গণতন্ত্র প্রাচীন ধারণা হলেও সংসদীয় গণতন্ত্র তুলনামূলকভাবে নবীন এক পরিশীলিত ব্যবস্থা। আর এই ব্যবস্থার প্রাণ নিহিত তার রীতি-রেওয়াজ, প্রথা ও শিষ্টাচারের মধ্যে। গ্রিক নগররাষ্ট্রে জন্ম নেয়া ‘ডেমোক্র্যাসি’ (Democracy) শব্দটির আভিধানিক অর্থ জনগণের শাসন। আব্রাহাম লিংকন একে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন অমর বাক্যে, ‘জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন’ (Government of the people, by the people, for the people)। কিন্তু এই বিমূর্ত ধারণাকে বাস্তবের কাঠামোয় রূপ দিতে গিয়ে মানবসভ্যতা যে প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণ করেছে, তার নাম সংসদ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ওয়াল্টার ব্যাজহট তার বিখ্যাত গ্রন্থ The English Constitution-এ পার্লামেন্টকে বলেছেন রাষ্ট্রের ‘মর্যাদাপূর্ণ’ (dignified) ও ‘কার্যকর’ (efficient) অংশের সংযোগ সেতু। উল্লেখ্য, সংসদ কেবল একটি ভবন কিংবা সদস্যদের সমাবেশ নয়; এটি একটি জীবন্ত ঐতিহ্য, শতাব্দীর পরিশীলনে গড়ে ওঠা এক আচরণবিধির সমষ্টি। Parliament শব্দটির উৎপত্তি ফরাসি parler থেকে, যার অর্থ কথা বলা। অর্থাৎ— সংসদ মূলত কথা বলার জায়গা; কিন্তু সে কথা হবে যুক্তির, বিতর্কের, সৌজন্যের ও সহনশীলতার; কলহ ও হট্টগোলের নয়। এই সৌজন্য ও শৃঙ্খলার নামই সংসদীয় রীতি-রেওয়াজ।
সংসদীয় রীতি-রেওয়াজ কী? এটি কোনো একদিনের আরোপিত নিয়ম নয়; বরং যুগ-যুগান্তরে অভ্যাসে-অনুশীলনে গড়ে ওঠা এক অলিখিত সংবিধান। ব্রিটিশরা একে বলে, ‘পার্লামেন্টারি কনভেনশন’ (parliamentary convention)—লিখিত আইনে যা নেই, অথচ যা মেনে চলা প্রত্যেক সদস্যের নৈতিক দায়। সংসদে স্পিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, প্রতিপক্ষকে ‘মাননীয় সদস্য’ (Honourable Member) বলে সম্বোধন, একজনের বক্তব্যের সময় অন্যের নীরবতা, ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’-এ দাঁড়িয়ে বিধিসম্মত আপত্তি উত্থাপন, বক্তব্য প্রত্যাহার (expunge) করার সৌজন্য— এসবই সংসদীয় শিষ্টাচারের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদেও রয়েছে লিখিত ‘কার্যপ্রণালি বিধি’ (Rules of Procedure), যা সংসদের প্রতিটি আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু বিধির অক্ষরের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তার আত্মা— পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহিষ্ণুতা। যেখানে অক্ষর থাকে কিন্তু আত্মা অনুপস্থিত, সেখানে সংসদ পরিণত হয় প্রাণহীন আনুষ্ঠানিকতায়।
সংসদীয় গণতন্ত্রের দু’টি প্রধান মডেল পৃথিবীজুড়ে সমাদৃত— একটি ব্রিটিশ ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতি, অন্যটি মার্কিন প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থা। ব্রিটেন সংসদীয় গণতন্ত্রের সূতিকাগার। তারা কোনো লিখিত সংবিধান রচনা করেনি; বরং শত শত বছরের রীতি, প্রথা ও দৃষ্টান্তকে (convention) সংবিধানের মর্যাদা দিয়েছে। সেখানে রাজা রাজত্ব করেন কিন্তু শাসন করেন না (The King reigns but does not rule); প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী প্রধানমন্ত্রী, যিনি সংসদের কাছে দায়বদ্ধ। ব্রিটিশ সংসদের সবচেয়ে উজ্জ্বল অলঙ্কার হলো তার বিরোধী দল। তারা বিরোধী দলকে বলে ‘রাজকীয় অনুগত বিরোধী দল’ (His MajestyÕs Loyal Opposition)। এই অভিধাটি তাৎপর্যপূর্ণ; বিরোধিতা মানে রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থেকেই সরকারের নীতির গঠনমূলক