কোটাবিরোধী আন্দোলনের অবরোধ-বিক্ষোভে উত্তাল দেশের শিক্ষাঙ্গন

ফিরে দেখা জুলাই’২৪

Printed Edition
first-7
কোটাবিরোধী আন্দোলনের অবরোধ-বিক্ষোভে উত্তাল দেশের শিক্ষাঙ্গন

হারুন ইসলাম

সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিল করে ২০১৮ সালে জারি করা পরিপত্র পুনর্বহালের দাবিতে ৩ জুলাই সারা দেশে নতুন মাত্রা পায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। রাজধানী থেকে জেলা শহর, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে মহাসড়ক ও রেলপথ- সবখানেই ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ। আন্দোলন আর কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি পরিণত হতে শুরু করে দেশব্যাপী ছাত্রসমাজের অভিন্ন দাবির আন্দোলনে।

‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একযোগে কর্মসূচি পালন করেন। কোথাও সড়ক অবরোধ, কোথাও রেলপথে অবস্থান, আবার কোথাও বিক্ষোভ মিছিল ও পদযাত্রার মাধ্যমে তারা স্পষ্ট করে দেন, কোটা প্রশ্নে আর কোনো আপস নয়। আগের দিনের তুলনায় ৩ জুলাইয়ের কর্মসূচি ছিল অনেক বেশি সমন্বিত ও বিস্তৃত। পরদিন ৪ জুলাই আপিল শুনানিকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রত্যাশা ও উদ্বেগও ছিল তুঙ্গে।

রাজধানীতে সবচেয়ে বড় কর্মসূচি পালিত হয় শাহবাগে। দুপুর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে থাকেন। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি রাজধানীর সাত সরকারি কলেজ ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-অধিভুক্ত বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। পরে একটি বিক্ষোভ মিছিল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা প্রদক্ষিণ করে দোয়েল চত্বর ও সুপ্রিম কোর্ট হয়ে শাহবাগ মোড়ে এসে অবস্থান নেয়। বিকেল পৌনে ৪টা থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টা শাহবাগ মোড় অবরুদ্ধ থাকায় বাংলামোটর, মৎস্য ভবন, কাকরাইল, সায়েন্সল্যাব ও নিউমার্কেটমুখী সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।

অবরোধ চলাকালে শিক্ষার্থীদের সেøাগানে মুখর হয়ে ওঠে শাহবাগ। ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’, ‘আঠারোর পরিপত্র পুনর্বহাল করতে হবে’, ‘আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’, ‘হাইকোর্ট না রাজপথ, রাজপথ রাজপথ’- এমন নানা সেøাগানের পাশাপাশি পরিবেশিত হয় প্রতিবাদী গান ও কবিতা। আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, পরদিনের আপিল শুনানিতে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটবে বলে তারা আশা করছেন। একই সাথে তিনি ৪ জুলাই বেলা ১১টায় আবারো কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে সমবেত হওয়ার ঘোষণা দেন।

রাজধানীর অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীরাও এদিন পৃথক কর্মসূচি পালন করেন। পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার মোড়ে শিক্ষার্থীরা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন, যার ফলে কিছু সময় যান চলাচল ব্যাহত হয়। অন্যদিকে আগারগাঁও-খামারবাড়ি সড়কে শিক্ষার্থীদের অবরোধে ওই এলাকাও উত্তাল হয়ে ওঠে। ‘আমার দেশ, আমার মা- বৈষম্য মানি না’ এবং ‘সারা বাংলা খবর দে, কোটা প্রথার কবর দে’ সেøাগানে মুখর ছিল কর্মসূচি।

সাভারে শিক্ষার্থীরা চার দফা দাবিতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন। প্রায় দেড় ঘণ্টার এ কর্মসূচিতে মহাসড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। আন্দোলনকারীরা বলেন, সরকারি চাকরিতে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং ২০১৮ সালের পরিপত্র পুনর্বহাল করতে হবে।

দিনটির অন্যতম আলোচিত ঘটনা ঘটে ময়মনসিংহে। শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন আবদুল জব্বার মোড় এলাকায় রেললাইন অবরোধ করে ঢাকা থেকে মোহনগঞ্জগামী মহুয়া কমিউটার ট্রেন আটকে দেন। প্রায় এক ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকার পর অবরোধ প্রত্যাহার করা হলে রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়। আন্দোলনের বিস্তার ও দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবে এই কর্মসূচি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

বরিশালে শিক্ষার্থীরা কাফনের কাপড় পরে বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে ব্যতিক্রমী কর্মসূচি পালন করেন। প্রতীকী এই কর্মসূচির মাধ্যমে তারা দাবি আদায়ে শেষ পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। চট্টগ্রামে শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়ক অবরোধ করেন। একইভাবে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ, পদযাত্রা, মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমন্বিত প্রচারণার মাধ্যমে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসূচি অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করে, ফলে অল্প সময়েই আন্দোলন দেশব্যাপী রূপ লাভ করে।

৩ জুলাইয়ের আন্দোলনের অন্যতম কারণ ছিল পরদিনের আপিল শুনানি। শিক্ষার্থীদের বিশ্বাস ছিল, আদালত ২০১৮ সালের পরিপত্র পুনর্বহালের পক্ষে অবস্থান নেবে। সেই প্রত্যাশায় তারা আন্দোলনের গতি আরো বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে দেশব্যাপী আন্দোলনের মুখে সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিল করে। তবে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের উত্তরসূরিদের করা একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের জুনে হাইকোর্টের রায়ে নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ওই রায়কে কেন্দ্র করেই শিক্ষার্থীরা আবার রাজপথে নামেন।

৩ জুলাইয়ের কর্মসূচি ছিল শান্তিপূর্ণ, তবে আন্দোলনকারীদের অবস্থান ছিল দৃঢ় ও আপসহীন। আন্দোলনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরা জানান, বৃষ্টি, প্রতিকূল আবহাওয়া কিংবা অন্য কোনো বাধাই তাদের কর্মসূচি থেকে সরাতে পারেনি। তাদের কাছে এটি ছিল ন্যায়বিচার, সমতা ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন।

বিশ্লেষকদের মতে, ৩ জুলাই ছিল কোটাবিরোধী আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলের দিন। এর আগে আন্দোলন মূলত ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক থাকলেও এদিন তা সড়ক ও রেলপথে ছড়িয়ে পড়ে জাতীয় চরিত্র লাভ করে। কোটা সংস্কারের দাবি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের বিরুদ্ধে বৃহত্তর প্রতিরোধে রূপ নিতে শুরু করে। পরবর্তী দিনগুলোতে সেই আন্দোলন আরো বিস্তৃত হয়ে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের ভিত্তি তৈরি করে এবং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়।