ট্রাইব্যুনালে হাসিনুরের গুমকক্ষের সাক্ষ্য
‘সাধারণ সৈনিক দ্বারা এমন অমানবিক আচরণ আমি মেনে নিতে পারিনি’
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
‘আমি সেনাবাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। আমার কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে তিনটি পদক বীর প্রতীক, বাংলাদেশ রাইফেল পদক ও বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল প্রাপ্ত হই। কিন্তু গুম থাকা অবস্থায় আমার সাথে সাধারণ সৈনিক দ্বারা এমন অমানবিক ও লজ্জাজনক আচরণ করা হয়েছে যা আমি মেনে নিতে পারিনি।’
গুমের শিকার সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমানের জবানবন্দীতে উঠে এসেছে ‘আয়নাঘর’ ও ইন্টারোগেশন সেলে কাটানো এমন সব বীভৎস বর্ণনা। জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার (জেআইসি) বা আয়নাঘরে গুম-নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দ্বিতীয় দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ ছিল গতকাল রোববার। এদিন দ্বিতীয় নম্বর সাক্ষী হিসেবে হাসিনুর রহমানের এই জবানবন্দী রেকর্ড করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। প্যানেলের বাকি সদস্যরা হলেন বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
জবানবন্দীর শুরুতে প্রথম দফায় গুমের বর্ণনা দিয়ে হাসিনুর রহমান বলেন, আমার নাম মো: হাসিনুর রহমান (বীর প্রতীক)। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে কর্মরত থাকা অবস্থায় ২০১১ সালের ৯ জুলাই আমি প্রথমবার গুম হই। তখন আমি ময়মনসিংহ সেনানিবাসে কর্মরত ছিলাম।
রাত ১০টার দিকে আমি যখন অফিসে কাজ করছিলাম, তখন কর্নেল আক্তার হামিদ খান ঢাকা থেকে ময়মনসিংহে যান। ব্রিগেডিয়ার মোস্তফা আমাকে জানান যে, কর্নেল হামিদ আমার সাথে কথা বলবেন। এরপর আমাকে জোরপূর্বক আটক করে গাড়িতে তুলে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। ঢাকার আর্মি ইন্টারোগেশন সেলে ৪৩ দিন চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় আমাকে মেঝেতে ফেলে রাখা হয়। ৪৩ দিন পর আমাকে অফিসার্স মেসে নিয়ে আসা হয়; তবে এই দীর্ঘ সময়ে আমার পরিবারকে কিছুই জানতে দেয়া হয়নি।
পরবর্তীতে আমার বিরুদ্ধে কোর্ট অব ইনকোয়ারি ও কোর্ট মার্শাল করে চার বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। আমার বিরুদ্ধে ‘হরকাতুল জিহাদ’ নামক সংগঠনের সাথে জড়িত থাকার মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছিল। আমি ওই দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করলেও তা দীর্ঘ সময় নিষ্পত্তি হয়নি। ২০১৪ সালে জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া সেনাপ্রধান নিযুক্ত হওয়ার পর তার নির্দেশে আমি মুক্তি পাই।
মুক্তি পাওয়ার পর আমি বাসাতেই অবস্থান করছিলাম। ২০১৬ সালে ব্রিগেডিয়ার আযমী এবং ২০১৮ সালে কূটনীতিক ক্যাপ্টেন মারুফ জামান ও মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল চৌধুরী গুম হওয়ার পর আমি নিজেও আবার গুম হওয়ার আশঙ্কায় সতর্ক থাকতাম।
