বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬
লাল কার্ডের বাধা পেরিয়ে শেষ ষোলোতে যুক্তরাষ্ট্র
Printed Edition
- যুক্তরাষ্ট্র ২-০ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা
অসামান্য লড়াইয়ে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে ২-০ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই জয়ের সবচেয়ে বড় গল্প স্কোরলাইন নয়, বরং ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ডের পরও আসরের সহ আয়োজকদের অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তা। প্রায় ৩৫ মিনিট একজন কম নিয়ে খেলেও প্রতিপক্ষকে গোলের সুযোগ না দিয়ে উল্টো আরো একটি গোল করে ম্যাচ শেষ করেছে মাউরিসিও পচেত্তিনোর দল।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়েস্টন ম্যাককেনি মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন, ক্রিস্টিয়ান পুলিসিকের গতি ও সৃজনশীলতা বারবার সমস্যায় ফেলে বসনিয়ার রক্ষণকে। সেই চাপের ফল হিসেবে প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে গোল করেন ফোলারিন বালোগুন। এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় স্বাগতিকরা।
কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। ৬৫ মিনিটে একটি লম্বা পাসে বলের দখল নিতে গিয়ে বসনিয়ার ডিফেন্ডার তারিক মুহারেমোভিচের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন বালোগুন। প্রথমে রেফারি রাফায়েল ক্লাউস কোনো ফাউলই দেননি। পরে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (ভিআর) পরামর্শে রিপ্লে দেখে তিনি সিদ্ধান্ত বদলান। রিপ্লেতে দেখা যায়, বলে পৌঁছাতে গিয়ে বালোগুনের স্টাড মুহারেমোভিচের গোড়ালিতে আঘাত করে। ইচ্ছাকৃত না হলেও বিপজ্জনক খেলা হিসেবে বিবেচনা করে সরাসরি লাল কার্ড দেখানো হয় মার্কিন স্ট্রাইকারকে।
সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, ম্যাচের ভাগ্য হয়তো বদলে যাবে। কারণ বিশ্বকাপের মঞ্চে একজন কম নিয়ে প্রায় ৩৫ মিনিট টিকে থাকা মোটেও সহজ কাজ নয়। অতীতেও এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে বহুবার ভেঙে পড়তে দেখা গেছে। ২০১০ সালে ঘানার কাছে অতিরিক্ত সময়ে বিদায়, ২০১৪ সালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে হারের স্মৃতি কিংবা ২০২২ সালে নেদারল্যান্ডসের কাছে পরাজয়- সবই যেন ফিরে আসছিল মার্কিন সমর্থকদের মনে।
কিন্তু এবার শুরু থেকেই ভিন্ন এক দল যুক্তরাষ্ট্র। সংখ্যায় পিছিয়ে পড়েও তারা আতঙ্কিত হয়নি। বরং আরো সংগঠিত হয়ে ওঠে। মাঝমাঠে ম্যাককেনির নেতৃত্ব অবিরাম দৌড়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ব্যস্ত রাখেন পুলিসিক। আর মালিক টিলম্যান দুই প্রান্তে দারুণ পরিশ্রমী মনোভাব দেখিয়ে আক্রমণ ও রক্ষণ দুই দায়িত্বই পালন করেন। মার্কিন রক্ষণেও অসাধারণ দৃঢ়তা দেখান ক্রিস রিচার্ডস।
অন্য দিকে বসনিয়া সুযোগ বুঝে একের পর এক আক্রমণ চালায় এবং অতিরিক্ত ফরোয়ার্ড নামিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণ ভাঙার চেষ্টা করে তারা। কিন্তু মার্কিন ফুটবলাররা ধৈর্য হারাননি। অযথা বল ক্লিয়ার না করে সুযোগ বুঝে পাল্টা আক্রমণে ওঠেন, সময় নিয়ন্ত্রণ করেন এবং ম্যাচের গতি নিজেদের হাতেই রাখেন।
ম্যাচের শেষ দিকে আসে নির্ণায়ক মুহূর্ত। ৮২ মিনিটে সার্জিনিও ডেস্টকে বক্সের ঠিক বাইরে ফাউল করলে ফ্রি-কিক পায় যুক্তরাষ্ট্র। সেখান থেকে দুর্দান্ত বাঁকানো শটে বসনিয়ার গোলরক্ষক নিকোলা ভাসিলজকে পরাস্ত করেন জার্মানিতে জন্ম নেয়া মিডফিল্ডার মালিক টিলম্যান। গোলটিই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।
এই জয় শুধু শেষ ষোলো নিশ্চিত করেনি, বরং পচেত্তিনোর দলের মানসিক শক্তিরও প্রমাণ হয়েছে। তার দল কখনোই ভয় পেয়ে রক্ষণে গুটিয়ে যায়নি। বরং একজন কম নিয়েও সুযোগ পেলে আক্রমণে উঠেছে। এটাই দীর্ঘদিন ধরে পচেত্তিনোর দর্শন; নির্ভীক ফুটবল, নিরন্তর পরিশ্রম এবং শেষ বাঁশি পর্যন্ত লড়াই।
লাল কার্ডের কারণে শেষ ষোলোয় শক্তিশালী বেলজিয়ামের বিপক্ষে খেলতে পারবেন না বালোগুন, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধাক্কা। তার জায়গায় রিকার্ডো পেপি বা হাজি রাইটের একজনকে দেখা যেতে পারে। অন্য দিকে নাটকীয় প্রত্যাবর্তনে সেনেগালকে হারিয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ হিসেবে অপেক্ষা করছে আত্মবিশ্বাসী বেলজিয়ামও।
তবু বসনিয়ার বিপক্ষে এই ম্যাচটি একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে। তা হলো, এই যুক্তরাষ্ট্র আর অতীতের মতো চাপের মুখে ভেঙে পড়া দল নয়। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেদের পরিকল্পনায় অটল থাকা, শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ এবং সুযোগ কাজে লাগানোর সক্ষমতা দেখিয়ে তারা জানিয়ে দিয়েছে, ২০২৬ বিশ্বকাপে আরো বড় কিছু করার সামর্থ্য রয়েছে তাদের। ২০০২ বিশ্বকাপের পর এবারই প্রথম শেষ ১৬তে খেলতে যাচ্ছে মার্কিনীরা। সেবার জার্মানির কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রকে।