকালবেলা খালি পায় একুশে ফেব্রুয়ারির দিন তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে শহীদ মিনারে পুষ্প দিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানো হয়। বাবাকে উদ্দেশ করে উরশিয়া বলল, বাবা আমরা একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছি। অনেক পতাকা ও অক্ষর দিয়ে আমরা শহীদ মিনার তৈরি করব। তুমি আমাদের সাথে থাকবে। সাথে থাকবে দাদু ভাই, আকাশ ও মিঠু ভাই।
তাদের কথা শুনে বাবা বললেন, তোমরা অনেক কিছু জেনেছ। জেনে সত্যিই আমি আনন্দিত হলাম। একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের কাছে একটি শোকের মাস। আমরা আমাদের ভাষার জন্য সংগ্রাম করে জীবন দিয়েছি। এটি ইতিহাসের গর্ব ও সম্মানের বিষয়, যা অন্য কোনো জাতি কখনোই করেনি।
বাবার কথা মনোযোগ দিয়ে তিন বোন শুনল। রামিন বলল, আমার বাগানে অনেকগুলো গাঁদা ও গোলাপ ফুল আছে। একুশে ফেব্রুয়ারির দিন আমি এই ফুলগুলো দিয়ে সুন্দর করে মালা গেঁথে শহীদ মিনারে অর্পণ করব।
উরশিয়া বলল, সাথে শিমুল ও পলাশ ফুল দিয়ে একটি শ্রদ্ধাঞ্জলি বানিয়ে দিলে আরো ভালো হবে।
অর্নিলা বলল, তাহলে আমাদের আগেই পরিকল্পনা করতে হবে।
বাবা বললেন, তোমরা তোমাদের সহপাঠীদের সাথে সুন্দর করে শহীদ মিনার তৈরি করবে এবং শহীদ মিনারে পুষ্প অর্পণ করবে।
রামিন বলল, বাবা, আমার একটি আবদার আছে। একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা উপলক্ষে আমাদের তিন বোনকে ফেব্রুয়ারির ইতিহাস সম্পর্কে বই কিনে দিতে হবে।
বাবা তাদের উৎসাহ দেখে বললেন, অবশ্যই তোমাদের বই কিনে দেবো, যাতে তোমরা ফেব্রুয়ারি মাস এবং ভাষার ইতিহাস আরো ভালোভাবে জানতে পারো।
এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতে লাগল। রামিন উরশিয়া ও অর্নিলা তিন বোন একটু ছড়া সুর করে পড়তে লাগল-
ফাল্গুনে শুরু হয় গুনগুনানি,
ভোমরাটা গায় গান ঘুম ভাঙানি।
এক ঝাঁক পাখি এসে ঐকতানে
গান গায় একসাথে ভোরবিহানে।
আজানের সুর মেশে নীল আকাশে,
শিরশির করে ঘাস, হিম বাতাসে।
তাদের কণ্ঠে এই ছড়া বাতাসে ভেসে যেতে লাগল স্নিগ্ধ সতেজ ফুল হয়ে সন্ধ্যার আকাশে ।