সমালোচনা। সেখানে রয়েছে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ shadow cabinet), যেখানে বিরোধী দলের প্রতিটি সদস্য সরকারের এক-একজন মন্ত্রীর প্রতিপক্ষ হিসেবে বিকল্প নীতির খসড়া প্রস্তুত রাখেন। প্রধানমন্ত্রীকে প্রতি সপ্তাহে ‘প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে’ (Prime Minister’s Questions) বিরোধী দলের তীক্ষè প্রশ্নবাণের মুখোমুখি হতে হয়। উল্লেখ্য, হাউজ অব কমন্সে সরকারি ও বিরোধী দলের আসনের মাঝখানে দু’টি লাল রেখা (red lines) টানা আছে— প্রথা অনুযায়ী কোনো সদস্য বিতর্ককালে সেই রেখা অতিক্রম করতে পারেন না। কথিত আছে, এই দূরত্ব ছিল দুই তরবারির দৈর্ঘ্যরে সমান— যাতে উত্তেজনার মুহূর্তেও কেউ কাউকে আঘাত করতে না পারে। শিষ্টাচার এভাবেই স্থাপত্যেও রূপ পেয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতারা ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভিন্ন পথ বেছে নেন। মন্তেস্কুর ‘ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ’ (separation of powers) তত্ত্বকে তারা সংবিধানের মেরুদণ্ড করেন। আইনসভা, নির্বাহী ও বিচার বিভাগ— তিনটি অঙ্গকে পৃথক রেখে তারা ‘পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যের’ (checks and balances) এক অভিনব ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। কংগ্রেসের দুই কক্ষ— সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাকে সংযত রাখে। মার্কিন গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এই যে, সেখানে প্রেসিডেন্টের নিজ দলই মাঝে মধ্যে তার নীতির বিরোধিতা করে; দলীয় আনুগত্যের চেয়ে বিবেক ও নির্বাচনী এলাকার স্বার্থ সেখানে অগ্রগণ্য। এই দুই ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত শিক্ষা এক ও অভিন্ন— ক্ষমতা যেখানে নিরঙ্কুশ, সেখানে স্বৈরাচার অনিবার্য। লর্ড অ্যাক্টনের সেই অমোঘ উক্তি স্মরণীয়, ‘ক্ষমতা মানুষকে কলুষিত করে, নিরঙ্কুশ ক্ষমতা কলুষিত করে নিরঙ্কুশভাবে’ (Power tends to corrupt, and absolute power corrupts absolutely)।
আমরা যেহেতু দুই শ’ বছর ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিলাম, উত্তরাধিকার সূত্রে সংসদীয় শাসনব্যবস্থাই আমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়েছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে বাংলাদেশ ওয়েস্টমিনস্টার আদলে সংসদীয় গণতন্ত্র গ্রহণ করে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, প্রতিষ্ঠানটি আমদানি করলেও আমরা তার রীতি-রেওয়াজ আত্মস্থ করতে পারিনি। সংসদীয় গণতন্ত্রের খোলস আমাদের ছিল; কিন্তু মজ্জা ছিল অনুপস্থিত। বিশেষত বিগত দেড় দশকের আওয়ামী শাসনামলে জাতীয় সংসদ পরিণত হয়েছিল এক নি®প্রাণ, নিরর্থক প্রদর্শনীর মঞ্চে। সংবিধানের প্রথম পঙ্ক্তিতে লেখা ছিল ‘জনগণই সকল ক্ষমতার মালিক’, অথচ বাস্তবে ক্ষমতাই হয়ে উঠেছিল সব রাজনীতির উৎস। ব্যাজহট যাকে বলেছিলেন সরকারের কার্যকর অংশ (efficient par), সেই সংসদকে পরিণত করা হয়েছিল আলঙ্কারিক শোভায়। রীতি ছিল কেবল কাগজে; রেওয়াজ ছিল কেবল স্তুতি।
