ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ আসামির রায় হতে পারে আগামী সপ্তাহে

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দমনে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে সশস্ত্র হামলা, প্ররোচনা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে করা মামলায় সাবেক সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হয়েছে। মামলাটি এখন রায় ঘোষণার চূড়ান্ত পর্যায়ে অপেক্ষমাণ রয়েছে। আগামী সপ্তাহের যেকোনো দিন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই মামলার রায় ঘোষণা করতে পারেন বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ট্রাইব্যুনালের নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে প্রসিকিউশনের কাজের হালনাগাদ তথ্য তুলে ধরে তিনি এসব কথা জানান। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘ওবায়দুল কাদেরসহ যে সাত আসামির বিচার চলছে, বিচারিক প্রক্রিয়ায় তাদের রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি চূড়ান্ত রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছে। আমরা আশা করছি, আগামী সপ্তাহের যেকোনো দিন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করবেন।’

মামলার অভিযুক্ত সাত আসামির সবাই বর্তমানে আত্মগোপনে বা পলাতক রয়েছেন। ওবায়দুল কাদের ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।

প্রসিকিউশনের দেয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র অনুযায়ী, গত বছরের জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার আন্দোলন নস্যাৎ করতে আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে উসকানিমূলক বক্তব্য, গণমাধ্যমে উসকানি প্রদান এবং সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীকে রাজপথে নামিয়ে কঠোর দমন-পীড়নের পরিকল্পনা ও নির্দেশ বাস্তবায়নে সরাসরি ভূমিকা রাখেন। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে দেশজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা, নির্বিচারে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়।

গত ১২ আগস্ট প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেন। রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে, তদন্ত প্রতিবেদন, নথিপত্র ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ‘সংশয়াতীতভাবে প্রমাণিত’ হয়েছে। ফলে আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক ও সর্বোচ্চ শাস্তি প্রার্থনা করা হয়।

অন্য দিকে, পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে সব আসামির নির্দোষ ও খালাস দাবি করেন। ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতের পক্ষে আইনজীবী এম হাসান ইমাম ট্রাইব্যুনালে দাবি করেন, তার মক্কেলরা কোনো ‘কমান্ডিং পজিশনে’ ছিলেন না এবং কাউকে হত্যার নির্দেশ দেননি। তৎকালীন পরিস্থিতিতে জানমাল সুরক্ষায় ‘শুট অ্যাট সাইট’ নির্দেশ প্রদান করা হয়েছিল। এ ছাড়া যুবলীগ ও ছাত্রলীগের চার আসামির পক্ষে আইনজীবী ইশরাত জাহান দাবি করেন, আন্দোলন দমনে কোনো ঘটনায় এই নেতাদের সরাসরি নাম আসেনি এবং উদ্ভূত বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কারণে অধস্তন কর্মীদের সামলানো তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।

নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র আমলে নেয়। এরপর চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-২ আসামিদের বিরুদ্ধে প্রথাগত অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। ১৭ ফেব্রুয়ারি সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন ও প্রথম সাক্ষী শহীদ আসিফ ইকবালের পিতা এম এ রাজ্জাকের সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে বিচারকার্য গড়ায়। তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৯ জন সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করেন। দুই দফায় সাক্ষ্য ও জেরা শেষে গত ১৭ আগস্ট বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২ মামলাটি রায় ঘোষণার জন্য সিএভি (অপেক্ষমাণ) রাখেন।

৬১ আলেম-ওলামা হত্যার বিচার হবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে

সংবাদ সম্মেলনে চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম জানান, ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারকার্য রাষ্ট্রপক্ষ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিচালনা করবে।

তিনি বলেন, ‘শাপলা চত্বরের ঘটনায় আলেম-ওলামাদের ওপর চালানো গণহত্যার মামলাটি আমরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তির পদক্ষেপ নিচ্ছি। এই মামলায় বর্তমানে ১১ জন আসামি কারাগারে রয়েছেন এবং পলাতক রয়েছেন ৩০ জন। পলাতক আসামিদের জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তির আইনি প্রক্রিয়া শেষেই প্রথাগত বিচার শুরু করা হবে।’

চিফ প্রসিকিউটর অভিযোগ করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ৬১ জন আলেমকে হত্যার ঘটনাটিকে ‘রং মেখে অভিনয়’ বলে আখ্যা দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা করেছিল। তবে ট্রাইব্যুনাল ধর্মপ্রাণ মানুষ ও দেশের গণদাবির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এই মামলার বিচার দ্রুত শেষ করতে বদ্ধপরিকর।

আরো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে

জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সহিংসতা ছড়ানো ও হত্যায় প্ররোচনা দেয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত কয়েকজন সাংবাদিকের বিচারের বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর জানান, তাদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সেলে অনুসন্ধান কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

প্রাথমিক সত্যতা ও সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে ইতোমধ্যেই তিনজন সাংবাদিককে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। সার্বিক তদন্ত শেষ হলে এবং অপরাধের প্রাথমিক উপাদান চূড়ান্ত হলে তাদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে প্রথাগত অভিযোগপত্র দাখিল করে বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলে প্রসিকিউশন থেকে জানানো হয়।

একই সাথে, প্রসিকিউশন অন্য একটি মামলার তদন্ত করার সময়ে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাথমিক তথ্য পেয়েছে উল্লেখ করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ওই সূত্র বা প্রমাণাদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত টাস্কফোর্সের তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে দ্রুত হস্তান্তর করা হবে।