সমাজবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
সমাজবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, অপশক্তি আর যাতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে এবং বিরাজমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কেউ যাতে বিনষ্ট করতে না পারে, সেজন্য দেশবাসীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। গতকাল সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃৃতি মিলনায়তনে শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বী বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং পুরোহিত ও সেবাইতগণের সম্মানী প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে আবহমানকাল থেকে দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রেখে নিজ নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতি পালন করে আসছে। তবে সময়ে সময়ে ‘কংস’ চরিত্রের মানুষেরা রাষ্ট্র ও সমাজে বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টা চালিয়েছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশেও গণতন্ত্রকামী জনগণের সব অধিকার কেড়ে নিয়ে ‘কংসের’ মতো এক নিষ্ঠুর শাসক জনগণের কাঁধে চেপে বসেছিল। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় পর দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ হাজারো প্রাণের বিনিময়ে কংসরূপী সে ফ্যাসিস্টদের পতন ঘটিয়েছে। বাংলাদেশে আবারো গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে। ভঙ্গুর অর্থনীতি, বিভাজিত প্রশাসন,আর অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ঘটিয়ে এবার দেশ পুনর্গঠনের পালা।
একটি রাষ্ট্র এবং সমাজে বিভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষের সম্মিলন থাকে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটিই বৈচিত্র্যময় সমাজের সৌন্দর্য। এ অনুষ্ঠানে যারা ‘সংখ্যালঘু’ কিংবা ‘সংখ্যাগুরু’ হিসেবে বিবেচিত, ইউরোপ কিংবা আমেরিকা সফরে গেলে আমরা সবাই কিন্তু কথিত ‘সংখ্যালঘু’ । সুতরাং, বর্তমান গ্লোবাল ভিলেজে ‘সংখ্যালঘু’ কিংবা ‘সংখ্যাগুরু’ এসব পরিচয় কোনো মুখ্য বিষয় নয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সংখ্যালঘু’ কিংবা ‘সংখ্যাগুরু’ নয়, আসুন সবাই নিজেদেরকে বাংলাদেশী ভাবি। রাষ্ট্র এবং সমাজে দল-মত-ধর্ম-বর্ণ পরিচয় যেন মানুষের মধ্যে বিভেদ বৈষম্য সৃষ্টির কারণ না হয়, সে উপলব্ধি থেকেই দেশের সব নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ রাখতে স্বাধীনতার ঘোষকের যুগান্তকারী রাজনৈতিক দর্শন ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’। তিনি বলেন, আমাদের সব নাগরিকের গর্বিত পরিচয় ‘আমরা বাংলাদেশী’।
বর্তমান সরকার একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়তে চায় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, রাষ্ট্র তার সাধ্য এবং সামর্থ্য অনুযায়ী দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে। অপর দিকে নাগরিকগণ রাষ্ট্রের প্রতি তাদের সব নাগরিক দায়িত্ব পালন করবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব সুসংহত রেখে সমৃদ্ধ স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে হলে দেশে নাগরিকদের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন জরুরি। সে লক্ষ্য পূরণেই বর্তমান সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্পোর্টস কার্ড, সব ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের জন্য সম্মানী ভাতা প্রদানসহ যাবতীয় উদ্যোগ গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করে চলছে।
সনাতন ধর্মের প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হিন্দু ধর্মীয় শাস্ত্রমতে, কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে জন্ম নিয়েছিলেন সনাতন ধর্মের প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ। হিন্দু ধর্মের অবতার শ্রীকৃষ্ণ প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে মথুরায় এমন একসময় জন্মগ্রহণ করেন, যখন মথুরার শাসক ছিলেন নিষ্ঠুর ও দুষ্ট প্রকৃতির, অত্যাচারী-স্বৈরাচারী ‘কংস’। শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের পর ‘কংস’-এর পতন ঘটে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন, দুষ্টের দমন শিষ্টের পালনই ছিল শ্রীকৃষ্ণের অন্যতম ব্রত।
অনুষ্ঠানে মন্দিরের ৯ জন পুরোহিত ও সেবাইতের মধ্যে সম্মানী বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সাথে সারা দেশে পুরোহিত ও সেবাইতগণের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এফটিএর মাধ্যমে এ অর্থ পেঁৗঁছে যায়।
হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও নৃ-গোষ্ঠী বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকারের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ, ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন (কায়কোবাদ), সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিহউল্লাহ, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন, সিপিডির ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান তপন চন্দ্র মজুমদার, পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও কালবেলা পত্রিকার সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, স্বামীবাগ ইসকনের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ ভক্তিময় নিতাই স্বামী মহারাজ, বিএনপির সহধর্ম বিষয়ক সম্পাদক অমলেন্দু দাস অপু বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আবদুল মঈন খান, আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, বিমানমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমান উল্লাহ আমান, ফরহাদ হালিম ডোনার, সহসভাপতি বরকত উল্লাহ বুলু, গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরীসহ হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।