আওয়ামী আমলের সংসদীয় ইতিহাস প্রকৃত অর্থে নামমাত্র গণতন্ত্রের ইতিহাস। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর মধ্য দিয়ে গঠিত সংসদে বিরোধী দল বলে কার্যত কিছু ছিল না। ২০১৪ সালে দেড় শতাধিক আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হয়নি; ভোটের আগেই ফলাফল নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। জাতীয় পার্টিকে একই সাথে সরকারে ও বিরোধী আসনে বসিয়ে তৈরি করা হয়েছিল এক নজিরবিহীন কৌতুক— সরকারি দল ও বিরোধী দল মিলেমিশে একাকার। জনগণ তাকে যথার্থই নাম দিয়েছিল ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’। যে বিরোধী দল সরকারের অনুগ্রহে টিকে থাকে, যে বিরোধিতা সরকারের ইশারায় নিয়ন্ত্রিত হয়, তা বিরোধিতা নয়— তা প্রহসন। সেই সংসদ হয়ে উঠেছিল একজন ব্যক্তির প্রশস্তি-গাথার আসর, ‘জি হুজুর’ আর করতালির সমবেত মহড়া। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘রাবার-স্ট্যাম্প সংসদ’ (rubber-stamp parliament), যার একমাত্র কাজ নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্তে বিনা প্রশ্নে সিলমোহর বসানো। সেখানে সংসদীয় বিধির লঙ্ঘন ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার— কোরাম-সঙ্কট, অনুপস্থিতি, দিনের পর দিন গুরুত্বপূর্ণ বিল বিনা আলোচনায় পাস। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির পর্যবেক্ষণে দেখা গিয়েছিল, দশম সংসদের কেবল কয়েকটি অধিবেশনেই কোরাম-সঙ্কটে অপচয় হয়েছিল প্রায় ৪৯ ঘণ্টা, যার আর্থিক মূল্য কোটি কোটি টাকা। আইন সভা, নির্বাহী ও বিচার বিভাগ— তিনটি অঙ্গ যখন একটি কর্তৃত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করে, তখন যাকে বলা হয় স্বৈরতন্ত্র, তারই প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল ‘গণতন্ত্রের’ মোড়কে। এ ছিল কাঠামোগত প্রতারণা— সংসদীয় গণতন্ত্রের মোড়কে আইনি ও বেআইনি বাকশাল। জনগণ সে সংসদের প্রতি আগ্রহ হারিয়েছিল।
এই দীর্ঘ অন্ধকারের পর চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান জাতিকে এক নতুন প্রভাত উপহার দিয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে প্রকৃত অর্থে একটি সক্রিয়, সোচ্চার বিরোধী দল রয়েছে। আর এই জীবন্ত সংসদেই নতুন করে ফিরে এসেছে সংসদীয় রীতি-রেওয়াজ নিয়ে সজীব বিতর্ক। সাম্প্রতিক অধিবেশনে আমরা যা প্রত্যক্ষ করছি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ঘিরে উত্তেজনা, বিরোধী দলের হট্টগোল, ওয়াকআউট, স্পিকারের উদ্বেগ— তা যতই অপ্রীতিকর মনে হোক, এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর ইতিবাচক ইঙ্গিত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ যখন এক তরুণ সদস্যের প্রশ্নকে ‘পল্টনের বক্তৃতা’ কিংবা ‘শাহবাগের বক্তৃতা’র সাথে তুলনা করে তাচ্ছিল্য করেন, তখন বিরোধী দল প্রতিবাদে ফেটে পড়ে; আবার সেই মন্ত্রীই বিজ্ঞতার পরিচয় দিয়ে বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেন। এই প্রত্যাহারই সংসদীয় রীতির জয়। বিরোধী দলের সদস্য রুমিন ফারহানা যখন কটাক্ষ করে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘হয় ব্যঙ্গ করেন, নয়তো বাকচাতুর্য দিয়ে বিষয়টি ঢেকে দিতে চান’-তখন সেই তীক্ষèতাও সংসদীয় বিতর্কেরই সৌন্দর্য, যদি তা যুক্তির সীমা অতিক্রম না করে।
সংসদীয় রীতি-রেওয়াজের প্রশ্নটি এই সংসদে আরো সূক্ষ্মভাবে উঠে এসেছে। জামায়াতের একজন সদস্য যখন স্পিকারের প্রতি মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান প্রদর্শনের রীতিকে ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক বলে ‘পয়েন্ট অব অর্ডারে’ আপত্তি তোলেন, তখন স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদ তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত না দিয়ে কার্যপ্রণালি বিধি পরীক্ষা করে রুলিং দেন— কার্যপ্রণালি বিধির ২৬৭ ধারা অনুযায়ী প্রবেশ-প্রস্থানে সভাপতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে, তবে