৪ মাসে ৫০ কমিটির ১১টি গঠন শেষ সময়ের জন্য অপেক্ষা

সংসদীয় স্থায়ী কমিটি

Printed Edition

সংসদ প্রতিবেদক

সরকারের কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার অন্যতম সাংবিধানিক কাঠামো সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের মেয়াদ শুরু হওয়ার চার মাস পার হলেও বেশির ভাগ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এখনো গঠিত হয়নি। এরই মধ্যে দ্বিতীয় অধিবেশনও শেষ হওয়ার পথে। এ অবস্থায় কমিটি গঠনে বিলম্ব এবং বিরোধী দলকে কমিটির সভাপতি পদ দেয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকার বলছে, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই সব কমিটি গঠন করা হবে। বিরোধী দল বলছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনে সদস্য তালিকা চাওয়া হলেও সভাপতি পদে তাদের কাছ থেকে এখনো কোনো নাম চাওয়া হয়নি।

সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, সংবিধান ও কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী প্রথম তিন অধিবেশনের মধ্যেই সংসদীয় কমিটি গঠনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ইতোমধ্যে একটি অধিবেশন শেষ হয়েছে, দ্বিতীয় অধিবেশন চলমান এবং সামনে আরেকটি অধিবেশন রয়েছে। এর মধ্যেই সব সংসদীয় কমিটি গঠন করা হবে। তিনি বলেন, ‘৪-৫ টি সংসদীয় কমিটির গঠন সম্পন্ন হয়েছে। বাকিগুলোর গঠনের কাজ চলছে।’

জুলাই সনদের আলোকে গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেয়া হবে কি না এবং নাম চাওয়া হয়েছে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, আমরা বিরোধী দলকে সভাপতির পদ দেবো। বিরোধী দলের কাছ থেকে এ জন্য নাম চাওয়া হয়েছে।

তবে, বিরোধী দলীয় হুইপ মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান নয়া দিগন্তকে বলেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে সদস্য মনোনয়নের জন্য বিরোধী দলের কাছে নাম চাওয়া হয়েছিল এবং সেই তালিকা জমা দেয়া হয়েছে। কিন্তু সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদের জন্য সরকার তাদের কাছে এখনো কোনো নাম চায়নি।

সিরাজগঞ্জ-৪ (উল্লাপাড়া-সলঙ্গা) আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির সভাপতি সাধারণত বিরোধী দল থেকেই হয়ে থাকে। সেই বিবেচনায় আমরা বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা: সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের নাম দিয়েছি।’

সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ এবং জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী সংসদ গঠনের পর প্রথম তিন অধিবেশনের মধ্যেই সব স্থায়ী কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক। আগামী ৯ জুলাই দ্বিতীয় অধিবেশন শেষ হওয়ার কথা, তবে আরো কয়েক দিন বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। এখন পর্যন্ত ৫০টি সংসদীয় কমিটির মধ্যে গঠন করা হয়েছে মাত্র ১১টি। এর মধ্যে সংসদ-সংক্রান্ত ৮টি এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত মাত্র ৩টি স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সংসদ সচিবালয়ের তথ্যানুযায়ী, সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদে মোট ৫০টি কমিটি ছিল। এর মধ্যে ১১টি সংসদ-সংক্রান্ত এবং ৩৯টি মন্ত্রণালয়ভিত্তিক স্থায়ী কমিটি। প্রতিটি কমিটিতে সভাপতিসহ ১১ জন সদস্য থাকেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী পদাধিকারবলে সদস্য হন। তবে টেকনোক্র্যাট কোটার মন্ত্রী হলে তিনি সদস্য হতে পারেন না। বিশেষ আমন্ত্রণে বৈঠকে যোগ দেন। সংসদ নেতার অনুমোদনে চিফ হুইপের প্রস্তাব অনুযায়ী এসব কমিটি গঠন করা হয়।

