ইউক্রেনযুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার

পুতিনের সাথে বৈঠকের পর ইউক্রেন সফরে মার্কিন দূত

Printed Edition
onno-1
ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করার লক্ষ্যে ক্রেমলিনে প্রেসিডেন্ট পুতিনের সাথে বৈঠক করছেন মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার : ইন্টারনেট

সিএনএন ও বিবিসি

ইউক্রেনের যুদ্ধ শেষ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেনের নতুন প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার মস্কোতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সাথে নিবিড় আলোচনা শেষ করে গতকাল রোববার কিয়েভে গেছেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইউক্রেনের রাজধানীতে এটিই তাদের প্রথম সফর এবং এই সফরটি এমন একসময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন ইউক্রেনের রাজধানীতে রাশিয়ার প্রায়-অবিরাম ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চলছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন যে, আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টরের তীব্র ঘাটতির কারণে ইউক্রেন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকিতে পড়েছে। জেলেনস্কি বলেন, মার্কিন দূতদের সাথে আলোচনার আগে তিনি তার আলোচনা দলের সাথে একটি বৈঠক করেছেন। তিনি টেলিগ্রামে লিখেছেন, ‘আমরা আলোচনার জন্য প্রস্তুত। ইউক্রেন সবসময়ই গঠনমূলক ছিল এবং থাকবে।

জেলেনস্কি আরো বলেন, ‘আমরা এই যুদ্ধের অবসান ঘটাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শান্তি প্রয়োজন। নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রয়োজন। একটি মর্যাদাপূর্ণ যুদ্ধোত্তর শান্তি প্রয়োজন। আমাদের প্রস্তাবগুলো প্রস্তুত।’ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের প্রধান কিরিলো বুদানভ বলেছেন যে, ফ্রান্স, ব্রিটেন ও জার্মানির প্রতিনিধিরাও কিয়েভে রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় ভরা একটি ব্যস্ত দিন আমাদের সামনে রয়েছে।’

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, মস্কো থেকে কিয়েভ যাওয়ার পথে উইটকফ এবং কুশনার পোল্যান্ডের রজেশো শহরে যাত্রাবিরতি করেন। বিমানটি স্থানীয় সময় রাত ১টা ৩১ মিনিটে অবতরণ করে। খবরে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রতিনিধিরা সম্ভবত ট্রেনে করে তাদের যাত্রা অব্যাহত রেখেছেন।

মার্কিন প্রতিনিধিদের সফরের সময়কালের জন্য রাশিয়া এবং ইউক্রেন ৭২ ঘণ্টার একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর করেছে, বিশেষত একে-অপরের রাজধানী কিয়েভ এবং মস্কোতে বিমান হামলা বন্ধ রেখেছে। এই হামলা বন্ধের সিদ্ধান্তটি শুক্রবার মধ্যরাত থেকে শনিবার ভোরে শুরু হয়েছে এবং কূটনৈতিক সপ্তাহান্তের পুরো সময় জুড়ে চলবে।

এই যুদ্ধবিরতি শুধু দু’টি রাজধানী শহরের জন্য প্রযোজ্য এবং রোববার ভোরে চালানো হামলায় রাশিয়া কিয়েভ শহর এড়িয়ে ইউক্রেনে বোমাবর্ষণ অব্যাহত রেখেছে। ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর মতে, রুশ বাহিনী রাশিয়া থেকে ১০৮টি শাহেদ-ধরনের ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যার সর্বশেষ হামলায় অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন এবং কিয়েভ অঞ্চলে অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইউক্রেন জুড়ে ১১টি স্থানে রুশ বিমান হামলা রেকর্ড করা হয়েছে এবং রুশ হামলার ফলে কিয়েভ অঞ্চলের একটি অবকাঠামো স্থাপনায় লাগা বড় আকারের আগুন নিভিয়ে ফেলা হয়েছে। শেষ ২৪ ঘণ্টায় মোট ১০ জন ইউক্রেনীয় বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং আরো ৬৫ জন আহত হয়েছেন।

উইটকফ এবং কুশনার শনিবার বিকেলে ক্রেমলিনে পুতিনের সাথে তিন ঘণ্টার বৈঠকের মাধ্যমে তাদের ঝটিকা কূটনৈতিক সপ্তাহান্ত শুরু করেন। ক্রেমলিনের এক সংবাদ সম্মেলন অনুসারে, আলোচনার পর রুশ নেতার সাথে নৈশভোজ অনুষ্ঠিত হয়। ক্রেমলিনের সহকারী ইউরি উশাকভ পরে এই আলোচনাকে ‘ফলপ্রসূ’ বলে বর্ণনা করেন এবং বলেন যে, আমেরিকান প্রতিনিধিরা ‘এই সফরের জন্য গুরুত্ব সহকারে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।’ তিনি বলেন, মার্কিন দলটি যত দ্রুত সম্ভব সঙ্ঘাত শেষ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং ‘মীমাংসার সম্ভাব্য পথগুলো নিয়ে একাধিক বিবেচনার প্রস্তাব দিয়েছে।’ হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা বলেছেন, উভয় পক্ষ ‘পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছে, যা আগামী সপ্তাহগুলোতে ঘোষণা করা হবে।’

সফরের মধ্য দিয়েই ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের চলমান প্রচেষ্টা নতুন গতি পেল। ক্রেমলিনের কেন্দ্রস্থলে অনুষ্ঠিত এই বৈঠককে পুতিনের উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ ‘গঠনমূলক ও খোলামেলা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, সঙ্ঘাতের মূল কারণগুলোর পাশাপাশি যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ বাহিনীর সাম্প্রতিক অগ্রগতি নিয়ে কথা হয়েছে। কেবল সঙ্কট সমাধানই নয়; বরং রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক লাভজনক একাধিক অর্থনৈতিক প্রকল্প নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে।

মস্কো থেকে ট্রাম্পের প্রতিনিধিরা ঠিক কোন পথে কিয়েভ যান, তা নিরাপত্তার স্বার্থে প্রকাশ করা হয়নি। আকাশপথে হামলা জোরদার হওয়ার কারণে ২০২২ সালের পর থেকেই আকাশসীমা বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে ক্ষেপণাস্ত্রের তীব্র ঘাটতির কারণে রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ইউক্রেনীয় বাহিনীকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিপরীতে মস্কোকে চাপে ফেলতে রাশিয়া ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে তেল স্থাপনা ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা বৃদ্ধি করেছে কিয়েভ। এ রকম এক উত্তপ্ত সামরিক পরিস্থিতির মধ্যেই শান্তি প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপে পা রাখলেন মার্কিন দূতেরা।