সমাবর্তনে অনুপস্থিত, গ্রাফিতিতে অমর চবির ৩ শিক্ষার্থী
Printed Edition
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ইতিহাসে বৃহত্তম সমাবর্তনের আনন্দঘন আবহের মধ্যে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে সমাজবিজ্ঞান অনুষদের পাশের দেয়ালে আঁকা একটি গ্রাফিতি। যখন হাজারো শিক্ষার্থী গাউন-টুপি পরে উচ্ছ্বাসে ভাসছেন, তখন এই দেয়ালচিত্র নীরবে স্মরণ করিয়ে দেয় আলোচিত তিন মেধাবী মুখকে। যারা এই উৎসবে শারীরিকভাবে না থাকলেও তাদের প্রতীকী উপস্থিতি ছুঁয়ে গেছে অনেকের হৃদয়।
সমাবর্তনের ঠিক পূর্বমুহূর্তে আঁকা এই গ্রাফিতিতে কালো গাউন, মাথায় টুপি এবং হাতে সনদসহ চিত্রিত হয়েছেন তিনজন।
এরা হলেন, ইতিহাস বিভাগের শহীদ শিক্ষার্থী হৃদয় চন্দ্র তরুয়া, একই বিভাগের ফরহাদ হোসাইন এবং পরিসংখ্যান বিভাগের ফাহিম আহমেদ পলাশ।
তাদের এই প্রতিকৃতি অনেককেই করেছে আবেগাপ্লুত, মনে করিয়ে দিয়েছে অর্জনের এই আনন্দ সবার জন্য নয়; কেউ কেউ ইতিহাস হয়ে ওঠেন, জাতির মুক্তির সংগ্রামে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে হয়ে যান আকাশের ধ্রুবতারা।
গত বছরের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের নির্মমতার শিকার হয়ে প্রাণ হারান হৃদয় ও ফরহাদ। অনাগত ভবিষ্যতের স্বপ্ন চোখে নিয়ে তারা দাঁড়িয়েছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে, কিন্তু বুলেটের আঘাতে স্তব্ধ হয়ে যায় তাদের পথচলা। অন্যদিকে, একই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর নোয়াখালীতে বন্যাদুর্গতদের সাহায্য করতে গিয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন ফাহিম আহমেদ পলাশ, রেখে যান মানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত।
যদি তারা বেঁচে থাকতেন, গত বুধবার হয়তো সহপাঠীদের সাথে হাসিমুখে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতেন, ভাগ করে নিতেন অর্জনের আনন্দ। হয়তো মা-বাবার হাত ধরে ঘুরে বেড়াতেন প্রিয় ক্যাম্পাসে। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা তাদের সেই সুযোগ দেয়নি।
সমাবর্তনে অংশ নেয়া বহু শিক্ষার্থীকে দেখা গেছে গ্রাফিতিটির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে, কেউ নীরবে অশ্রু ফেলেছেন, কেউবা নত মস্তকে স্মরণ করেছেন এই তিন তরুণকে। তাদের একজন বলেন, ‘এই সমাবর্তনে ফাহিমও থাকতে পারত। হৃদয়-ফরহাদ আমাদের সাথেই হাসত। তারা নেই, কিন্তু এই দেয়াল আমাদের চোখে আবার তাদের ফিরিয়ে এনেছে।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এই তিন তরুণ এখন আর শুধু নাম নয়, তারা এক অদম্য চেতনার প্রতিচ্ছবি, যেখানে শিক্ষা, সংগ্রাম, দায়িত্ববোধ আর প্রতিবাদের গল্প মিলেমিশে একাকার। দেয়ালের এই গ্রাফিতি তাই কেবল একটি শৈল্পিক নিদর্শন নয়, এটি স্মৃতির স্মারক, অদম্য সাহসের দলিল। যা যুগ থেকে যুগান্তরে জানান দেবে বাংলার দামাল ছেলেরা অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়াবার নয়, প্রয়োজনে জীবন দিতেও তারা কুণ্ঠাবোধ করে না।