গ্যাসসঙ্কটে আমদানিতে জোর

দীর্ঘমেয়াদি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের কার্যক্রম জোরদার হচ্ছে

Printed Edition

আশরাফুল ইসলাম

গ্যাসসঙ্কট মোকাবেলায় সরকার এলএনজি আমদানির ওপর জোর দিয়েছে। এ কারণে চলতি সেপ্টেম্বর ও আগামী অক্টোবরে পেট্রোবাংলা কয়েকটি কার্গোর সরবরাহসূচি নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি আগামী মাসের জন্য আরো চারটি স্পট এলএনজি কার্গো কেনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একই সাথে আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগও নিয়েছে। সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে নতুন কার্গো আসায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই হাজার ৩৩৩ মিলিয়ন ঘনফুটে। নতুন এলএনজি কার্গো আসার পর মহেশখালীর দু’টি টার্মিনাল থেকে সরবরাহ আরো বাড়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এতে শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বর মাসে এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে একাধিক কার্গোর সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। মাসের শুরুতেই একটি কার্গো মহেশখালীতে পৌঁছেছে। এরপর ধারাবাহিকভাবে সৌদি আরামকো, পসকো, গানভোর ও টোটালসহ বিভিন্ন সরবরাহকারীর কার্গো আসার কথা রয়েছে। এর আগে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছিল মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালকেন্দ্রিক নানা সমস্যায়। একটি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সরবরাহ ব্যাহত হয়। পরে টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হলেও কারিগরি সমস্যা ও এলএনজি মজুদের ঘাটতির কারণে সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যায় এবং শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে এর প্রভাব পড়ে। নতুন কার্গো আসায় সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশা, সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত কার্গোগুলো সময়মতো দেশে এলে এলএনজি সরবরাহে ধারাবাহিকতা ফিরবে।

এদিকে, গ্যাসসঙ্কট মোকাবেলায় এলএনজি আমদানি বাড়ানো হলেও এর সাথে বাড়ছে সরকারের ব্যয়ের চাপ। সাম্প্রতিক অনুমোদিত কয়েকটি কার্গোর মধ্যে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম প্রায় ২৩ দশমিক ৯৮ থেকে ২৮ দশমিক ০৩ ডলার পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশ্ববাজারের দামের ওঠানামা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে এলএনজি এখন জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তবে আমদানিনির্ভরতা বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে স্বল্পমেয়াদে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোকে গুরুত্ব দিতে হচ্ছে সরকারকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এলএনজি আমদানি সাময়িকভাবে সঙ্কট মোকাবেলায় কার্যকর হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। দেশের পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে আসছে। একই সাথে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও উৎপাদনে কাক্সিক্ষত গতি না থাকায় আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এ অবস্থায় সরকার নতুন কূপ খনন ও পুরনো কূপে ওয়ার্কওভারের উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায় ২ডি ও ৩ডি সিসমিক জরিপের মাধ্যমে নতুন গ্যাসের সম্ভাবনা অনুসন্ধানের পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছে।

অপরদিকে, গ্যাস সরবরাহের ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় মহেশখালী এলাকায় নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন টার্মিনাল চালু হলে জাতীয় গ্রিডে আরো প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যোগ হতে পারে। তবে নতুন অবকাঠামো তৈরি হলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গ্যাসের স্থায়ী নিরাপত্তার জন্য একই সাথে দেশীয় অনুসন্ধান, উৎপাদন বৃদ্ধি, সঞ্চালন অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং আমদানির বহুমুখীকরণ জরুরি। সব মিলিয়ে নতুন এলএনজি কার্গো আসায় আপাতত গ্যাস সরবরাহে স্বস্তির আভাস মিলেছে। তবে এই স্বস্তি কতটা টেকসই হবে, তা নির্ভর করবে এলএনজি সরবরাহের ধারাবাহিকতা, টার্মিনালগুলোর নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম এবং দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর সক্ষমতার ওপর।