সাঈফ ইবনে রফিক
তিস্তা ব্যারাজ থেকে খুব বেশি দূরে নয়, নদীর পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পুরনো কিছু স্থাপনা। সকালে সেখানে গেলে দেখা যায় লাল-সবুজ পতাকা উড়ছে, ব্যারাকের সামনে সৈনিকের ব্যস্ততা, বুটের শব্দ, বেতারে ভেসে আসছে সীমান্তের খবর। দিন বা রাত ২৪ ঘণ্টাই ঘুরছে রুটিনের ঘড়ি, প্রয়োজন হলেই কোনো দল বেরিয়ে যায় বিশেষ টহলে, কোনো দল প্রস্তুত থাকে পরবর্তী দায়িত্বের অপেক্ষায়।
অথচ বছর দশেক আগেও এই জায়গার চেহারা ছিল অন্যরকম। দীর্ঘদিন ব্যবহারহীন ভবনগুলো ঘিরে জমেছিল নির্জনতা, সন্ধ্যা নামলেই নিভে যেত মানুষের আনাগোনা, ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে বাতাস ঢুকত শোঁ শোঁ শব্দে। স্থানীয়দের ভাষ্যে, পরিত্যক্ত স্থাপনার কোনো কোনো অংশে ঠাঁই নিয়েছিল নেশাগ্রস্ত ও অপরাধপ্রবণ মানুষ। যে অবকাঠামো একদিন তিস্তার সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনার কর্মযজ্ঞের অংশ ছিল, কালের ভারে তা হয়ে পড়েছিল নিষ্প্রাণ, রাষ্ট্রের একখণ্ড ভুলে যাওয়া ভূমি, যার পাশ দিয়ে সন্ধ্যার পর হাঁটতেও দ্বিধা করত মানুষ।
আজ সেখানে দাঁড়ালে মনে হয়, ওই জায়গার পুনর্জন্ম হয়েছে! পরিত্যক্ত দালানের জায়গায় ব্যারাক, অন্ধকারের জায়গায় রাতের প্রহরা, ভাঙা জানালার জায়গায় সারিবদ্ধ আলো। ভয়ের ঠিকানা পরিণত হয়েছে আস্থার ঠিকানায়।
২০১৬ সালের ৯ আগস্ট পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করে তিস্তা ব্যাটালিয়ন, ৬১ বিজিবি। শুরুতে রংপুর সেক্টরের ব্যবস্থাপনায় ৭ বিজিবির সাথে সহ-অবস্থানে ছিল ব্যাটালিয়নটি, পরে ৭ ও ১৫ বিজিবির কাছ থেকে ১৮টি বিওপি ও একটি আইসিপির দায়িত্ব নেয়। ২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তিস্তা ব্যারাজ এলাকায় স্থায়ী স্থানান্তরের কাজ শুরু হয়, সম্পন্ন হয় ২০২১ সালের ১৪ জুন। নদীর উত্তর পাড়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের থেকে অধিগ্রহণ করা হয় ২০ একর জমি।
তিস্তা ব্যারাজের নিরাপত্তাকে তাই কেবল একটি স্থাপনার নিরাপত্তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দোয়ানীতে নির্মিত এই ব্যারাজ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নথিতে ‘১ক’ শ্রেণীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা তথা কেপিআই হিসেবে চিহ্নিত, যার মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় চলে সেচ, পানি নিয়ন্ত্রণ ও বন্যা ব্যবস্থাপনার কাজ। এর সাথে জড়িয়ে আছে উত্তরবঙ্গের কৃষি, খাদ্য উৎপাদন আর লাখো মানুষের জীবিকা। ঠিক এই কারণে ব্যাটালিয়ন সদরের অবস্থানগত সিদ্ধান্তটি এতটা তাৎপর্যপূর্ণ। একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষিত ব্যাটালিয়নের উপস্থিতি মানে, বড় কোনো জরুরি পরিস্থিতি, নাশকতার আশঙ্কা কিংবা সীমান্তকেন্দ্রিক কোনো নিরাপত্তা সঙ্কটে দ্রুততম সময়ে সাড়া দেয়ার সক্ষমতা। ব্যারাজের এত কাছে এই প্রহরাচৌকি, এটি রাষ্ট্রের সুচিন্তিত কৌশলগত প্রস্তুতি, নদীর নিরাপত্তা আর অবকাঠামোর নিরাপত্তা যেন বাধা পড়ে একই বলয়ে।
