সাক্ষাৎকার : স্টিভ ব্যানন

যুক্তরাষ্ট্রে ‘পুরনো রাজনীতি শেষ’

Printed Edition
first-5
যুক্তরাষ্ট্রে ‘পুরনো রাজনীতি শেষ’

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ট্রাম্পের সাবেক হোয়াইট হাউজ প্রধান কৌশলী স্টিভ ব্যানন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র একটি রূপান্তরের রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে রয়েছে এবং উভয় দলের নেতৃত্বই অনেক পিছিয়ে পড়েছে। মার্কিন মুল্লুকে রাজনীতির চলমান রূপান্তর সঠিক প্রমাণিত হওয়ার পরও ডেমোক্র্যাটিক বা রিপাবলিকান নেতৃত্ব এই পরিবর্তন বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে। পুরনো রাজনীতির অবসান হওয়ায় তারা বুঝতে পারছেন না এর রাজনৈতিক জবাব কী হবে।

তৃণমূল পর্যায়ের উত্থান ও ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টদের প্রভাবে নিউ ইয়র্কে জোহরান মামদানি এবং ডেনভারের মেলাত কিরোসের মতো গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিকদের জয় একটি ‘বিপজ্জনক সঙ্কেত’। ব্যানন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে অর্থ বনাম ব্যক্তিগত সংযোগ, প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমের সমর্থন আর জেতার মূল চাবিকাঠি নয়। কুওমোর মতো শক্তিশালী প্রার্থীরা বিপুল অর্থ থাকা সত্ত্বেও তৃণমূল পর্যায়ের প্রচারণার কাছে হেরে গেছেন। বরং মাঠপর্যায়ের কৌশলে নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলো বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার এবং মানুষের সাথে ব্যক্তিগত সংযোগ স্থাপনের কৌশলকে নিখুঁত করে তুলেছে, যা ডেমোক্র্যাটিক এস্টাবলিশমেন্টের পক্ষে আবার তৈরি করা সম্ভব নয়। ব্যানন রাজনীতিতে এ ধরনের উত্থানকে বামপন্থীদের জন্য একটি ‘টি পার্টি মুহূর্ত’ এবং তা অত্যন্ত আদর্শবাদী এবং প্রতিষ্ঠানবিরোধী হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কেবল রাজনৈতিক বিরোধিতা যথেষ্ট নয়, বামপন্থীদের ‘বিনামূল্যে ভাড়া’ বা জনতুষ্টিবাদী নীতির বিপরীতে কেবল ‘এটা সম্ভব নয়’ বলা কোনো কার্যকর কৌশল নয়। বরং রিপাবলিকানদের উচিত নিজস্ব ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদী অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করা, যেখানে আবাসন সমস্যা সমাধান এবং পরিবারকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা যাবে।

সাক্ষাৎকারে ব্যানন বলেন, নির্বাচনে জয়ী হতে হলে ট্রাম্পের মূল সমর্থক গোষ্ঠী, যারা সাধারণত ভোটকেন্দ্রে কম যান, তাদের ব্যাপকভাবে ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। পুরনো ইস্যুর অসারতা হিসেবে তিনি বলেন, যারা এখনো কেবল কর ছাড় এবং বৈদেশিক যুদ্ধের মতো পুরনো ইস্যু নিয়ে রাজনীতি করছেন, তাদের ‘সর্বনাশ হয়ে গেছে’। কারণ ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে আমেরিকা এখন ‘চতুর্থ সন্ধিক্ষণে’ রয়েছে।

রাজনৈতিক পূর্বাভাস দিয়ে ব্যানন বলেন, রাজনীতিতে নতুন শক্তির উত্থান হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অলিগার্কদের প্রভাব এবং আদর্শিক লড়াই রাজনীতির সংজ্ঞাকে নতুন করে লিখবে। রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজন হিসেবে তিনি পুঁজিবাদের সুবিধা কেবল একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে সীমাবদ্ধ না থাকার দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করেন। একই সাথে বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলোকে ভেঙে দেয়া এবং সাধারণ মানুষের জন্য প্রকৃত অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি হিসেবে অভিমত দেন।

ব্যানন বলেন, আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক এই ঢেউ বা নতুন শক্তিগুলো চূড়ান্ত ক্ষমতা লাভ করতে পারে যদি প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা এখনই সচেতন না হয়। তার ভাষায়, যারা কঠিন লড়াই এবং আমূল পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত নয়, রাজনীতি তাদের জন্য আর সঠিক পেশা নয়।

