বুদ্ধিমান মাছ বিক্রেতা : ইকবাল কবীর মোহন

Printed Edition
agdum-1
বুদ্ধিমান মাছ বিক্রেতা : ইকবাল কবীর মোহন

অতীত আরবের গল্প। একদা একজন দয়াবান ও ন্যায়বান বাদশাহ বাস করতেন। তবে তার স্ত্রী ছিল কৃপণ প্রকৃতির মহিলা। তাদের নিয়ে এক মজার গল্প আছে। বলি তা হলে, বাদশাহ একদিন স্ত্রীকে নিয়ে শিকারে বের হলেন। দীর্ঘ পথ মাড়িয়ে তারা এক জায়গায় উপস্থিত হলেন। যেতে যেতে তারা বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। তাই খনিকটা বিশ্রামের প্রয়োজন হলো। পথিমধ্যে তারা একটি বড় গাছের ছায়া দেখে সেখানেই বসে পড়লেন। তারা গাছের ছায়ায় আরামে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এই জায়গাটি ছিল লোকালয়ের কাছাকাছি।

এ সময় আরবের এক লোক সেখানে এসে হাজির হলো। সে বাদশাহর জন্য একটি তরতাজা বড় মাছ নিয়ে এলো। মাছটি দেখে বাদশাহ খুব খুশি হলেন। মূল্য হিসেবে বাদশাহ মাছ বিক্রেতাকে চার হাজার দিনার পরিশোধ করলেন। মাছ বিক্রেতা তো মহাখুশি। মাছের বেশি মূল্য পেয়ে সে খুশিতে টগবগ করতে লাগল। কারণ, মাছের এই উচ্চমূল্য সে মোটেও আশা করেনি।

বাদশাহর এই উদার কাণ্ড দেখে রানী খুব বিরক্ত হলেন। তিনি বিষয়টি মানতে পারলেন না। তাই রানী বিরক্তির সাথে বললেন, ‘এই যে কাজটা করলে, এটা অর্থের বড় অপচয়। মাছওয়ালাকে বড় বেশি দয়া করা হচ্ছে। তুমি মাত্র একটি মাছের জন্য চার হাজার দিনার ব্যয় করেছ! এর চেয়ে মূল্যবান কোনো জিনিস যদি দেওয়া হতো, তা হলে তুমি কত ব্যয় করতে শুনি? এ ধরনের অপচয় করা হলে তোমার খাজাঞ্চিখানা তো অচিরেই নিঃশেষ হয়ে যাবে?’

রানী বাদশাহকে আরো বললেন, ‘তুমি এক কাজ করো। দিনারগুলো ফেরত নাও। আর মাছের যা প্রকৃত দাম তা বিক্রেতাকে পরিশোধ করো।’

বাদশাহ বললেন, ‘যে দিনার আমি পরিশোধ করেছি, তা কিভাবে ফেরত নিই? আমি তো আর যেন তেন লোক নই। আমি বাদশাহ। তাই এটা আমার জন্য খুব বাজে কাজ হবে। এতে লোকটার কাছে আমার কৃপণতা প্রকাশ পাবে।’

রানী ছিলেন বেশ বুদ্ধিমতী। তিনি বললেন, ‘আমি বলি কী, দিনারগুলো ফেরত পাওয়ার জন্য আমরা এক কৌশল গ্রহণ করতে পারি। যেমন, আমরা বলতে পারি মাছটি পুরুষ বা মহিলা কিনা? যদি সে বলে এটি পুরুষ মাছ, তা হলে আমরা তৎক্ষণাৎ বলব, না ভাই আমরা একটি মহিলা মাছ চাই। আর সে যদি বলে মাছটি মহিলা, তা হলে আমরা বলব, আমাদের তো একটি পুরুষ মাছের প্রয়োজন। আর এটাই হতে পারে মাছ ফেরত দিয়ে দিনারগুলো ফেরত পাওয়ার উত্তম কৌশল।’

‘বেশ ভালো কথা!’-বাদশাহ বললেন

আরবের লোকটিকে এবার ডাকা হলো। এবার বাদশাহ বললেন, ‘তোমার এই মাছটি কি পুরুষ না মহিলা?’

আরবের লোক গরিব হলে কী হবে? সে ছিল খুব চতুর। সে বাদশাহর প্রশ্নের মর্ম বুঝে ফেলল। তাই সে ঝটপট জবাব দিয়ে বলল, ‘না হুজুর মাছটি পুরুষ বা মহিলা কোনটাই নয়। এটা ক্লিব লিঙ্গ।’

বাদশাহ লোকটির জবাব খুব পছন্দ করলেন। তিনি লোকটির বুদ্ধিমত্তা দেখে তাকে আরো চার হাজার দিনার উপহার হিসেবে দিলেন।

লোকটি আরো চার হাজার দিনার পেয়ে যারপরনাই খুশি হলো। এবার সে চলে যেতে চাইল। এ সময় লোকটি চালাকি করে হাত থেকে একটি মুদ্রা মাটিতে ফেলে দিলো। তারপর লোকটি মোড় ঘুরে দাঁড়িয়ে সেই মুদ্রাটি তুলে নিলো। এটা দেখে রানী বাদশাহকে বললেন, ‘দেখো, লোকটি কত কৃপণ। সে একটি মুদ্রাও ফেলে যেতে রাজি নয়। কেউ এই মুদ্রাটি পেয়ে যাক তাও সে ছাড়তে চায়নি।’

বাদশাহ এবার লোকটিকে ডেকে বললেন, ‘আমি তোমাকে হাজার দিনার দিলাম। তারপরও তুমি একটি মুদ্রা ছাড় দিতে পারলে না। একটি মুদ্রা মাটিতে পড়ে গেল, আর তাও তুমি কুড়িয়ে নিলে! এতে তুমি মোটেও লজ্জাবোধ করোনি?’

আরবের লোকটি বাদশাহর কথার জবাবে খুব বিনয়ের সাথে বলল, ‘মহান বাদশাহ, আপনার জীবন দীর্ঘ হোক। কৃপণ লোক হিসেবে আমি মুদ্রাটি কুড়িয়ে নেইনি। আমি এটা এজন্য করেছি যে, এই মুদ্রায় আপনার ছবি খচিত রয়েছে। আমি ভাবলাম এটি মাটিতে পড়ে থাকলে অন্য কেউ এসে অচেতনভাবে এটিতে পা ফেলতে পারে এবং এতে আপনার অপমান হবে।’

বাদশাহ লোকটির কথা শুনে আরো বেশি খুশি হলেন। বাদশাহ লোকটির কৃতজ্ঞতার ফলস্বরূপ তাকে আরো চার হাজার দিনার উপহার দিলেন। এভাবে বাদশাহর সরলতা ও মাছ বিক্রেতার বুদ্ধিমত্তার জন্য লোকটি প্রচুর অর্থের মালিক হলো। এবার সে খুশিতে টগবগ করতে করতে বাড়ি ফিরে গেল। রানী বাদশাহর কাণ্ড দেখে হতবিহ্বল হয়ে লোকটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তখন স্বামীর অবাক কাণ্ডে রানী জ্বলেপুড়ে মরছিলেন। হ