অষ্টম সংসদে সংশোধনীর মাধ্যমে ‘ঝুঁকিয়া’ শব্দটি বাদ দেয়া হয়েছে, তাই সদস্যরা নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সম্মান জানাবেন। এটিই প্রকৃত সংসদীয় সংস্কৃতি— আবেগে নয়, বিধির আলোকে সমাধান। একইভাবে সংসদে উত্থাপিত তথ্যের সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে; কারণ সংসদে বিভ্রান্তিকর বা অসত্য তথ্য উপস্থাপন কেবল শিষ্টাচারভঙ্গ নয়, তা জনগণের তথ্য জানার অধিকার ও জবাবদিহিতার পরিপন্থী। ব্রিটিশ ঐতিহ্যে একে বলা হয় ‘হাউজকে বিভ্রান্ত করা’ (misleading the House)-যা সবচেয়ে গুরুতর সংসদীয় অপরাধের একটি, যার জন্য মন্ত্রীকে পর্যন্ত পদত্যাগ করতে হয়।
গত দেড় দশকে যে সংসদে টুঁ শব্দটি করার সাহস কারো ছিল না, সেই সংসদে আজ তরুণ সদস্যরা পরিসংখ্যান হাতে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, জ্বালানি সঙ্কট নিয়ে সরকারকে কোণঠাসা করছেন। এটাই স্বাভাবিক গণতন্ত্রের চিত্র। ব্রিটিশ হাউজ অব কমন্সেও তীব্র বাদানুবাদ হয়, টেবিল চাপড়ানো হয়, ‘শৃঙ্খলা! শৃঙ্খলা!’ (Order! Order!) ধ্বনিতে স্পিকারকে শৃঙ্খলা ফেরাতে হয়। বিতর্ক গণতন্ত্রের দুর্বলতা নয়, শক্তি। তবে বিতর্ক আর বিশৃঙ্খলার মধ্যে সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ফারাক রয়েছে। যুক্তির স্থান যখন কণ্ঠের উচ্চগ্রাম দখল করে, পরস্পরকে বলার সুযোগ না দেয়ার প্রবণতা যখন প্রবল হয়, তখন সংসদ প্রাণবন্ত না হয়ে— হয়ে ওঠে অকার্যকর। এখানেই সরকারি দল ও বিরোধী দল উভয়ের সংযম কাম্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একজন প্রবীণ ও বিচক্ষণ পার্লামেন্টারিয়ান; তরুণ সদস্যদের প্রতি তাচ্ছিল্যের বদলে পিতৃসুলভ সহনশীলতাই তার কাছে প্রত্যাশিত। অপরদিকে বিরোধী দলকেও মনে রাখতে হবে, ওয়াকআউট ও প্রতিবাদ গণতন্ত্রের অস্ত্র বটে; কিন্তু তা সংযমের সাথে প্রয়োগ করাই রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচায়ক। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ চার দশকের সংসদীয় অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ; তিনি নিজেই একদা বিরোধী দলে থেকে পাঁচবার কারাবরণ করেছেন। তার দক্ষ পরিচালনাই এই তরুণ সংসদের বড় ভরসা।
দেশ এখন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ভঙ্গুর অর্থনীতি, গ্যাস-বিদ্যুতের সঙ্কট, আইনশৃঙ্খলার অস্থিরতা— এসবের মধ্যেও জনগণ ধৈর্য ধরে গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের অপেক্ষায় আছে। এই মুহূর্তে জাতির সামনে যে সুযোগ এসেছে, তা ঐতিহাসিক। বিগত অর্ধশতাব্দীতে বাংলাদেশ যে প্রকৃত সংসদীয় গণতন্ত্রের স্বাদ পায়নি, আজ তা প্রতিষ্ঠার এক বিরল সন্ধিক্ষণ উপস্থিত। এই সুযোগ যদি আমরা কলহ ও অসহিষ্ণুতায় নষ্ট করি, তবে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।
সংসদীয় রীতি-রেওয়াজ কোনো একদিনের অর্জন নয়; ব্রিটেন সাত শ’ বছরে যা গড়েছে, তা ধৈর্য, সহনশীলতা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি শ্রদ্ধার ফসল। আমাদের সংসদ যেন যুক্তি-তর্কের প্রাণবন্ত কেন্দ্র হয়, প্রশ্ন ও জবাবদিহিতার নির্ভীক মঞ্চ হয়, শিষ্টাচার ও সৌজন্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়— এই হোক আমাদের অঙ্গীকার। সরকারি দল ও বিরোধী দল যদি পরস্পরকে শত্রু নয়; বরং একই গণতান্ত্রিক যাত্রার সহযাত্রী মনে করে, তবেই এই সংসদ হয়ে উঠবে প্রকৃত অর্থে জনগণের সংসদ। সেটিই হবে জুলাই শহীদদের রক্তের প্রতি যথার্থ সম্মান।
লেখক : অধ্যাপক (অব:), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়