মঙ্গলবার এক সাক্ষাৎকারে ব্যানন বলেন,

‘আমরা এক নতুন রাজনীতির মুখোমুখি। আমরা আমাদের চোখের সামনেই পুরনো রাজনীতির মৃত্যু দেখছি। আপনারা দেখছেন এটা আপনাদের চোখের সামনেই পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।’

স্টিভ ব্যানন ২০১৭ সালে প্রশাসনের প্রথম সাত মাস মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রধান হোয়াইট হাউজ কৌশলবিদ এবং সিনিয়র উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ব্রাইটবার্ট নিউজের প্রাক্তন নির্বাহী চেয়ারম্যান, তিনি একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক কৌশলবিদ এবং ‘ওয়ার রুম’ পডকাস্টের সঞ্চালক।

পলিটিকো : মামদানির জয় ডানপন্থীদের জন্য একটি ‘বিপজ্জনক সঙ্কত’ বলেছিলেন। জনতুষ্টিবাদী বামপন্থীরা শুধু নিউ ইয়র্কেই নয়, কলোরাডোতেও অর্থাৎ আমেরিকার পশ্চিমে জয়ী হচ্ছে। নিউ ইয়র্কের প্রাইমারির ফলাফলের চেয়ে কোন বিষয়টি এটিকে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে?

ব্যানন : যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক মহলকে বুঝতে হবে যে, এটা শুধু নিউ ইয়র্ক সিটি নয়, এটা শুধু ম্যানহাটনের কেন্দ্রস্থল নয়, এটা শুধু বিভিন্ন বরোর অভিবাসী বা অবৈধ বিদেশীদের বিষয়ও নয়, এটা দেশব্যাপী হতে চলেছে। হ্যাঁ, স্পষ্টতই, এটা ডেনভার। এটি অন্যতম উদারপন্থী শহরগুলোর একটি, কিন্তু এটি এখনো আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চল। এটি এখনো কলোরাডো।

যখন আমি দাতাদের সাথে আসন্ন পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়েছিলাম, তারা আমার মুখের ওপর হেসেছিল। তারা বলল, ‘আপনি ডেমোক্র্যাটিক রাজনীতি বোঝেন না, আপনি বোঝেন না যে (নিউ ইয়র্কের সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু) কুওমোর কাছে ৪০ মিলিয়ন ডলার আছে, যে কুওমোর সাথে নিউ ইয়র্ক পোস্ট এবং নিউ ইয়র্ক টাইমসের সমর্থন আছে, তার সাথে সব বড় ইহুদি সংগঠন, ক্যাথলিক চার্চ, দমকলকর্মী, পুলিশ, সবার সমর্থন আছে।’ কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি যে মামদানির এক হাজার লোক, যারা বিভিন্ন বরোতে, কুইন্স, ব্রঙ্কস এবং ব্রুকলিনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার চালাচ্ছে, এটাই সবকিছু নির্ধারণ করবে।’ তারা হেসে বলেছিল আমাদের কাছে ৪০ মিলিয়ন ডলার আছে এবং ফক্স নিউজ আমাদের পক্ষে। অথচ কুওমো বাজেভাবে হেরে গেলেন।

মানুষ বোঝে না যে তারা আসলে ওবামা এবং ট্রাম্পের কৌশলই অনুসরণ করছে। আধুনিক রাজনীতি আপনাকে দেখিয়ে দেয় যে এটা টাকার বিষয় নয়। এটা হলো মানুষের ভোটারদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে সংযোগ স্থাপন। তাদের গতি আছে কারণ তারা তাদের বার্তার মাধ্যমে মানুষকে সম্পৃক্ত করে।

এই লোকেরা এটা বিশ্বাস করে, এবং তারা মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে ও তাদের ধারণাগুলো মানুষের কাছে বিক্রি করতে অসাধারণ প্রচেষ্টা চালাতেও প্রস্তুত, আর আধুনিক রাজনীতিতে এটাই হলো আসল মুদ্রা। আপনার টাকা শুধু যে আপনাকে সাহায্য করবে না তাই নয়, বরং তা আপনার বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হবে। আর্থিকভাবে তারা সবখানেই পিছিয়ে পড়েছে। তাতে কিছু যায় আসে না।

পলিটিকো : ‘প্রচলিত রাজনীতি’ কিভাবে বদলে গেছে?

ব্যানন : (ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টরা) একটি জাতীয় শক্তি এবং তারা পর্দার আড়ালে থেকে একটি মাঠপর্যায়ের কৌশল ও প্রচার অভিযানকে নিখুঁত করে তুলেছে। ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে যা সম্ভব হচ্ছে না। রিপাবলিকানদের এটা বললে তারা মামদানিকে একটি ক্ষণস্থায়ী তারকা বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। নিউ ইয়র্কে মামদানি জিতলেও তিনি কখনোই কংগ্রেসের আসন বা ফেডারেল পদে জিততে পারবেন না বলেছিলেন। অথচ তারা তিনটি পেয়েছে।

পলিটিকো : ডেমোক্র্যাটদের জন্য এটি কি ট্রাম্পের মুহূর্ত, নাকি টি পার্টির মুহূর্ত?

