চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে
সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রদূত
Printed Edition
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে উল্লেখ করে দেশটির রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরে দু’ দেশের সম্পর্ককে ‘চায়না-বাংলাদেশ কমিউনিটি উইথ শেয়ার্ড ফিউচার’ হিসেবে উন্নীত করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। চীনের সাথে বিশ্বের ২০টি দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই সম্পর্ক রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের পর বাংলাদেশ এই তালিকায় এলো। দুই দেশের নেতাদের অর্জিত ঐকমত্য বাস্তবায়নের মাধ্যমে আগামী দিনে এই সম্পর্ক আরো গভীর ও ফলপ্রসূ হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরের ওপর গতকাল রাজধানীর বারিধারায় চীনা দূতাবাসে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রদূত এ সব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী গত ২৩ থেকে ২৬ জুন চীন সফর করেন। তিনি দালিয়ানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বার্ষিক সভা সামার দাভোসে অংশগ্রহণের পাশাপাশি বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিং, প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাউ লেজির সাথে বৈঠক করেন। এ ছাড়া দেশটির ব্যবসায়ী নেতারা তার সাথে সাক্ষাৎ করেন।
রাষ্ট্রদূত বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই প্রথম চীন সফর। বাংলাদেশের নতুন সরকার গঠনের পর দুই দেশের নেতাদের মধ্যে প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে। এটি একটি ‘পূর্ণাঙ্গ সফল’ সফর। এই সফর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে শক্তিশালী গতি সঞ্চার করেছে এবং চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা পরবর্তী পর্যায়ের নেয়ার জন্য একটি মজবুত ভিত্তি স্থাপন করেছে। উভয় পক্ষ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে মতবিনিময় করেছে, একাধিক সহযোগিতা দলিলে স্বাক্ষর প্রত্যক্ষ করেছে এবং একটি যৌথ ইশতেহার জারি করেছে। তিনি বলেন, উভয় দেশ উচ্চ পর্যায়ে মতবিনিময় বজায় রাখতে, সরকার, আইনসভা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করতে, দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে একটি কৌশলগত সংলাপ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি ২+২ সংলাপ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উপায় খতিয়ে দেখতে সম্মত হয়েছে।
রাষ্ট্রদূত ইয়াও বলেন, চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে বিস্তৃত সহযোগিতা রয়েছে। ২+২ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে উভয় দেশের কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা খাতের মধ্যে আরো সমন্বয় সাধন করা হবে। এর মাধ্যমে আমাদের কৌশলগত যোগাযোগ, পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা বাড়বে। কোন পর্যায়ে এবং কিভাবে ২+২ সংলাপ হবে, তা নিয়ে সামনের দিনগুলোতে আলোচনা চলবে। তিনি বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস, ইন্দোনেশিয়া এবং থাইল্যান্ডের সাথে চীনের ২+২ সংলাপের প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। আর এমন প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশের দিক থেকে প্রথম না। কয়েক সপ্তাহ আগে তুরস্কের সাথে মন্ত্রী পর্যায়ে কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা খাতে ২+২ সংলাপ করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর ঘিরে বেইজিং থেকে বাংলাদেশের জে-১০সি যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ইয়াও ওয়েন বলেন, যৌথ ইশতেহারে উভয় দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গভীর করার বিষয়ে একমত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে সামরিক বাহিনীর মধ্যে আলোচনা, সফর ও প্রশিক্ষণ। জাতিসঙ্ঘের শান্তিরক্ষা মিশন নিয়ে উভয় পক্ষ পারস্পরিক বোঝাপড়া ও যোগাযোগ বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের সহযোগিতা খুবই সমন্বিত। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা তারই অংশ। তবে কোনো নির্দিষ্ট কেনাকাটার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দেয়ার মতো জায়গায় আমি নেই।
চীনের সহযোগিতায় তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারতের উদ্বেগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে রাষ্ট্রদূত বলেন, তিস্তা প্রকল্প নিয়ে চীনের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। বাংলাদেশের অনুরোধে তিস্তা প্রকল্পে চীন কাজ করবে। চীন তাদের সামর্থ্যরে মধ্যে থেকে এই প্রকল্পে বাংলাদেশকে দেয়া সহায়তা অব্যাহত রাখবে। এর বাইরে অন্য কোনো ইস্যু আমাদের ভাবনার বিষয় নয়। তিনি বলেন, তিস্তা একটি বাংলাদেশী প্রকল্প। এ প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশ যত দ্রুত চাইবে, চীন তত দ্রুতই এগোবে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাবটি নতুন নয়। প্রায় ১৫ বছর আগে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও অগ্রগতি হয়নি। বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রসারের লক্ষে বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরকে এগিয়ে নিতে চীন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ভারত ও অন্যান্য দেশ চাইলে এই উদ্যোগে যোগ দেয়ার সুযোগ উন্মুক্ত রয়েছে।
প্রস্তাবিত করিডোরটিকে বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন কৌশলগত সুযোগ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, চীন ও বাংলাদেশ সরাসরি সংযোগসহ বৃহত্তর আঞ্চলিক সংযোগ উদ্যোগগুলো খতিয়ে দেখতে সম্মত হয়েছে।
ইয়াও ওয়েন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর কৌশলগত আস্থার এক নতুন মাত্রা তৈরি করেছে। উভয় দেশ একে অপরের মূল স্বার্থ ও প্রধান উদ্বেগের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। চীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও ভূখণ্ডের অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছে। চীন প্রথম দেশ হিসেবে একটি আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় দলিলে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির প্রতি সমর্থন অন্তর্ভুক্ত করেছে। বাংলাদেশ ‘এক চীন’ নীতির প্রতি অঙ্গীকার এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা পুনর্ব্যক্ত করেছে। চীন যেকোনো দেশে যেকোনো ধরনের বিদেশী হস্তক্ষেপের ঘোর বিরোধী।