অবশেষে ২০১৮ সালের ৮ আগস্ট আমাকে দ্বিতীয়বার গুম করা হয় এবং ২০২০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্তি দেয়া হয়। এই পুরো সময় আমাকে ডিজিএফআইয়ের ‘আয়নাঘর’-এ বন্দী রাখা হয়েছিল।
অপহরণের দ্বিতীয় পর্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, সেদিন সন্ধ্যায় আমার বন্ধু লে. কর্নেল যায়েদ আব্দুল্লাহ আমার বাসায় আসেন এবং বাইরে ঘুরতে যাওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। আমি তার সাথে বের হই। মিরপুর ডিওএইচএস এলাকায় প্রায় দুই ঘণ্টা ঘোরার পর আমরা মেজর মহসীনের বাসায় যাই। রাত ১০টার পর সেখান থেকে বের হয়ে রাস্তায় ৮-১০ জন লোক দেখতে পাই। আমার ঠিক পেছনেই যায়েদ আব্দুল্লাহ ছিলেন। তারা আমার দিকে অগ্রসর হতে থাকলে আমি পেছন ফিরে দেখি যায়েদ আব্দুল্লাহ সেখানে নেই। পাশে আমার শ্যালিকার বাসার কেয়ারটেকার সেকান্দার ও মুক্তারকে আমি সাহায্যার্থে ডাকি।
আমি আমার লাইসেন্সকৃত অস্ত্র দেখিয়ে আগন্তুকদের হাত উঁচু করতে বললে তারা হাত উঁচু করে। আমি তাদের একটি মাইক্রোবাসের দিকে নেয়ার চেষ্টা করি। এ সময় সেখানে আরো চারটি মাইক্রোবাস প্রবেশ করে। আমি কেয়ারটেকার মুক্তারকে মাইক্রোবাসের ছবি তুলতে বললে তারা তাকে ‘শক বাটন’ দিয়ে আঘাত করে জোর করে গাড়িতে তুলে নেয়। সে চিৎকার করতে থাকে এবং সেকান্দার ভয়ে পিছিয়ে যায়। এ সময় পেছন থেকে আসা মাইক্রোবাসের কয়েকজন ব্যক্তি আমার কোমরে (যেখানে আগে থেকেই ব্যথা ছিল) প্রচণ্ড আঘাত করে। ৫-৭ জন আমাকে ঝাপটে ধরে। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তারা আমাকে জোর করে একটি মাইক্রোবাসে তুলে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দেয় এবং চোখে ব্লাইন্ডফোল্ড ও মাথায় জমটুপি পরিয়ে দেয়। ২০-২৫ মিনিট গাড়ি চলার পর আমাকে একটি গেটের ভেতরে নিয়ে অন্য এক পক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
আয়নাঘরে বন্দী ও নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে হাসিনুর রহমান বলেন, প্রচণ্ড মারধরে আমি নিস্তেজ হয়ে পড়লে তারা আমাকে একটি রুমে নিয়ে যায়। সেখানে ৪-৫ জন মুখোশধারী ব্যক্তিকে দেখতে পাই। রুমটি ছিল ৮-১০ ফুটের, অত্যন্ত নোংরা ও স্যাঁতসেঁতে। ভেতরে হাইভোল্টেজ বাল্ব জ্বলছিল এবং দেয়ালের গায়ে রক্ত দিয়ে মোবাইল নম্বর লেখা ছিল। অসহ্য গরমে আমি অস্থির হয়ে পড়ছিলাম। আধা ঘণ্টা পর আবার আমাকে হ্যান্ডকাফ ও জমটুপি পরিয়ে একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আমাকে চেয়ারের সাথে হাত-পা বেঁধে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়।
জিজ্ঞাসাবাদকারীর বাচনভঙ্গি শুনে মনে হচ্ছিল তিনি উচ্চপদস্থ কোনো সেনা কর্মকর্তা। তিনি আমার ফেসবুকের পাসওয়ার্ড ও আইডি জানতে চান এবং আমি কেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে লেখালেখি করি, তা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। আমাকে গুম করে ফেলার হুমকি দেয়া হয়। আমি কোথায় আছি জিজ্ঞেস করলে আমি অনুমান করে বলি, ‘আমি ডিজিএফআই সদর দফতর বা ঢাকা ডিটাচমেন্ট পোস্ট অফিস এলাকায় আছি।’ তখন পাশ থেকে একজন বলে ওঠেন, ‘আপনি এখন আয়নাঘরে আছেন।’ এরপর আমাকে মারধর ও ইলেকট্রিক শক দেয়া হয়।