এই প্রহরার ফল সবচেয়ে ভালো বোঝেন তিস্তাপাড়ের মানুষ। জেলে জানেন, নদীর কাছে বিজিবির উপস্থিতি আছে, তাই ভোররাতে জাল ফেলতে গিয়ে বুক কাঁপে না। কৃষক জানেন, অস্বাভাবিক কিছু দেখলে জানানোর জায়গা আছে। দোকানির কাছে নিরাপত্তার অর্থ রাত অবধি স্বাভাবিকভাবে দোকান খোলা রাখা, অভিভাবকের কাছে তার অর্থ সন্তানকে নিয়ে কিছুটা কম উদ্বেগ, মায়ের কাছে হয়তো সন্ধ্যাবেলা উঠানে ছেলেমেয়ের খেলার নিশ্চিন্ত শব্দ। পরিসংখ্যানে এসব ধরা না পড়লেও মানুষের দৈনন্দিন আচরণেই রাষ্ট্রের উপস্থিতির প্রভাব স্পষ্ট।
৬১ বিজিবির গুরুত্ব বুঝতে শুধু ব্যাটালিয়ন সদরের চার পাশে তাকালে চলবে না, তাকাতে হবে বাংলাদেশের মানচিত্রে। লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার তিন দিকেই ভারত, দক্ষিণে সরু ভূখণ্ড ধরে হাতীবান্ধার সংযোগ, আরো উত্তরে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা, এমন এক ভূখণ্ড যার ভূগোলই বলে দেয় সীমান্ত নিরাপত্তা এখানে কতটা স্পর্শকাতর। এই জটিল ভূগোলের বড় অংশের দায়িত্ব ৬১ বিজিবির, যার অধীনে ১৮টি বিওপি ও একটি আইসিপি, বুড়িমারী, বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার, ওপারে ভারতের চ্যাংড়াবান্ধা। এই পথেই চলে ভারত-ভুটানের সাথে বাণিজ্য, যাত্রী চলাচল, কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন কার্যক্রম। অর্থাৎ তিস্তা ব্যাটালিয়ন নিছক কয়েকটি বিওপির সদর নয়, এমন এক কমান্ড কেন্দ্র, যার দায়িত্বে একসাথে জড়িয়ে আছে নদীসীমান্ত, স্থলসীমান্ত, দুর্গম চরাঞ্চল, আন্তর্জাতিক প্রবেশপথ আর গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর নিরাপত্তা।
বর্ষায় তিস্তার পানি বাড়লে বন্যার্ত মানুষের কাছে ত্রাণ, শুকনো খাবার কিংবা উদ্ধারের নৌকা নিয়ে সবার আগে পৌঁছায় তিস্তা ব্যাটালিয়ন। পানি নেমে যাওয়ার পরও যে ভাঙা ঘর, ভেসে যাওয়া ফসল আর দিশেহারা সংসার থেকে যায়, তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টাও চলে নিভৃতে। চিকিৎসাসেবা, সচেতনতা কার্যক্রম আর অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে এমন এক সম্পর্ক, যা নিরাপত্তাকেও করে তোলে আরো গভীর, আরো টেকসই।
তিস্তার পাড়ে দাঁড়ালে তাই পাশাপাশি দেখা যায় দু’টি চিত্র। এক পাশে অভিমানী, অস্থির ত্রিস্রোতা, লোককথায় যে বোনদের ছেড়ে নিজের পথ বেছে নিয়েছিল, যাকে নিয়ে আজও গান বাঁধেন উত্তরবঙ্গের বাউল আর ভাওয়াইয়াশিল্পীরা; অন্য পাশে স্থির প্রহরা, যে জায়গা একদিন ছিল ভয় আর নিস্তব্ধতার প্রতীক, আজ সেখানে প্রতিদিন ওড়ে জাতীয় পতাকা, রাত গভীর হলেও থামে না প্রহরা। নদী তার পুরনো অভিমান নিয়ে বয়ে চলে, বদলায় খাত, ভাঙে পাড়, আর তার পাশে একই রকম অবিচল দাঁড়িয়ে থাকে রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি।
তিস্তার পাড়ে ৬১ বিজিবি তাই কেবল একটি ব্যাটালিয়নের নাম নয়। এটি এক পরিত্যক্ত স্থাপনার পুনর্জীবনের গল্প, এক সীমান্ত জনপদের ফিরে পাওয়া স্বস্তির গল্প আর হাজার বছরের পুরনো এক খেয়ালি নদীর পাড়ে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রহরার গল্প। মানচিত্রে জায়গাটি সরু; কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তার বয়ানে আর তিস্তা পাড়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বয়ানে, তিস্তা ব্যাটালিয়নের গুরুত্ব অনেক বড়, ঠিক যেমন বড় সেই নদীর নিজের ইতিহাস, যা বয়ে চলে সময়, মিথ আর মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে।