বেচারা নেইমার প্রি-কোয়ার্টারে কি দেখা যাবে

Printed Edition
khela-2
বেচারা নেইমার প্রি-কোয়ার্টারে কি দেখা যাবে

ক্রীড়া প্রতিবেদক

নেইমার বিশ্বকাপ জিতুক বা না জিতুক, ফুটবল ইতিহাস তাকে মনে রাখবে একজন ট্র্যাজিক হিরো হিসেবে। যার পায়ে ছিল বলকে নাচানোর অলৌকিক ক্ষমতা অথচ যার ক্যারিয়ারকে বারবার থামিয়ে দিয়েছে প্রতিপক্ষের নৃশংসতা আর দুর্ভাগ্যের ইনজুরি। সব ট্রলের উপরে নেইমার জুনিয়র একজন আইকন, একজন যোদ্ধা এবং আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা জাদুকর। তার পায়ে যে শিল্প ছিল, তা হয়তো প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের বুটের নিচে বারবার পিষ্ট হয়েছে, ভক্তদের স্মৃতিতে তা চিরকাল উজ্জ্বল থাকবে। চলতি বিশ^কাপে ব্রাজিল দলে যে কয়জন খেলোয়াড় রয়েছেন নেইমারের ড্রিবলিংয়ের ধারে কাছেও কেউ নেই। ভিনিসিয়াস কিছুটা কারিশমা দেখাতে পেরেছেন, তা দলের জন্য যথেষ্ট এবং নজরকাড়া নয়। তাই ভক্তরা বারবার তাকে মাঠে দেখতে চায়। কোচ অ্যানচেলত্তি আবেগে গা ভাসাতে চান না। যে কারণেই তাকে মাঠে দেখা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কোটি কোটি ভক্ত।

বিশ^কাপে ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচে মরক্কোর বিপক্ষে অনুমেয়ই ছিল নেইমার থাকবেন না এই ম্যাচে। ম্যাচটি ড্র হয় ১-১ গোলে। পরের ম্যাচে হাইতির বিপক্ষে অনেকেই ধরে নিয়েছেন মাঠে নামবেন নেইমার। বিভিন্ন মিডিয়ার কল্যাণেও স্পষ্ট হয়। ভক্তকুলের অপেক্ষার প্রহর আর শেষ হচ্ছিল না। কিন্তু না নেইমারবিহীন ম্যাচ ব্রাজিল জিতে নিল ৩-০ গোলে। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে অবশেষে ৯৮১ দিন পর ম্যাচে ৭৬ মিনিটে নামলেন এই ড্রিবলিং মাস্টার। তিনটি কর্নার কিক ও একটি ফ্রিকিক নিলেন। ফাউলের শিকারও হলের একবার। ৩-০ গোলে ব্রাজিলের জয়। ধারণা করা হয়েছিল নকআউট পর্বের প্রথম ম্যাচে জাপানের বিপক্ষে থাকবেন নেইমার। কিন্তু না আনচেলত্তির অভিজ্ঞতার কারণে ঠাঁই হয়নি এই তারকার। তবে দল ঠিকই পৌঁছে গেছে সেরা ষোলোতে।

নেইমারকে কেন নামায়নি

জাপানের বিপক্ষে ব্রাজিল যখন গোলের জন্য সংগ্রাম করছিল, তখন সমর্থকের চোখ ছিল রিজার্ভ বেঞ্চের দিকে। অপেক্ষা, কখন মাঠে নামবেন নেইমার? তবে শেষ মুহূর্তের গোলে জেতা ম্যাচে আর মাঠে নামা হয়নি নেইমারের। ম্যাচ শেষে ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি জানিয়েছেন, ম্যাচ সমতায় না ফিরলে তিনি নেইমারকে মাঠে নামাতেন। ২৯ মিনিটে জাপান এগিয়ে যাওয়ার পর ৫৬ মিনিটে সমতা ফিরিয়েছিলেন কাসেমিরো।

তখন ১-১ সমতায় থাকায় অতিরিক্ত সময়ের কথা ভেবে নেইমারকে বেঞ্চে রেখে দেয়া হয়। যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লি গোল করে ব্রাজিলকে ২-১ গোলে জয় এনে দেন। ম্যাচ শেষে ‘কাজ’ টিভিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আনচেলত্তি বলেছেন, ‘অতিরিক্ত সময়ে নেইমারকে নামানোর পরিকল্পনা ছিল। ওর সাথে এ নিয়ে কথাও হয়েছিল। আমরা সমতায় ফিরতে না পারলে ৬০ বা ৬৫ মিনিটের দিকে ওকে মাঠে নামানো হতো। কিন্তু গোল শোধ করার পর দলের কৌশলে পরিবর্তন আনতে চাইনি। কারণ তখন ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতেই ছিল।