পরদিন আবার জিজ্ঞাসাবাদে আমাকে প্রশ্ন করা হয় কেন আমি ২০১৪ সালের নির্বাচন এবং ভারত ও আওয়ামী লীগ সম্পর্কে নেতিবাচক লেখালেখি করি। আমাকে জানানো হয়, সরকারের নির্দেশেই আমাকে এখানে আনা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে বলা হয়, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আপনাকে এখানে আনা হয়েছে, কথা না শুনলে গায়েব করে দেয়া হবে।’
শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে আমি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলি এবং এর প্রতিবাদে সাত দিন অনশন করি। অনশনের ফলে আমার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে জানানো হয়, নির্বাচনের আগে আমাকে ছাড়া হবে না। তারা দাবি করে, ফেসবুকে আমার অনেক অনুসারী থাকায় আমি সরকারের জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ’।
শারীরিক অসুস্থতা ও বন্দিশালার চিত্র বর্ণনা করতে গিয়ে হাসিনুর রহমান বলেন, এক পর্যায়ে আমি হৃদরোগে (হার্ট অ্যাটাক) আক্রান্ত হই। আমার স্ত্রী ক্যান্সার আক্রান্ত এবং তিন কন্যাসন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। হার্ট অ্যাটাকের পর সেখানে ডাক্তার এনে ইসিজি ও চিকিৎসা করা হলেও আমার চোখ ও হাত বাঁধা ছিল।
আমাকে পরবর্তীতে এমন একটি রুমে স্থানান্তর করা হয় যেখানে বিশাল আকৃতির দু’টি একজস্ট ফ্যান ছিল, যাতে বন্দীদের কান্নার শব্দ বাইরে না যায়। সেখানে ১০টি রুম ছিল এবং প্রায়ই বন্দীদের আর্তচিৎকার শোনা যেত। অনেককে হত্যার উদ্দেশ্যে র্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হতো।
অবস্থান শনাক্তকরণ প্রসঙ্গে হাসিনুর রহমান বলেন, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে বাথরুমে যাওয়ার সময় আমি ব্রিগেডিয়ার আযমীকে দেখে ফেলি। আমাদের চোখ বাঁধার কাপড়টি ঢিলেঢালা থাকায় আমি তাকে চিনতে পারি। এ ছাড়াও আমি সেখানে মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল চৌধুরী এবং সাবেক কূটনীতিক ক্যাপ্টেন মারুফ জামানকেও দেখি।
একজন অপারেশন অফিসার হিসেবে ঢাকা সেনানিবাসের প্রতিটি এলাকা আমার চেনা ছিল। আমার বাসা ছিল আয়নাঘর থেকে মাত্র ১৫০ গজ দূরে। পাশের মসজিদগুলোর আজান, পুরনো বিমানবন্দর থেকে উড়োজাহাজ ওঠা-নামার শব্দ এবং বনানী রেলক্রসিংয়ের ট্রেনের শব্দ শুনে আমি নিশ্চিত হই যে আমি ঢাকা সেনানিবাসের ভেতর ডিজিএফআই সদর দফতরের পাশের এলাকাতেই বন্দী আছি। এ ছাড়া আমাদের দেয়া বই ও ওষুধের ওপর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিল (যা ফ্লুইড দিয়ে মোছার চেষ্টা করা হয়েছিল) দেখে আমার ধারণা নিশ্চিত হয়।
প্রহরীরা এই স্থানটিকে ‘আয়নাঘর’ বলে ডাকত। এটি মূলত ডিজিএফআই সদর দফতরের ১৪ তলা ভবনের দক্ষিণ পাশে এবং স্টেশন অফিসার্স মেস-বি এর উত্তরে অবস্থিত। পশ্চিমে মেকানিক্যাল ট্রান্সপোর্ট শেড এবং পূর্বে লগ এরিয়া স্টেশন সদর দফতর। আমাদের অত্যন্ত নি¤œমানের খাবার দেয়া হতো এবং বিছানা-বালিশ ছিল ছারপোকায় ভরা। সবসময় ‘ক্রসফায়ার’-এর ভয় দেখিয়ে আমাদের আতঙ্কে রাখা হতো। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমি বাথরুমের একটি ছিদ্র দিয়ে কালো পোশাকধারী র্যাব সদস্যদেরও সেখানে যাতায়াত করতে দেখি।