মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের সীতাকুণ্ড অংশে সুপার ডাইক নির্মাণ প্রকল্প আলোর পথে

Printed Edition
3rd-1
মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের সীতাকুণ্ড অংশে সুপার ডাইক নির্মাণ প্রকল্প আলোর পথে

এস এম রহমান পটিয়া-চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)

বঙ্গোপসাগরের মিরসরাই সীমানা হয়ে সন্দ্বীপ চ্যানেল এবং ফেনী নদীর মোহনা ঘেঁষে সোনাগাজীর ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলীয় এলাকাজুড়ে মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। বঙ্গোপসাগর বেষ্টিত চট্টগ্রামের মিরসরাই, সীতাকুণ্ড ও ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার প্রায় ৩৩ হাজার ৮০৫ একর জায়গা নিয়েই গঠিত হচ্ছে মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। এর মধ্যে মিরসরাই উপজেলার ২২ হাজার ৩৩৫ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত মিরসরাই অংশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল সুরক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রায় ১৮ কিলোমিটার টেকসই সুপার ডাইক নির্মাণ করে। বর্তমানে মিরসরাই জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে সীতাকণ্ড অর্থনৈতিক অঞ্চল পর্যন্ত সাগর উপকূলের প্রায় ১৩.৭৫ কিলোমিটার অরক্ষিত উপকূল সুরক্ষায় সুপার ডাইক নির্মাণ প্রকল্প আলোর পথে। ওই প্রকল্প বাস্তবায়নে নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৩০০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। বর্তমানে প্রকল্পটি পুনরায় মাঠপর্যায়ে নতুন করে সমীক্ষার কাজ করা হবে বলে জানিয়েছেন বাপাউবো কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সীমানা থেকেই সীতাকুণ্ড এবং সোনাগাজী (ফেনী নদীর ওপারে) অংশ যুক্ত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ সড়ক ও অবকাঠামো : পুরো ৩৩ হাজার ৮০৫ একর এলাকা নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট মাস্টারপ্ল্যানের মধ্যদিয়ে অভ্যন্তরীণ চার লেনের সড়ক, কেন্দ্রীয় ইউটিলিটি (গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি) এবং কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ করা হচ্ছে, যা বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) অধীনে ‘জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কাজ চলমান রয়েছে। মূলত বাপাউবো এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সুরক্ষায় ওই প্রকল্প প্রণয়ন করেন, যার লক্ষ্য হচ্ছে- ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলটির মাস্টারপ্ল্যানভুক্ত এলাকা সুরক্ষা দেয়া, সাগর থেকে ব্যবহারযোগ্য ভূমি উদ্ধার, জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে লবণপানির প্রবেশ রোধ, বন্যানিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা এবং শিল্পায়নের মাধ্যমে রফতানি আয় বৃদ্ধি এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন করার জন্যই সুপার ডাইক নির্মাণ প্রকল্প।

এ ছাড়া সুপারডাইকের ওপর মোটরেবল পেভমেন্ট নির্মাণের মাধ্যমে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর সাথে শিল্প এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ স্থাপন এবং সুপার ডাইকের বাইরে সাগরের উপকূলে ম্যানগ্রোভ বনায়নের মাধ্যমে উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী স্থাপন করার কাজ রয়েছে। আর এ প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে, জলোচ্ছ্বাস/সাইক্লোন থেকে প্রকল্প এলাকার জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং সরকারি ও বেসরকারি অবকাঠামো, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, কৃষি-অকৃষি জমি, ফসলাদি, জনসাধারণের সহায় সম্পত্তি ইত্যাদি রক্ষা পাবে। অন্য দিকে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে অন্তত ১৫ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সুফল পাবে বলে বলা হয়েছে।

মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল বা জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এনএসইজেড) সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হলে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে অঞ্চলটির অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন খাতের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে : বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল : মিরসরাইয়ের বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলটি সম্পূর্ণ চালু হলে সেখানে দীর্ঘমেয়াদে ২.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল সম্পূর্ণ চালু হলে ২.৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রত্যাশা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল বা বর্তমানে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত ও কার্যকর হলে দেশের জাতীয় জিডিপি (এউচ) প্রবৃদ্ধিতে ১ থেকে ১.৫ শতাংশ অতিরিক্ত অবদান রাখবে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও রফতানি আয় : এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে প্রতি বছর দেশের জিডিপিতে সরাসরি অবদান রাখার পাশাপাশি বার্ষিক প্রায় ১৫ থেকে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের পণ্য রফতানি করা সম্ভব হবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে ১৪ থেকে ১৫ লাখ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান।

জানা গেছে, ইতোমধ্যে বিপুল পরিমাণ দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে, যার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

সন্দ্বীপ সুরক্ষা কাজে ধীরগতি : দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপ সুরক্ষায় বা পাউবোর ৫৬২ কোটি ২১ লাল টাকার কাজ চলমান রয়েছে; কিন্তু কাজ চলমান অবস্থায় সাগর উপকূলে প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চর পড়ে যাওয়ার কারণে কাজের অগ্রগতি থমকে রয়েছে। ওই প্রকল্পের কাজের মধ্যে ৮.১৪ কিলোমিটার বাঁধ মেরামত ও ৪.২ কিলোমিটার প্রতিরক্ষা কাজ রয়েছে। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে জুন ২০২৭-এর মধ্যে; কিন্তু আগস্ট পর্যন্ত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১০ ভাগ।

যোগাযোগ করা হলে ওই প্রকল্পে নিয়োজিত বাপাউবো চট্টগ্রাম ডিভিশন-২-এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সৈয়দ আরশাদ আলী নয়া দিগন্তকে বলেন, কাজ চলমান অবস্থায় গাছতলি ঘাট পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার চর পড়ে যাওয়ার কারণে ওই পথে মালামাল পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অপর প্রান্ত মঘধরা গুপ্তছড়া ঘাট দিয়ে প্রকল্প এলাকায় প্রায় ৩০/৩৪ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিয়ে মালামাল আনতে হচ্ছে। তা ছাড়া একই ঘাট দিয়ে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালামাল আনতে হচ্ছে। সে কারণে ওই ঘাট দিয়ে মালামাল পরিবহনেও সময় বেশি লাঘছে। অপর দিকে জোয়ার বা বৈরী আবহাওয়ার কারণে ওই ঘাট দিয়ে দিনের পর দিন মালামাল পরিবহন বন্ধ হয়ে পড়ে। এ কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি হচ্ছে বলে তিনি জানান।

গতকাল যোগাযোগ করা হলে ওই ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. তানজির সাইফ আহমেদ বলেন, সন্দ্বীপ সুরক্ষা কাজের নকশা পরিবর্তন করা হচ্ছে এতে ওই প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে তিনি জানান। অপর দিকে মিরসরাই জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সুরক্ষা কাজের সাথে সঙ্গতি রেখে ইকোনমিক জোন সীতাকণ্ড অংশ সুরক্ষা প্রকল্প প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওই প্রকল্প বাস্তবায়নে পুনরায় সমীক্ষা করা হবে। তিনি বলেন ওই কাজ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে মিরসরই জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পূর্ণতা লাভ করবে এবং এর ফলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ১৪ থেকে ১৫ লাখ মানুষ লাভবান হবেন বলে তিনি জানান।