রংপুর-৬ আসনে জাপা-আ’লীগের দুর্গে লড়াই হবে জামায়াত-বিএনপির
Printed Edition
আব্দুল হাকিম ডালিম পীরগঞ্জ (রংপুর)
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনে জমে উঠেছে ভোটের মাঠ। উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত করতোয়া নদীঘেঁষা এই জনপদে এবারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পীরগঞ্জসহ পার্শ্ববর্তী দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও রংপুর জেলার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে এবার সেই ‘দুর্গ’ ভাঙতে মরিয়া জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি।
রংপুর জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো: এনামুল হক ঘোষিত বৈধ প্রার্থীদের তালিকা অনুযায়ী, এই আসনে মোট আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন- বাংলাদেশ মজলিসুল মোফাসিরিনের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল ও জামায়াতে ইসলামীর রংপুর জেলা কর্মপরিষদ সদস্য সহকারী অধ্যাপক মওলানা মো: নুরুল আমিন, রংপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো: সাইফুল ইসলাম, ইসলামী আন্দোলনের মওলানা সুলতান মাহমুদ, জাতীয় পার্টি সমর্থিত মো: নুর আলম মিয়া, স্বতন্ত্র প্রার্থী মো: মাহবুবুর রহমান, মো: সাদেকুল ইসলাম, আমেরিকা প্রবাসী আবু জাফর মো: জাহিদ এবং তাকিয়া জাহান চৌধুরী।
যদিও প্রার্থী সংখ্যা আটজন, তবে স্থানীয় ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে মূল লড়াইটি হবে জামায়াত ও বিএনপির মধ্যেই। অতীতে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির শক্ত অবস্থানের কারণে এই আসনে অন্য দলের প্রার্থীদের জয়লাভ সহজ ছিল না। তবে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও দীর্ঘদিন ধরে ভোটাধিকার প্রশ্নে ক্ষোভ জমে ওঠায় এবার সমীকরণ ভিন্ন হতে পারে বলে ধারণা করছেন ভোটাররা। পীরগঞ্জ আসনে এক সময় জাতীয় পার্টির ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণের পর লাঙ্গল প্রতীকে মো: আব্দুল জলিল বিজয়ী হন। পরে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে এরশাদ নিজেই এই আসনে বিপুল ভোটে জয়ী হন। এরশাদ আসন ছেড়ে দিলে উপ-নির্বাচনসহ পরপর দুইবার লাঙ্গল প্রতীকে নুর মোহাম্মদ মণ্ডল বিজয় লাভ করেন।
২০০৮ সালে জাতীয় পার্টির সাথে আওয়ামী লীগ মহাজোট গঠন করে শেখ হাসিনা এই আসনে নির্বাচন করে জয়ী হন। পরে তিনি আসন ছেড়ে দিলে উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদ বিজয়ী হন। এর পর ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বিপুল ভোটে জয় লাভ করেন। তিনি পরবর্তীতে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও একই আসন থেকে বিজয়ী হন।
দিনাজপুর, রংপুর ও গাইবান্ধা- এই তিন জেলার দক্ষিণ সীমান্ত ঘেঁষা হওয়ায় রংপুর-৬ আসনের ভোটারদের মধ্যে নির্বাচনী আমেজ বরাবরই দৃশ্যমান হয়ে উঠে। এবারও সেই আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। ১৫টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৮৬ হাজার ৯৪০ জন। দীর্ঘ ১৭ বছর পর একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশায় নবীন ও প্রবীণ ভোটারদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবার।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সহকারী অধ্যাপক মওলানা মো: নুরুল আমিন বলেন, তিনি নির্বাচিত হলে পীরগঞ্জের কয়লা ও লৌহ খনি উত্তোলনের উদ্যোগ নেবেন। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, জ্বালানি সঙ্কট নিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও এলাকার সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি নীল দরিয়া, বড়বিলা বিল ও করতোয়া নদীকেন্দ্রিক পর্যটন শিল্প গড়ে তুলে জুলাই শহীদ বিপ্লবে আবু সাঈদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
অন্য দিকে বিএনপির প্রার্থী মো: সাইফুল ইসলাম বলেন, তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে দলের ঘোষিত ৩১ দফা বাস্তবায়নে কাজ করবেন। পাশাপাশি শহীদ আবু সাঈদের স্বপ্ন পূরণ, গ্রামীণ সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বেকারত্ব দূরীকরণে অগ্রাধিকার দেবেন।
জাতীয় পার্টি সমর্থিত প্রার্থী মো: নুর আলম মিয়া জানান, পীরগঞ্জ জাতীয় পার্টির ঐতিহ্যবাহী আসন। জনগণের ভোটে এই আসন পুনরুদ্ধার করাই নুর আলম মিয়ার মূল লক্ষ্য। সব মিলিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীনদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রংপুর-৬ আসনে এবারের নির্বাচন হতে যাচ্ছে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ভোটের মাঠে শেষ পর্যন্ত কারা টিকে থাকেন, সে দিকেই তাকিয়ে রয়েছে উত্তরাঞ্চলের রাজনৈতিক অঙ্গন।