শিশু আয়মান হত্যা মামলার তদন্তে রহস্যজনক গড়িমসি

Printed Edition

- ৭ মাসেও হত্যাকাণ্ডের কু উদঘাটন হয়নি

- ঘুষে ময়নাতদন্ত প্রভাবিত করার অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

পাঁচ দিন নিখোঁজ থাকার পর পরিত্যক্ত পুকুরপাড় থেকে অর্ধগলিত ও খণ্ডিত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া পাঁচ বছরের শিশু আয়মান সাদাফের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার তদন্তে পাগলা থানা পুলিশের বিরুদ্ধে রহস্যজনক গড়িমসির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের ৭ মাস পার হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। এই মামলায় উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এ ঘটনায় পুলিশের কোনো বিশেষায়িত সংস্থা বা অন্য তদন্ত সংস্থার ছায়া তদন্তের উদ্যোগও পরিলতি হচ্ছে না। এতে ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। মামলার বাদি অভিযোগ করেছে, হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কারা জড়িত, কী উদ্দেশ্যে এই নির্মম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে এবং কিভাবে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট প্রভাবিত করা হয়েছে; এসব বিষয়ে একাধিকবার থানা পুলিশকে অবহিত করা হলেও কার্যকর কোনো তদন্ত তৎপরতা চোখে পড়ছে না।

নিহতের নানা সুলতান মিয়া ােভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এলাকায় প্রকাশ্যে আলোচনা হচ্ছে- কারা, কেন এবং কত টাকার বিনিময়ে আমার নাতিকে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি এ হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ঘুষের বিনিময়ে প্রভাবিত করার কথাও মানুষ বলছে। এসব তথ্য আমরা পুলিশকে জানিয়েছি। কিন্তু তারা কোনো পদপে নেয়নি।’ পরিবারের আরো অভিযোগ, মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের রা করতে ময়নাতদন্তে মৃত্যুর কারণ ‘অনির্ধারিত’ দেখানোকে অজুহাত বানিয়ে পুলিশ আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট) দাখিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সাথে অভিযোগ রয়েছে, পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করে সন্দেহভাজন আসামিরা এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যা ভুক্তভোগী পরিবারকে চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ফেলেছে।

এ ব্যাপারে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই পঙ্কজ চন্দ দে সরকারের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। বরং তিনি এই প্রতিনিধিকে থানায় এসে সাাৎ’ করার অনুরোধ জানান।

এ বিষয়ে পাগলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে মামলাটির তদন্ত তৎপরতা জোরদার করতে পারছিলাম না। মামলাটি যখন হয় তখন আরেকজন ওসি দায়িত্বে ছিলেন। আমি সর্বশেষ খোঁজ নিয়ে জানাতে পারব।

আইন ও মানবাধিকার সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি শিশুর নিখোঁজ হওয়া, দীর্ঘ সময় পর অর্ধগলিত ও খণ্ডিত লাশ উদ্ধার এবং পরিবার কর্তৃক সুস্পষ্ট হত্যার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তদন্তে এই স্থবিরতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ‘জাতীয় নির্বাচন’- এই যুক্তিতে একটি গুরুতর শিশু হত্যা মামলার তদন্ত কার্যত থমকে রাখা আইনগত ও নৈতিক; উভয় দিক থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ।

স্থানীয়দের মতে, পুলিশের এই নীরবতা ও গড়িমসি মামলাটিকে পরিকল্পিতভাবে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে। এ অবস্থায় নিহতের পরিবার আদালতে পৃথক মামলা দায়েরসহ অন্য কোনো সংস্থার মাধ্যমে নিরপে তদন্ত নিশ্চিত করতে উচ্চপর্যায়ে অভিযোগ ও আইনি পদপে নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছে।

একটি শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় যেখানে দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপে তদন্তই হওয়া উচিত, সেখানে পুলিশের রহস্যজনক ভূমিকা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে, ‘পাঁচ বছরের শিশু আয়মান সাদাফের মৃত্যু কি আদৌ ন্যায়বিচারের মুখ দেখবে ?’

এ বিষয়ে গফরগাঁও সার্কেলের এএসপি মনতোষ বিশ্বাসের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, শিশু আয়মান নিহতের ময়না তদন্ত রিপোর্টে কোনো মতামত নেই। সুতরাং মামলার বাদি চাইলে অন্য কোনো সংস্থা দিয়ে তদন্ত করতে পারে। এর বেশি কিছু মন্তব্য করতে তিনি রাজি নন।

প্রসঙ্গত, গফরগাঁও উপজেলাধীন পাগলা থানার পাঁচবাগ ইউনিয়নের দিঘীরপাড় গ্রামের সুলতান উদ্দিনের মেয়ে সুমাইয়া আক্তারের প্রথম সন্তান আয়মান সাদাফ পাঁচ দিন নিখোঁজ থাকার পর তার লাশ গত বছর ১৫ জুলাই ২০২৫ প্রতিবেশী গোলাম হোসেনের বাড়ির পেছনে পরিত্যক্ত পুকুর পাড় থেকে অর্ধগলিত ও খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করে পাগলা থানা পুলিশ। এ হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে গত বছর ২৮ আগস্ট গফরগাঁও রেলওয়ে স্টেশনে আড়াই ঘণ্টা রেলপথ অবরোধ করে রাখে শিার্থীরা। কিন্তু এখনো পর্যন্ত এ মামলার তদন্তে দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি হয়নি।