কমিটি গঠনে বিলম্বের বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রথম অধিবেশনের সময় সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যরা নির্বাচিত হয়ে সংসদে আসেননি। এরপর শুরু হয়েছে বাজেট অধিবেশন। এ ছাড়া একটি বড় বিরোধী দলসহ একাধিক রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে আনুপাতিক হারে সদস্য ও সভাপতির পদ বণ্টনের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে সরকারকে। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা নিয়ে কমিটিগুলো গঠন করা হচ্ছে।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনায় সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বণ্টন নিয়ে নীতিগত ঐকমত্য হয়। জুলাই সনদেও বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। গত বছরের (২০২৫) ১৭ জুন ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছিলেন, সরকারি হিসাব কমিটি (পাবলিক অ্যাকাউন্টস), সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি (পাবলিক আন্ডারটেকিং), অনুমিত হিসাব কমিটি (এস্টিমেটস) এবং বিশেষ অধিকার (প্রিভিলেজ) কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলের সদস্যদের দেয়ার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে।

এ ছাড়া সংসদে আসন সংখ্যার আনুপাতিক হারে অন্যান্য কমিটির সভাপতির পদ বণ্টনের বিষয়েও বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ প্রায় ৩০টি রাজনৈতিক দল ঐকমত্যে পৌঁছায়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ২২২টি আসন। জামায়াতে ইসলামী এককভাবে ৬৮টি এবং জোটগতভাবে ৭৭টি আসন পেয়েছে। এ ছাড়া সাতজন স্বতন্ত্র ও ইসলামী আন্দোলনের একজন সংসদ সদস্য রয়েছেন। এই আসন অনুপাতের ভিত্তিতে জামায়াত-এনসিপি জোটের মধ্যে ধারণা করা হচ্ছে, তারা প্রায় ১৪টি সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ পেতে পারে।

বিগত সংসদগুলোতে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি প্রথম বা দ্বিতীয় অধিবেশনের মধ্যেই গঠন সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে যে তিনটি মন্ত্রণালয়ভিত্তিক স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে, তার মধ্যে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি হয়েছেন জোটের শরিক বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খানকে। অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন জাতীয় সংসদের সবচেয়ে প্রবীণ সদস্য মো: মুশফিকুর রহমান।

বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা সংসদীয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব নিতে আগ্রহী নন। তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, মন্ত্রিত্ব না পেয়ে সংসদীয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব নেয়া ‘সান্ত¡না পুরস্কার’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে অনেকে আবার সংসদীয় কমিটির সভাপতি হওয়ার লবিংয়েও রয়েছেন।

সূত্র জানায়, চলতি বাজেট অধিবেশনে আরো কয়েকটি সংসদীয় কমিটি গঠন হবে। পূর্ণাঙ্গ সংসদীয় কমিটি গঠন পরবর্তী অধিবেশন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সংসদীয় বা যেকোনো কমিটিতে যেতে জামায়াত দলীয় এমপিদের লবিং নেই। তবে জুলাই সনদ অনুযায়ী আনুপাতিক হারে বিভিন্ন কমিটিতে সভাপতি নেয়া হলে জামায়াতের যেসব নেতার নাম উঠে আসছে তার মধ্যে রয়েছেন, এ টি এম আজহারুল ইসলাম, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, শাহজাহান চৌধুরী, গাজী নজরুল ইসলাম, সাইফুল আলম খান মিলন ও নূরুল ইসলাম বুলবুলসহ আরো কিছু নেতার নাম। এনসিপি থেকে আখতার হোসেন ও হাসনাত আব্দুল্লাহর নামও আসছে সম্ভাব্য সংসদীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে। অন্য দিকে, স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা ঐক্যবদ্ধ হলে তারাও একটি কমিটির সভাপতির পদ পেতে পারেন বলে জানা গেছে।

নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ও সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো সরকারের কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রধান প্ল্যাটফর্ম। তাই যত দ্রুত সম্ভব এসব কমিটি গঠন করা প্রয়োজন।