আর্জেন্টিনার সামনে রূপকথার কেপ ভার্দে
Printed Edition
ক্রীড়া ডেস্ক
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে কখনো কখনো ইতিহাস, আবেগ আর বাস্তবতার সংঘর্ষ এক ম্যাচেই ফুটে ওঠে। ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর অন্যতম আকর্ষণীয় লড়াইয়ে ঠিক এমনই এক দৃশ্যের অপেক্ষায় ফুটবল-দুনিয়া। মিয়ামিতে বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোর ৪টায় বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে বিশ্বকাপে নবাগত কেপ ভার্দে। মাত্র পঁাঁচ লাখের কিছু বেশি জনসংখ্যার এই দ্বীপরাষ্ট্র, ইতোমধ্যেই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় বিস্ময়। গ্রুপ পর্বের খেলায় নিজেদের শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ, সংগঠিত ফুটবল ও অবিশ্বাস্য মানসিক দৃঢ়তায় ইতিহাস গড়ে ফেলেছে আফ্রিকার ‘ব্লু শার্কস’রা।
আর্জেন্টিনা ও কেপ ভার্দে ভিন্ন দুই পথ পাড়ি দিয়ে শেষ ৩২-এ পেঁৗঁছেছে। মিয়ামিতে অনুষ্ঠিতব্য এই ম্যাচে স্বাভাবিকভাবেই ফেবারিট আর্জেন্টিনা। তবে বিশ্বকাপে প্রথমবার অংশ নেয়া কেপ ভার্দে কঠিন ‘এইচ’ গ্রুপে স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের বিপক্ষে অপরাজিত থেকে তিনটি ড্রয়ের মাধ্যমে ৩ পয়েন্ট সংগ্রহ করে রানার্সআপ হিসেবে নকআউটে জায়গা নিশ্চিত করে। স্পেনের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র এবং উরুগুয়ের বিপক্ষে ২-২ সমতা দলটির রক্ষণভাগের দৃঢ়তা ও লড়াকু মানসিকতার প্রমাণ দেয়। আর এই মূল কারিগর ছিলেন গোলরক্ষক ভোজিনহা। বিশ্বকাপ অভিষেকে এই গোলরক্ষকের দৃঢ়তায় নকআউটে জায়গা করে সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবেও রের্কড গড়ে কেপ ভার্দে।
অন্য দিকে আর্জেন্টিনা গ্রুপ পর্বে নিজেদের চেনা ছন্দেই খেলেছে। গ্রুপ ‘জে’-তে আধিপত্য বিস্তার করে আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডানকে হারিয়ে পূর্ণ ৯ পয়েন্ট নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নকআউটে ওঠে। এ ম্যাচে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি সম্ভবত ৪-৪-২ ছকেই দল সাজাবেন। গোলপোস্টে থাকবেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। রক্ষণে নাহুয়েল মোলিনা, ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও ফাকুন্দো মেদিনা। মাঝমাঠে রদ্রিগো দি পল, এনজো ফার্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও থিয়েগো আলমাদা। আর আক্রমণে লিওনেল মেসির সাথে থাকবেন লাউতারো মার্টিনেজ। রোমেরোর হাঁটুর সামান্য সমস্যা থাকলেও তাকে একাদশে রাখার সম্ভাবনাই বেশি। ফলে প্রায় পূর্ণশক্তির দল নিয়েই মাঠে নামতে যাচ্ছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
অন্য দিকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে মাঠে ৪-৫-১ ফরমেশনে দল সাজিয়ে রক্ষণকেই প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন কেপ ভার্দের কোচ বুবিস্তা। অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহার সামনে স্টিভেন মোরেইরা, পিকো, ডিনে ও সিডনি কাবরাল গড়বেন রক্ষণপ্রাচীর। কেভিন পিনা, ডেরয় দুয়ার্তে, জামিরো মন্টেইরো, উইলি সেমেদো ও রায়ান মেন্ডেসের দায়িত্ব থাকবে মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকানো। একমাত্র স্ট্রাইকার হিসেবে খেলবেন ডেইলন লিভরামেন্তো।
টেকটিক্যাল দিক থেকে ম্যাচটি বেশ আকর্ষণীয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। স্কালোনির পরিকল্পনা হবে ধৈর্য ধরে বলের দখল রাখা, মাঝমাঠে পাসের জাল বোনা এবং মেসির জন্য ফাঁকা জায়গা তৈরি করা। ডি পল ও এনজোর বল বিতরণ, ম্যাক অ্যালিস্টারের বক্সে প্রবেশ এবং থিয়াগো আলমাদার ড্রিবলিং কেপ ভার্দের জমাট রক্ষণ ভাঙার অন্যতম অস্ত্র হতে পারে। একই সাথে কর্নার ও ফ্রি কিক থেকেও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে আর্জেন্টিনা।
অন্য দিকে কেপ ভার্দে মাঝমাঠে পাঁচজন খেলোয়াড় রেখে জায়গা সঙ্কুচিত করা, মেসিকে দুই-তিনজন মিলে ঘিরে রাখা এবং বল হারানোর পর দ্রুত সবাইকে রক্ষণে ফিরিয়ে আনা, এটাই হবে তাদের প্রধান কৌশল। প্রয়োজন হলে ১০ জন খেলোয়াড় নিজেদের অর্ধে রেখে আর্জেন্টিনাকে বাইরে থেকে আক্রমণ করতে বাধ্য করবে তারা।
ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত দ্বৈরথ হবে মেসি বনাম কেপ ভার্দের রক্ষণ। কেভিন পিনা ও ডেরয় দুয়ার্তের প্রধান কাজ থাকবে মেসিকে সময় ও জায়গা না দেয়া। কিন্তু মেসি যদি একবার নিজের ছন্দ খুঁজে পান, তাহলে কেপ ভার্দের জন্য ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লড়াই হবে লাউতারো মার্টিনেজ ও গোলরক্ষক ভোজিনহার মধ্যে। ৪০ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক স্পেনের বিপক্ষে অসাধারণ পারফরম্যান্স করে আলোচনায় এসেছেন। তবে স্পেনের তুলনায় আর্জেন্টিনা আরো বৈচিত্র্যময় আক্রমণ গড়তে সক্ষম, যা তার কাজকে অনেক বেশি কঠিন করে তুলবে।
কেপ ভার্দে পাল্টা আক্রমণে রায়ান মেন্ডেস, জামিরো মন্টেইরো ও ডেইলন লিভরামেন্তোর গতির ওপর নির্ভর করবে। তবে পুরো টুর্নামেন্টেই তাদের বড় সমস্যা দেখা যায় গোল করার অক্ষমতা। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে সুযোগ তৈরি করা যেখানে কঠিন, সেখানে সেই সুযোগ কাজে লাগানো আরো বড় চ্যালেঞ্জ।
দুই দলের মধ্যে এটি প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। তাই পরিসংখ্যানগত কোনো অতীত নেই। ইতিহাস, অভিজ্ঞতা, স্কোয়াডের গভীরতা এবং ব্যক্তিগত মান বিবেচনায় আর্জেন্টিনাই স্পষ্ট ফেবারিট।