ব্যানন : ট্রাম্প বরং একজন বিঘœ সৃষ্টিকারী। এটি তাদের জন্য টি পার্টির মুহূর্ত। কিন্তু মনে রাখবেন: টি পার্টিকে সাথে সাথেই নিজেদের দলে ভিড়িয়ে নেয়া হয়েছিল, কারণ এটি ছিল ওবামার বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়া, বেলআউটের বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়া এবং ২০০৮ সালের আর্থিক সঙ্কটের বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়া। এই কারণেই আমি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলাম, কারণ আমি শুরুতেই বুঝতে পেরেছিলাম যে এটি ছিল এক আদি-জনপ্রিয়তাবাদী আন্দোলন। কিন্তু কচ পরিবার (যুক্তরাষ্ট্রের ধনাঢ্য শিল্প পরিবার যাদের এক শ’ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ রয়েছে) ‘আমেরিকানস ফর প্রসপারিটি’ নিয়ে সাথে সাথেই এসে একে এর যুদ্ধবিরোধী, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ও আরো জাতীয়তাবাদী নীতিগুলো থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। না, এটি এমন একটি টি পার্টি যা আরো বেশি আদর্শবাদী কিন্তু তা আদর্শ জনপ্রিয়তাবাদ নয়। এটি একটি মার্ক্সবাদী, জিহাদি আন্দোলন, এবং তারা থামবে না।

পলিটিকো : এই প্রার্থীরা কি সত্যিই আদর্শের জোরে জিতছেন নাকি প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা ও ওয়াশিংটনের প্রতি বিতৃষ্ণার কারণে?

ব্যানন : তাদের নীতিগুলো এক ধরনের বামপন্থী, উচ্ছ্বসিত জনপ্রিয়তাবাদ। তারা প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হিসেবে প্রচারণা চালায়। খুব চতুরতার সাথে, তাদের প্রচারণার দিকে তাকান, মনে হবে ট্রাম্পকে নিয়ে প্রচারণাই চালাচ্ছে না। তার নাম উল্লেখ করা হয়। এটা খুবই পরিশীলিত এবং স্পষ্টতই এর প্রভাব পড়ছে।

পলিটিকো : প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘কমিউনিস্ট’ হুমকির কথা বলছেন।

ব্যানন : সঠিকভাবে রাজনৈতিক উপস্থাপন বা মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করতে হবে। রিপাবলিকান পার্টির পরামর্শক শ্রেণী সবসময় ঘুমিয়ে থাকে এবং অপ্রস্তুত অবস্থায় ধরা পড়ে। মামদানিকে হারাতে হলে, ভোটারদের সাথে তীব্র, চলমান এবং ব্যাপক সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনতে হবে। রিপাবলিকানদের বাঁচানোর এটা একমাত্র উপায়, নইলে আপনারা দিশেহারা হয়ে পড়বেন। মানুষকে একটি বিকল্প দিতে হবে। আপনি যদি শুধু বসে থেকে শয়তানের মতো চিত্রিত করেন, তবে তা অবশ্যই যথেষ্ট নয়।

পলিটিকো : ২০২৮ সালে এই জনতুষ্টিবাদী মুহূর্তটি উভয় পক্ষের জন্য কিভাবে প্রভাব ফেলবে?

ব্যানন : ‘২৮ সাল নিয়ে চিন্তা করবেন না। আমরা একটি নতুন রাজনীতির মুখোমুখি হচ্ছি। আমরা আমাদের চোখের সামনে পুরনো রাজনীতির মৃত্যু দেখতে পাচ্ছি। আপনার চোখের সামনেই সবকিছু পুড়ে ছাই হতে দেখছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অলিগার্করা এবং এই ধরনের মার্ক্সবাদী জিহাদিদের হুমকি রাজনীতির সংজ্ঞা নতুন করে দেবে এবং যারা এর মোকাবেলা করতে প্রস্তুত, আপনি তাদের উত্থান দেখতে পাবেন। যদি আপনারা সর্বত্র কর ছাড় ও যুদ্ধের পুরনো রাজনীতি খেলেন এবং ইসরাইলের হয়ে কাজ করেন, তাহলে আমি সোজাসুজি বলছি আপনাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে। মনে রাখবেন ৮০ শতাংশ মানুষের এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় কার্যত কোনো অংশগ্রহণ নেই।