দলের শক্তিমত্তার প্রশংসা করে এই ইতালিয়ান কোচ বলেন, আমাদের দলে অনেক বিকল্প আছে। বেঞ্চে যেমন, মাঠেও তেমনি। খেলোয়াড়েরা ব্যক্তিগতভাবে ভালো খেলছে, দল হিসেবেও সমন্বয় দেখাচ্ছে।

নেইমার অভিনেতা নন

ফুটবল বিশ্বে একটা কথা খুবই প্রচলিত নেইমার নাকি অভিনেতা। সামান্য ছোঁয়া পেলেই নাকি তিনি মাঠে গড়াগড়ি খান। এই নিয়ে বছরের পর বছর ধরে তাকে নিয়ে হয়েছে অসংখ্য ট্রল। কিন্তু এর আড়ালে যে নিষ্ঠুর বাস্তবতা লুকিয়ে আছে, তা কি কেউ কখনো ভেবে দেখেছে। যাকে সহজে অভিনেতা বলা, তার চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনটা কেউ কি একবার পড়ে দেখেছে। কিভাবে হচ্ছে পুনর্বাসন।

২০১৪ বিশ্বকাপের সেই কোয়ার্টার ফাইনালের কথা। হুয়ান জুনিগার হাঁটু নেইমারের পিঠে এসে লাগল। মেরুদণ্ডের ৩ কশেরুকায় ফাটল। বিশ্ব কেঁদেছিল সেদিন। কিন্তু চিকিৎসকরা পরে যা জানিয়েছিলেন, তা আরো ভয়াবহ। আঘাতটা আর মাত্র এক ইঞ্চি ওপরে বা নিচে লাগলে নেইমার হয়তো সারাজীবনের জন্য প্যারালাইজড হয়ে যেতেন। সেদিন মাঠ থেকে স্ট্রেচারে করে যাওয়ার সময় নেইমারের চোখের জল কিন্তু অভিনয় ছিল না। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এসেছেন।

পিএসজিতে যোগ দেয়ার পর নেইমারের ড্রিবলিং প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের জন্য হয়ে ওঠে আতঙ্কের কারণ। বল কেড়ে নিতে না পেরে তারা টার্গেট করতে শুরু করে নেইমারের শরীর। দুই বছরে দুইবার তার ডান পায়ের মেটাটারসাল হাড় ভেঙে যায়। দীর্ঘ মাসগুলো তাকে কাটাতে হয়েছে ক্রাচে ভর দিয়ে, মাঠের বাইরে। একজন শিল্পীর পা যখন বারবার ভেঙে ফেলা হয়, তখন তার মনে কি থাকে, কি হয়, সে মানসিক যন্ত্রণা কয়জন বুঝতে পারেন।

বড় মঞ্চ মানেই নেইমারের ওপর ফাউলের বন্যা। পরিসংখ্যান বলে, নেইমার ক্যারিয়ারের অধিকাংশ সময়ই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ফাউলের শিকার হওয়া খেলোয়াড়দের একজন। কাতার বিশ্বকাপে তার ফুলে যাওয়া গোড়ালির কথা অনেকেরই মনে আছে। লিগামেন্ট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও তিনি ইনজেকশন নিয়ে দেশের জন্য খেলেছেন। এই আত্মত্যাগও কি অভিনয়।

২০২৩ সালে উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে বাঁ হাঁটুর এসিএল ছিঁড়ে যায়। ফুটবলারদের জন্য এটি অন্যতম ভয়াবহ ইনজুরি। অস্ত্রোপচার, অসহ্য যন্ত্রণা এবং প্রায় এক বছরের পুনর্বাসন। ৩১ বছর বয়সে এসে এই আঘাত শুধু শরীর ভাঙেনি, হয়তো ভেঙে দিয়েছে তার অনেক না বলা স্বপ্নও।

নেইমার যখন সামান্য ছোঁয়ায় মাঠে গড়াগড়ি খান, মনে হয় তিনি ফাউল আদায়ের চেষ্টা করছেন। কিন্তু তার ইনজুরি ইতিহাস মাথায় রাখলে বুঝবেন এটা অভিনয় নয়, বরং আত্মরক্ষার এক সহজাত কৌশল! যে মানুষটার পিঠ ভেঙেছে, পায়ের হাড় ভেঙেছে, গোড়ালির লিগামেন্ট ছিঁড়েছে, হাঁটুর এসিএল ছিঁড়েছে, তার কাছে প্রতিটা ট্যাকল শুধু একটা ফাউল নয়; সেটা হয়তো আরেকটা ক্যারিয়ার-ধ্বংসকারী ইনজুরির ভয়। তিনি যখন পড়ে যান, তখন শরীরটাকে ছেড়ে না দিলে ফের ভাঙার ভয় থাকে। তার শরীরের প্রতিটি ক্ষত এক একটা যুদ্ধের ইতিহাস।